লেবানন সংঘাত: যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পরও থামছে না ইসরাইলি হামলা

ইসরাইল এয়ার স্ট্রাক
ইসরাইল এয়ার স্ট্রাক | ছবি: বিবিসি
0

লেবাননে তীব্র বিমান হামলা চালিয়ে ৪৭ জনকে হত্যার পর অবশেষে হিজবুল্লাহর সঙ্গে একটি যুদ্ধবিরতিতে সম্মতি দিয়েছে ইসরাইল। যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে চুক্তির পরও সংঘাত পুরোপুরি থামার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বিবিসির প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

এর আগে লেবাননে হিজবুল্লাহর হামলায় ইসরাইলের চার সেনা নিহত হওয়ার পর এই যুদ্ধবিরতির ঘোষণা এল। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধ বন্ধের চুক্তি এই চলমান সংঘাতের কারণে ভেস্তে যেতে পারে বলে শঙ্কা তৈরি হয়েছিল।

ইসরাইলি সামরিক বাহিনী যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার কথা নিশ্চিত করলেও পরে তাদের একজন মুখপাত্র জানান, ‘তাৎক্ষণিক হুমকি’ দূর করতে তাদের বাহিনী কাজ চালিয়ে যাবে। অন্যদিকে হিজবুল্লাহ আনুষ্ঠানিকভাবে এই যুদ্ধবিরতির কথা স্বীকার না করলেও গোষ্ঠীর মহাসচিব শেখ নাইম কাসেম বলেন, ‘হিজবুল্লাহকে নিশ্চিহ্ন করার যে প্রকল্প নেয়া হয়েছিল, তা ব্যর্থ হয়েছে।’

তবে মাঠপর্যায়ের চিত্র একেবারেই ভিন্ন। নাবতিয়েহ শহরের উদ্ধারকর্মীরা বিবিসিকে জানিয়েছেন, স্থানীয় সময় বিকেল ৪টায় যুদ্ধবিরতি শুরুর পরও অন্তত ১২ বার বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরাইল। এই প্রাণঘাতী সংঘাত থেকে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, ইরানের সঙ্গে করা চুক্তির ভবিষ্যৎ খুব একটা ডোনাল্ড ট্রাম্পের নিয়ন্ত্রণে নেই।

সমঝোতা স্মারকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাশাপাশি লেবাননেও যুদ্ধবিরতির কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে তা কার্যকর না হওয়ায় ট্রাম্প ইসরাইলকে নিবৃত্ত করতে ব্যর্থ হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছে তেহরান। এমনকি ট্রাম্প নিজেই তার মিত্র ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনইয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে নজিরবিহীন অভিযোগ তুলে বলেছেন, হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের নামে তিনি নির্বিচারে বেসামরিক মানুষ হত্যা করছেন।

লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে রাতভর নতুন করে এই সংঘাত আরও বড় সংকটের আভাস দিচ্ছে। হোয়াইট হাউস যুদ্ধবিরতি কার্যকরের দাবি করলেও চার সেনা নিহতের জেরে ইসরাইলের উগ্র ডানপন্থি জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়কমন্ত্রী ইতামার বেন গভির বলেন, ‘লেবাননকে অবশ্যই জ্বলতে হবে একজন ইসরাইলি মায়ের প্রতিটি অশ্রুবিন্দুর জন্য এক হাজার লেবানিজ মাকে কাঁদতে হবে।’

এর জবাবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি অভিযোগ করে বলেন, ইসরাইল ‘স্থায়ী যুদ্ধ’ চায়। তিনি জোর দিয়ে বলেন, সমঝোতা স্মারকের কোনো শর্ত লঙ্ঘিত হলে তার দায় পুরোপুরি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর বর্তাবে। ট্রাম্পের এই চুক্তির সফলতা নির্ভর করছে দুই পক্ষের কট্টরপন্থিদের সংযম দেখানোর ওপর। তবে এখন পর্যন্ত তার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখতে নেতানিয়াহু দেশের ভেতরে প্রবল চাপের মুখে আছেন। অন্যদিকে ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীটি জানিয়েছে, দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলের আগ্রাসন যতদিন চলবে, তাদের হামলাও অব্যাহত থাকবে।

যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র এফি দেফরিন বলেন, ‘তাৎক্ষণিক হুমকিগুলো দূর করতে, হিজবুল্লাহর নিয়ম লঙ্ঘনের জবাব দিতে এবং আমাদের বেসামরিক নাগরিকদের রক্ষায় যা যা প্রয়োজন আমরা তার সবকিছুই করে যাব।’

অন্যদিকে শেখ নাইম কাসেম শুক্রবার দৃঢ়কণ্ঠে বলেন, ‘হিজবুল্লাহকে নির্মূল করার পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়েছে এবং ইসরাইলিরা আমাদের ভূমির শেষ ইঞ্চি থেকেও প্রত্যাহার করতে বাধ্য হবে।’

দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলি বাহিনীর একটি দলের ওপর অতর্কিত হামলা চালানোর দাবি করে হিজবুল্লাহ। তারা নির্দেশিত ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে তিনটি ট্যাংক ধ্বংস করে এবং রকেট ও আর্টিলারি হামলা চালায়। এই ঘটনায় নিহত চার সেনার মধ্যে একজন ব্যাটালিয়ন কমান্ডারও ছিলেন।

লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইসরাইলি বিমান হামলায় নারী ও শিশুসহ অন্তত ৪৭ জন নিহত এবং ৯৭ জন আহত হয়েছেন। নাবতিয়েহ জেলার হারুফে নয়জন, হাবোশে সাতজন এবং আল-দুওয়াইরে এক শিশুসহ ছয়জন প্রাণ হারিয়েছেন। লেবাননের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বৃহস্পতিবার রাতের এই বোমাবর্ষণকে যুদ্ধের অন্যতম ভয়াবহ হামলা বলে উল্লেখ করেছে।

যুদ্ধবিরতির খবর বাস্তুচ্যুত লেবানিজদের মধ্যে চরম সন্দেহের জন্ম দিয়েছে। ইসরাইল আদৌ কোনো শান্তি চুক্তি মেনে চলবে কি না, তা নিয়ে তারা সন্দিহান। এক ব্যক্তি রয়টার্সকে বলেন, ‘চুক্তিটি ভালো এবং আমরা সবাই একটি চুক্তি চাই, কিন্তু ইসরাইলিরা এটি মানে না। তারা কতবার চুক্তি করেছে? একাধিকবার, কিন্তু তারা কথা রাখে না।’

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, ‘স্থায়ী শান্তি’ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আগামী সপ্তাহে ওয়াশিংটনে লেবানন সরকার ও ইসরাইলের মধ্যে সরাসরি আলোচনা পুনরায় শুরু হবে। লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে জানিয়েছেন, ওয়াশিংটনের আলোচনা এগিয়ে নেয়ার জন্য একটি ‘বিস্তৃত যুদ্ধবিরতি’ জরুরি, যার অধীনে লেবাননের ভূখণ্ডে ইসরাইলি হামলা পুরোপুরি বন্ধ হবে।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নিহত হওয়ার প্রতিশোধ হিসেবে হিজবুল্লাহ ইসরাইলে রকেট হামলা চালালে লেবানন এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। জবাবে ইসরাইল লেবাননজুড়ে ব্যাপক বোমা হামলা শুরু করে এবং উত্তরের সীমান্ত থেকে হিজবুল্লাহ যোদ্ধাদের পিছু হটানোর লক্ষ্যে দক্ষিণ লেবাননের প্রায় ৫ শতাংশ ভূখণ্ড দখল করে নেয়।

লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, সর্বশেষ সংঘাত শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত নারী ও শিশুসহ তিন হাজার ৯০০ জনের বেশি মানুষ নিহত এবং ১১ হাজার ৬০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। প্রায় ১০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন এবং দক্ষিণাঞ্চলের কয়েক ডজন জনপদ পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে।

এএম