মার্কিন হামলার পর তুরস্কের আঙ্কারায় ন্যাটো সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ইরানের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) ‘শেষ’ হয়ে গেছে বলে তিনি মনে করেন। তিনি জানান, আপাতত শান্তি আলোচনা চলতে দিতে ‘পারেন’, তবে ব্যক্তিগতভাবে এটিকে ‘সময়ের অপচয়’ বলেই মনে করেন। ক্ষোভপ্রকাশ করে ট্রাম্প ইরানি নেতাদের ‘জঘন্য’ বলে অভিহিত করেন।
ট্রাম্পের বক্তব্যের পর ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ৬ শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেল ৭৮ ডলারে পৌঁছেছে। ইউরোপীয় শেয়ার বাজারে দরপতন ঘটেছে ১ দশমিক ৬ শতাংশ। ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল যুদ্ধের প্রথম কয়েক মিনিটে নিহত ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির কয়েক দিনব্যাপী শেষকৃত্যের মধ্যেই এই হামলা চালানো হয়েছে। এপ্রিলে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ার পর এটিই সবচেয়ে বড় ধরনের হামলা।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, তারা ইরানের ‘৮০টির বেশি লক্ষ্যবস্তুতে’ হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ইরানের বিমানপ্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, কমান্ড ও কন্ট্রোল নেটওয়ার্ক, উপকূলীয় রাডার সাইট, জাহাজ বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা এবং প্রণালির আশপাশে থাকা ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) ৬০টির বেশি ছোট নৌযান। সেন্টকমের ভাষ্য, ইরান মার্শাল আইল্যান্ডসের পতাকাবাহী এম/টি আল রেকায়াত, সৌদি আরবের পতাকাবাহী এম/টি ওয়েদিয়ান ও লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী এম/টি সাইপ্রাস প্রসপারিটি নামের তিনটি জাহাজে হামলা চালিয়েছিল।
ইরানি গণমাধ্যম জানিয়েছে, দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দর শহর সিরিক, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ কেশম দ্বীপ, বন্দর আব্বাসের আশপাশ এবং বুশেহর প্রদেশের দুটি সামরিক ঘাঁটিতে হামলার খবর পাওয়া গেছে। আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা ফার্স জানিয়েছে, এসব হামলায় এখন পর্যন্ত কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
এছাড়া ট্যাংকার হামলার প্রতিক্রিয়ায় ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা ছাড়ের সিদ্ধান্তও প্রত্যাহার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ১৭ জুন সই হওয়া এমওইউর আওতায় ইরানকে ৬০ দিনের পূর্ণ ছাড় দেয়া হয়েছিল, যার মেয়াদ ২১ আগস্ট শেষ হওয়ার কথা ছিল। তেহরান থেকে আল জাজিরার প্রতিবেদক রেসুল সরদার আতাস জানান, নতুন এই নিষেধাজ্ঞা ইরানের অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলবে।
বুধবার আইআরজিসি জানিয়েছে, পাল্টা জবাবে তারা বাহরাইনের পোর্ট সালমান ও পঞ্চম নৌ ঘাঁটি এবং কুয়েতের আলি সালেম বিমানঘাঁটির ৮৫টি মার্কিন সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে এবং একটি মার্কিন এমকিউ-৯ ড্রোন ভূপাতিত করেছে। ‘শত্রুপক্ষের ড্রোনের’ হামলায় বাহিনীটির একজন সদস্য নিহত হয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ‘আগ্রাসী হামলা ও এমওইউর গুরুতর লঙ্ঘনের’ তীব্র নিন্দা জানিয়েছে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইরানের সশস্ত্র বাহিনী ‘জাতিসংঘ সনদের ৫১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মার্কিন সামরিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ইরানের ভৌগোলিক অখণ্ডতা, জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষায় দ্বিধা করবে না।’ পার্লামেন্টের স্পিকার ও প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এক্সে দেয়া এক পোস্টে বলেন, ‘জবরদস্তি ও চাঁদাবাজির যুগ শেষ। আমরা মাথা নত করি না।’ ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেন, মার্কিন হামলা ‘যুদ্ধ অবসানের চুক্তির মূল ও মৌলিক উপাদানগুলোকে অকার্যকর করে দিয়েছে।’
ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটে মার্কিন পদক্ষেপকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করে বলেছেন, ‘আমি মনে করি এটি একেবারেই জরুরি ছিল।’ অন্যদিকে বাহরাইন ও কুয়েতের ওপর ইরানি হামলার নিন্দা জানিয়েছে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ (জিসিসি), কুয়েত, ওমান, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও মিশর।
কাতারের দোহা ইনস্টিটিউট অব গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের মুহানাদ সেলুম আল জাজিরাকে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র যদি ভিন্নভাবে শক্তি প্রয়োগ করতে চাইত, তবে তারা ভিন্ন লক্ষ্যবস্তু বেছে নিতো।’ মার্কিন নৌবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা হারলান উলম্যানের মতে, ইরান যুক্তরাষ্ট্রকে টিটকারি দিচ্ছে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর মধ্যে বিভাজন আরও গভীর করার চেষ্টা করছে। তবে শেষ পর্যন্ত ‘উভয় পক্ষই উত্তেজনা প্রশমন করতে চাইবে’ বলে তিনি মনে করেন।





