২০২৬ সালের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের যৌথ হামলায় আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ অন্তত ৩৯ থেকে ৫২ জন সিনিয়র ইরানি কর্মকর্তা, সামরিক কমান্ডার ও জেনারেল নিহত হয়েছেন। এ সংঘাতে প্রাণ হারিয়েছেন দেশটির সামরিক-রাজনৈতিক কাঠামোর শীর্ষস্থানীয় বহু কর্মকর্তা। এমনকি যার মধ্যে রয়েছেন আইআরজিসির প্রধান কমান্ডারও।
তবুও শত্রুপক্ষের সামনে নেতৃত্বশূন্য হতে দেখা যায়নি ইসলামী প্রজাতন্ত্রকে। কিন্তু কেন? বিশ্লেষকদের মতে, কারণ ইরানি শাসনব্যবস্থায় আকস্মিক সংকট মোকাবেলায় সাংবিধানিক ও শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক বিকল্প আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল।
আরেকদল বিশ্লেষকের মতে, এত সংখ্যক জেনারেল নিহতের ঘটনার পরও ইরানকে শক্তি জোগায় দেশটির দ্বৈত সামরিক কাঠামো অর্থাৎ দুটি সেনাবাহিনী।
১৯৭৯ সাল। প্রায় ২৫ হাজার বছরের রাজতন্ত্র ও শেষ শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির শাসনের অবসান ঘটিয়ে নতুন রাজনৈতিক ও ধর্মীয় শক্তির উত্থান হয়। নতুন শাসকগোষ্ঠী পুরোনো রাজতান্ত্রিক আমলের আরতেশ বাহিনীকে বিশ্বাস করতে পারেনি।
গঠিত হয় নতুন নেতৃত্বের অনুগত বাহিনী ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কর্পস । ইসলামি বিপ্লবের পর এ শাসনব্যবস্থা ও ধর্মীয় নীতি সুরক্ষার প্রধান স্তম্ভ হিসেবে কাজে লেগে যায় দুর্ধর্ষ বাহিনী আইআরজিসি। দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকে আর্তেশ বাহিনী। সামরিক অভ্যুত্থান রোধ করতে তাদের পাশে ছায়াসঙ্গী হয় রক্ষণশীলতা আর আনুগত্যের চাদরে মোড়ানো আইআরজিসি।
১৯৭৯ সালে ইরানের প্রায় আড়াই হাজার বছরের রাজতন্ত্র এবং শেষ শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির একচ্ছত্র শাসনের অবসান ঘটে। দেশটিতে নতুন রাজনৈতিক ও ধর্মীয় শক্তির উত্থান হয়। শাহ-এর পতনের পর নতুন শাসকগোষ্ঠী পুরোনো রাজতান্ত্রিক আমলের নিয়মিত সেনাবাহিনী আরতেশকে পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারেনি। তাই বিপ্লব ও নতুন শাসনব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে অনুগত বাহিনী আইআরজিসি গঠিত হয়।
উভয় বাহিনীই আলাদা কমান্ড কাঠামোতে চললেও সরাসরি দেশটির সর্বোচ্চ নেতার অধীনে রিপোর্ট করে। ভিন্ন দায়িত্ব ও কাজের পরিধি নিয়ে আরতেশ দেশের আন্তর্জাতিক সীমান্ত রক্ষা এবং ঐতিহ্যগত বা প্রচলিত যুদ্ধ পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত।
আরও পড়ুন:
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে দুটি করে সেনাবাহিনী রয়েছে। তবে ইরানের দুটি সেনাবাহিনী থাকার বিষয়টিকে ভিন্ন বলা যায় কেন?
