রাশিয়া থেকে ক্রিমিয়াকে বিচ্ছিন্ন করার ছক; নেপথ্যে ইউক্রেনের ড্রোন বাহিনী

সিমফেরোপলে ক্রিমিয়া পার্লামেন্টের সামনে টহল দিচ্ছে ব্যাজহীন রুশ সেনারা
সিমফেরোপলে ক্রিমিয়া পার্লামেন্টের সামনে টহল দিচ্ছে ব্যাজহীন রুশ সেনারা | ছবি: সংগৃহীত
0

ইউক্রেনের ড্রোন বাহিনী সামরিক সরবরাহ পথ, জ্বালানি সরবরাহ এবং সংযোগ সড়কগুলো ব্যাহত করে মূল ভূখণ্ড রাশিয়া থেকে রুশ নিয়ন্ত্রিত ক্রিমিয়াকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করছে। সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

ইউক্রেনের আনম্যানড সিস্টেমস ফোর্সেসের কমান্ডার রবার্ট ব্রোভদি রয়টার্সকে জানান, ড্রোন হামলা বাড়ার কারণে গত এক মাসে নোভোরোসিয়া মহাসড়কে যান চলাচল দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি কমে গেছে। এটি দখলকৃত দক্ষিণ ইউক্রেন দিয়ে ক্রিমিয়া পর্যন্ত যাওয়া রাশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সরবরাহ পথ। ‘মাদিয়ার’ নামে পরিচিত ব্রোভদি বলেন, আগামী এক মাসের মধ্যে ইউক্রেনীয় বাহিনী এই সড়কের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেবে বলে আশা করা হচ্ছে।

ফ্রন্টলাইনের কাছে একটি ভূগর্ভস্থ কমান্ড সেন্টার থেকে ব্রোভদি বলেন, ‘আমরা অদূর ভবিষ্যতেই ক্রিমিয়াকে বিচ্ছিন্ন করে দেব।’ ইউক্রেনের এসব হামলার কারণে রুশ নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলজুড়ে সামরিক লজিস্টিকস ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। এর জেরে গত মাসে ক্রিমিয়ায় জ্বালানি রেশনিং চালু করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। ২০১৪ সালে ক্রিমিয়া এবং পূর্ব ইউক্রেনের কিছু অংশ দখল করেছিল রাশিয়া।

ব্রোভদি জানান, নোভোরোসিয়া মহাসড়কে চলাচলকারী যানবাহনগুলো ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলার জন্য খুবই সহজ লক্ষ্যবস্তু। উন্মুক্ত এই পথে হামলা চালানোকে তিনি ‘খোলা মাঠে তিতির পাখি শিকারের’ সