স্বাস্থ্যসেবায় আফগানিস্তানের চেয়েও বেশি খরচ হয় বাংলাদেশের মানুষের: অর্থমন্ত্রী

‘ডিবেটিং বাজেট অ্যান্ড বিয়ন্ড’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন অর্থমন্ত্রী
‘ডিবেটিং বাজেট অ্যান্ড বিয়ন্ড’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন অর্থমন্ত্রী | ছবি: এখন টিভি
0

দেশে স্বাস্থ্যসেবা নিতে জনগণকে নিজেদের পকেট থেকে যে ব্যয় বহন করতে হয়, তা আফগানিস্তানের চেয়েও বেশি বলে মন্তব্য করেছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘এ চাপ কমাতে সরকার ধাপে ধাপে সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার দিকে এগোচ্ছে।’

আজ (বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন) রাজধানীর ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্সে আয়োজিত বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির ‘ডিবেটিং বাজেট অ্যান্ড বিয়ন্ড’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

আমির খসরু বলেন, ‘স্বাস্থ্য ব্যয়ের বড় অংশই দেশের মানুষকে নিজের পকেট থেকে বহন করতে হয়। এতে পরিবারগুলোর ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রেই এ চাপ রয়েছে। এ কারণে সরকার অন্তত প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে। এতে মানুষের সঞ্চয় বাড়বে, স্বাস্থ্য পরিস্থিতির উন্নতি হবে এবং শিশুদের ভবিষ্যৎ আরও নিরাপদ হবে।’

সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন অর্থনীতি সমিতির অন্তর্বর্তী কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন ক্ষুদ্রঋণ নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের নির্বাহী সহসভাপতি অধ্যাপক মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন।

বাজেট প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘সাধারণভাবে বাজেটকে বার্ষিক প্রক্রিয়া বলা হলেও বাস্তবে এটি সারা বছর চলমান থাকে। দায়িত্ব গ্রহণের পরই তাকে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাব মোকাবেলার চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়েছে। একই সঙ্গে অর্থায়ন ব্যবস্থাপনা করাও কঠিন ছিল। সীমিত সময়ের মধ্যে সরকার বাজেটের কাঠামোতে কিছু পরিবর্তন আনার চেষ্টা করেছে।’

তিনি বলেন, ‘সরকার পুরোনো বাজেট কাঠামো থেকে বেরিয়ে নতুন চিন্তা ও নতুন মডেলের দিকে যেতে চায়। কারণ দেশের অর্থনীতিতে বৈষম্য অনেক বেশি। এছাড়া বাজেটে সংগঠিত ও ক্ষমতাবান গোষ্ঠীর প্রভাব থাকলেও দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বর অনেক সময় উপেক্ষিত থেকে যায়। তাই এবারের বাজেটকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করার চেষ্টা করা হয়েছে।’

অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘সরকার সবার জন্য অর্থনীতির ধারণা সামনে আনতে চায়, যাতে দেশের প্রতিটি মানুষ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে পারে এবং প্রবৃদ্ধির সুফল ভোগ করতে পারে। যারা এতদিন মূলধারার বাইরে ছিলেন, তাদের অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে। এর মধ্যে গ্রামীণ কামার, কুমার, কারুশিল্পী, সংস্কৃতি ও সংগীতের সঙ্গে জড়িত মানুষ, খেলোয়াড় এবং হতদরিদ্র জনগোষ্ঠী রয়েছেন।’

নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের ওপর গুরুত্ব দিয়ে আমির খসরু বলেন, ‘গ্রামের গৃহিণীরা সারাদিন সংসারের কাজ করলেও তাদের নিজস্ব আয় থাকে না। এ কারণেই ফ্যামিলি কার্ডের ধারণা আনা হয়েছে। এর মাধ্যমে তাদের ব্যয় করার সক্ষমতা বাড়বে, জীবনমান উন্নত হবে, পুষ্টির মান বাড়বে এবং পারিবারিক জীবনেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। একই সঙ্গে গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন চাহিদা সৃষ্টি হবে।’