অন্যান্য দেশের বিভক্ত কাঠামোর বিপরীতে ইরানের এই ব্যবস্থা ভিন্ন। কারণ আইআরজিসি কেবল একটি সামরিক শাখা নয়, এটি সরাসরি ইরানের সর্বোচ্চ নেতার প্রতি অনুগত। যার রয়েছে নিজস্ব স্থল, নৌ ও বিমান শক্তি, আঞ্চলিক প্রক্সি নেটওয়ার্ক এবং বিশাল অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ।
আর্তেশ এবং আইআরজিসি-এ দুটি সমান্তরাল সামরিক কাঠামো পরিচালনা করে বিপক্ষ দেশের বিরুদ্ধে কৌশলগত ও অভ্যন্তরীণভাবে বহুমুখী সুবিধা লাভ করছে ইরান। এর মাধ্যমে দেশটি একই সঙ্গে প্রথাগত ও অপ্রথাগত যুদ্ধপদ্ধতি বজায় রাখতে পারছে।
দেশের রাজনৈতিক আদর্শ রক্ষা, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, ব্যালাস্টিক মিসাইল কর্মসূচি এবং কুদস ফোর্সের মাধ্যমে আঞ্চলিক ও বৈদেশিক প্রভাব বিস্তারের কাজ করে আইআরজিসি। এতে পূর্বের শাহ আমলের ঐতিহ্যবাহী বাহিনীর বিদ্রোহের শঙ্কা দূর হয়। দুটি আলাদা বাহিনী থাকলে একটির বিরুদ্ধে অন্যটিকে ব্যবহার করে সামরিক অভ্যুত্থান ঠেকানো সহজ হয়।
আর্তেশ ও আইআরজিসির মধ্যে প্রকাশ্য বড় ধরনের কোনো সামরিক সংঘাত না হলেও বাজেট বরাদ্দ, রাজনৈতিক প্রভাব এবং মতাদর্শগত পার্থক্যের কারণে দীর্ঘকাল ধরে তাদের মধ্যে একধরনের প্রাতিষ্ঠানিক দ্বন্দ্ব ও শীতল প্রতিদ্বন্দ্বিতা রয়েছে। তবে সাংবিধানিক কাঠামোর অধীনে দেশের সুরক্ষায় তারা যৌথভাবে কাজ করে থাকে।
অভিজাত বাহিনী আইআরজিসি কৌশলগত ও প্রক্সি যুদ্ধও পরিচালনা করে। তারা কেবল সামরিক বাহিনী নয়, বরং ইরানের অর্থনীতি ও রাজনীতির অন্যতম বড় কুশীলব।
ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কর্পস ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর শাসনব্যবস্থা রক্ষার্থে গঠিত হয়। এটি দেশের রাজনৈতিক কাঠামো রক্ষা, শাসনব্যবস্থার আদর্শ ধরে রাখা এবং দেশের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রেন কর্মসূচির বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ করে
নিয়মিত সেনাবাহিনীর ক্ষমতা দখল বা অভ্যুত্থান ঘটানোর ঝুঁকি এড়াতে শাসকগোষ্ঠীর পক্ষে কাজ করে শক্তিশালী এ সমান্তরাল বাহিনী
তবে ইরানই একমাত্র দেশ নয় যাদের দুইটি সেনাবাহিনী রয়েছে। ইরাক, সৌদি আরব, চীন, কিউবা,ভেনেজুয়েলাতেও এরকম দুটি সমান্তরাল সামরিক বাহিনী রয়েছে। চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি সাংবিধানিকভাবে শুধুমাত্র সরকারের জন্য একটি ঐতিহ্যবাহী নিরপেক্ষ রাষ্ট্রীয় সামরিক বাহিনী নয়, বরং এটি শাসক রাজনৈতিক দল চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সশস্ত্র শাখা।
ইরাকে নিয়মিত সশস্ত্র বাহিনীর পাশাপাশি আনুষ্ঠানিকভাবে পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেস এবং পূর্বে শাসনব্যবস্থা প্রতিরক্ষার জন্য ব্যবহৃত বিশেষায়িত রিপাবলিকান গার্ড ইউনিটগুলো কাজ করে। সৌদি আরব দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রচলিত সামরিক শাখাগুলোকে শক্তিশালী সৌদি ন্যাশনাল গার্ড থেকে আলাদা করেছে। যা একটি স্বাধীন সামরিক বাহিনী। যেটি রাজপরিবার ও অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা রক্ষার বিশেষ দায়িত্ব পালন করে।





