এসব চুক্তির মধ্যে সবচেয়ে বড় হলো ব্রিটেনের জাতীয় স্বাস্থ্য সেবার (এনএইচএস) সঙ্গে ৩৩ কোটি পাউন্ড, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের (এমওডি) সঙ্গে ২৪ কোটি পাউন্ড এবং পারমাণবিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা-সংক্রান্ত ১ কোটি ৫০ লাখ পাউন্ডের চুক্তি। যদিও প্যালান্টিয়ারের এসব চুক্তির বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি, তবু পুলিশ, শিশু সমাজসেবা, শরণার্থী কর্মসূচি ও পরিবেশ খাতসহ অন্তত ৩৪টি চুক্তির তথ্য বেরিয়ে এসেছে।
২০২৪ সালের জানুয়ারিতে প্যালান্টিয়ার ইসরাইলি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে অংশীদারত্বের ঘোষণা দেয়, যার মাধ্যমে গাজায় সাংবাদিক ও ত্রাণকর্মীসহ বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা পরিচালনায় প্রযুক্তিগত সহায়তা দেয়া হয়। ২০২৫ সালের এপ্রিলে প্যালান্টিয়ারের প্রধান নির্বাহী অ্যালেক্স কার্প গাজায় ফিলিস্তিনি হত্যাকাণ্ডে তাদের প্রযুক্তি ব্যবহারের অভিযোগ প্রসঙ্গে বলেন, ‘বেশিরভাগই সন্ত্রাসী, এটি সত্য।’
জাতিসংঘের বিশেষ র্যাপোর্টিয়ার ফ্রান্সেসকা আলবানিজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, এই বক্তব্য থেকেই বোঝা যায় ফিলিস্তিনে ইসরাইলের বেআইনি শক্তি প্রয়োগ সম্পর্কে প্রতিষ্ঠানটির ‘নির্বাহী পর্যায়ে জ্ঞান ও উদ্দেশ্য’ ছিল। ফেব্রুয়ারিতে ইরানের একটি বালিকা বিদ্যালয়ে চালানো মার্কিন ‘ডাবল-ট্যাপ’ ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ১৭০ জনেরও বেশি (বেশিরভাগই শিশু) নিহতের ঘটনায় প্যালান্টিয়ারের পরিচালিত ‘মেভেন’ নামের এআই সিস্টেমের সংশ্লিষ্টতা আছে কি না, তা তদন্ত করছে পেন্টাগন।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ইউকের সংকট মোকাবিলা ব্যবস্থাপক ক্রিস্টিয়ান বেনেডিক্ট মিডল ইস্ট আইকে বলেন, ‘প্যালান্টিয়ারের সফটওয়্যার অধিকৃত গাজায় ইসরাইলের চলমান গণহত্যা ও বর্ণবাদী শাসনে সহায়তা করেছে। মানবাধিকার লঙ্ঘন করে মুনাফা করা কোনো প্রতিষ্ঠানের এনএইচএসসহ ব্রিটিশ জনসেবায় কোনো স্থান থাকা উচিত নয়। এসব চুক্তি বাতিল করে বিকল্প খুঁজে বের করতে হবে।’
প্যালান্টিয়ার প্রতিষ্ঠা করেন ডানপন্থি প্রযুক্তি ধনকুবের পিটার থিয়েল। তিনি রিপাবলিকান পার্টির অন্যতম প্রধান দাতা এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ। ২০২৪ সালের অভিষেক অনুষ্ঠান উপলক্ষে ওয়াশিংটনে তার নিজ বাড়িতে আয়োজিত অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, মেটার মার্ক জাকারবার্গ ও ওপেনএআইয়ের স্যাম অল্টম্যান।
জেফরি এপস্টিন ফাইলসের অংশ হিসেবে প্রকাশিত একটি অডিও রেকর্ডিং থেকে জানা যায়, ২০১৩ সালে সাবেক ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী এহুদ বারাকের সঙ্গে থিয়েলের পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন এপস্টিনই। ওই ফাইলে যুক্তরাষ্ট্রে ব্রিটেনের সাবেক রাষ্ট্রদূত পিটার ম্যান্ডেলসনের সঙ্গে এপস্টিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের নথিও রয়েছে। ম্যান্ডেলসনের লবিং প্রতিষ্ঠান ‘গ্লোবাল কাউন্সেল’-এর গ্রাহক তালিকায় ছিল প্যালান্টিয়ারও।
ম্যান্ডেলসন ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের সঙ্গে ওয়াশিংটনে প্যালান্টিয়ারের সদর দপ্তর পরিদর্শন করেন। ওই বৈঠকের কোনো কার্যবিবরণী প্রকাশ করা হয়নি। এর কয়েক মাস পর ডিসেম্বরে প্রতিষ্ঠানটি ব্রিটেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারত্বে যায়। ‘সামরিক এআই’ শক্তিশালী করতে ১৫০ কোটি পাউন্ডের প্রতিশ্রুতি এবং যুদ্ধক্ষেত্রে ‘প্রাণঘাতী সক্ষমতা’ বাড়াতে ‘কিল চেইন’ তৈরিতে বিনা প্রতিযোগিতায় ২৪ কোটি পাউন্ডের চুক্তি পায় প্রতিষ্ঠানটি।