কৃষকদের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘কৃষকদের শুধু ঋণ দিলেই হবে না, তাদের সার, বীজসহ মৌলিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। দায়িত্ব নেয়ার পর সরকারকে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার কৃষিঋণ মওকুফ করতে হয়েছে। এটি দেখিয়েছে যে কৃষকদের আরও বিস্তৃত সহায়তা প্রয়োজন।’

আরও পড়ুন:

সৃজনশীল অর্থনীতির প্রসঙ্গ তুলে আমির খসরু বলেন, ‘গ্রামীণ শিল্প, কারুশিল্প ও সংস্কৃতিও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে। প্রয়োজনীয় নকশা, বাজার ও বিপণন সহায়তা পেলে দেশের কারুশিল্পীরা আন্তর্জাতিক বাজারেও পণ্য বিক্রি করতে পারবেন। অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি শুধু বড় শিল্পকারখানার মাধ্যমে আসে না, মানুষের আয় ও ব্যয়ও এর অংশ।’

পূর্বাচলে একটি থিয়েটার জেলা গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও জানান মন্ত্রী। সেখানে থিয়েটার, শিল্পী, নকশাবিদ, খাবার ব্যবস্থা ও বিনোদনকেন্দ্রিক নানা সুবিধা থাকবে। পাশাপাশি দেশের ঐতিহ্যবাহী সম্পদগুলো সংরক্ষণ করে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।

পুঁজিবাজার নিয়ে তিনি বলেন, ‘সরকার পুঁজিবাজারকে পুনরুজ্জীবিত করতে চায়। বিশ্বের বড় বিনিয়োগের প্রধান উৎস পুঁজিবাজার হলেও বাংলাদেশে এখনো ব্যাংকনির্ভর অর্থায়ন বেশি। এ পরিস্থিতি পরিবর্তনে পেশাদার ব্যক্তিদের নিয়ে নতুন কমিশন গঠন করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন আইন, করনীতি ও আর্থিক খাতের সংস্কার কার্যক্রম চলছে।’

অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘বর্তমানে সরকারের ওপর প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকার ঋণসংক্রান্ত চাপ রয়েছে। এতে আর্থিক পরিসর সংকুচিত হয়েছে। তারপরও উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধির ধারা ধরে রাখতে হবে। সরকার এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে।’

আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নেয়া উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আমির খসরু বলেন, ‘দায়িত্ব নেয়ার সময় সরকার প্রায় ১ হাজার ৩০০টি উন্নয়ন প্রকল্প পেয়েছে, যার অনেকগুলো ১৫ বছরের বেশি সময় ধরে চলমান। এর মধ্যে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ প্রকল্প পুনর্মূল্যায়ন বা বাতিল করা হয়েছে। কিছু প্রকল্পের উদ্দেশ্যও পরিবর্তন করা হচ্ছে। তবে পুরো প্রক্রিয়া শেষ করতে অন্তত ২ বছর সময় লাগবে।’

বাজেট বাস্তবায়নের বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘সরকার এ খাতে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। এজন্য বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ শিথিল করা হচ্ছে এবং প্রশাসনিক সংস্কার আনা হচ্ছে। প্রকল্প বাস্তবায়ন তদারকিতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে তথ্যভিত্তিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালু করা হবে, যাতে প্রতিদিন প্রকল্পের অগ্রগতি দেখা যায়। প্রকল্প বাস্তবায়নের হার ৮০ শতাংশে উন্নীত করা গেলে উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন আরও সহজ হবে।’

তিনি বলেন, ‘কৃষি এখনো সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের খাত। বাজেটে সব বিষয় সরাসরি প্রতিফলিত না হলেও বাস্তবায়নের মাধ্যমে সেই লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা চলছে।’

এসএইচ