ক্যাম্পেইন এগেইনস্ট দ্য আর্মস ট্রেডের (সিএএটি) গবেষণা সমন্বয়কারী স্যাম পারলো-ফ্রিডম্যান বলেন, ‘ব্রিটিশ সরকার গাজার গণহত্যায় ইতিমধ্যে গভীরভাবে জড়িত। জনসেবাগুলোকে প্যালান্টিয়ারের প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল করে তুললে ব্রিটেন এই কলঙ্কিত প্রতিষ্ঠানের কবল থেকে বের হতে পারবে না।’
এদিকে ২০২৩ সালে এনএইচএস ইংল্যান্ডের সঙ্গে রোগীদের তথ্য কেন্দ্রীভূত করতে ৩৩ কোটি পাউন্ডের চুক্তি পাওয়ায় ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে প্যালান্টিয়ার। থিয়েল এর আগে এনএইচএস সম্পর্কে বলেছিলেন, এটি ‘মানুষকে অসুস্থ করে তোলে’। জুনের শুরুতে ব্রিটিশ এমপিরা সরকারকে ২০২৭ সালে চুক্তির ‘ব্রেক ক্লজ’ কার্যকর করে ঘরোয়া বিকল্প তৈরির আহ্বান জানান।
সংসদের ক্রস-পার্টি সায়েন্স, ইনোভেশন অ্যান্ড টেকনোলজি কমিটির প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, ব্রিটেনের সরকারি খাতে প্যালান্টিয়ারের ওপর ক্রমবর্ধমান নির্ভরতা ‘অগ্রহণযোগ্য দুর্বলতা’, যার ফলে জনসেবাগুলো বিদেশি শক্তির ‘দয়ার ওপর’ নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারে। করোনা মহামারির সময় নগদ অর্থ সংকটে থাকা এনএইচএসকে মাত্র ১ পাউন্ডে সেবা দেয়ার প্রস্তাব দিয়ে প্রথম চুক্তিটি করেছিল প্যালান্টিয়ার।
ফক্সগ্লোভ নামের প্রযুক্তি প্রচার সংস্থার পরিচালক ডোনাল্ড ক্যাম্পবেল একে ‘জমি দখল করে বিস্তারের’ কৌশল হিসেবে অভিহিত করে বলেন, ‘এটি দেখতে ভালো চুক্তি মনে হলেও বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে বিনামূল্যে কোনো কিছু হয় না।’
স্বাস্থ্য ও সামাজিক পরিচর্যা বিভাগের (ডিএইচএসসি) স্থায়ী সচিব সামান্থা জোনস প্যালান্টিয়ারের অংশীদার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তার পরামর্শক চুক্তি ঘোষণা না করার কারণে লবিং বিধি ভাঙায় ক্ষমা চাইতে বাধ্য হন। এছাড়া প্রতিষ্ঠানটি ব্রিটিশ সরকারের ৩০ জনেরও বেশি সাবেক কর্মকর্তাকে নিয়োগ দিয়েছে, যা সমালোচকদের মতে ‘তীব্র দুর্নীতির ঝুঁকি’ তৈরি করছে।
মার্কিন অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগ (আইসিই) সংস্থার সঙ্গেও ৩ কোটি ডলারের চুক্তিতে গেছে প্যালান্টিয়ার। ‘এলিট’ নামের একটি টুল তৈরির কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি, যা মার্কিন স্বাস্থ্য ও মানবসেবা বিভাগের তথ্য ব্যবহার করে বহিষ্কারের জন্য মানুষের ঠিকানা খুঁজে বের করবে।
স্থানীয় সরকার ও পুলিশের সঙ্গেও চুক্তি রয়েছে প্যালান্টিয়ারের। মে মাসে লেবার-শাসিত কভেন্ট্রি সিটি কাউন্সিল কাউন্সিলর ও ট্রেড ইউনিয়নের বিরোধিতা সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে সাড়ে সাত লাখ পাউন্ডের চুক্তি নবায়ন করে। লন্ডনের মেয়র সাদিক খান মে মাসে মেট্রোপলিটন পুলিশের সঙ্গে প্যালান্টিয়ারের ৫ কোটি পাউন্ডের চুক্তি আটকে দিয়েছিলেন। তবে প্রতিষ্ঠানটি আইনি ব্যবস্থা নেয়ার পর তিনি সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে ১২ মাসের পাইলট প্রকল্পের অনুমোদন দেন।
দ্য গুড ল প্রজেক্টের প্রযুক্তি ও তথ্য বিভাগের প্রধান ডানকান ম্যাককান বলেন, ‘যে বিশ্বে সব সরকার অতি-নজরদারি চায়, সে বিশ্বে প্যালান্টিয়ার ব্যাপক লাভজনক প্রতিষ্ঠান। নজরদারি নতুন উগ্র ডানপন্থার সঙ্গে ভালোভাবেই কাজ করে, আর সেটি প্যালান্টিয়ারের জন্যও দারুণ। এ কারণেই এটি ফ্যাসিবাদ ও কর্তৃত্ববাদকে দ্রুত এগিয়ে নেয়া প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।’





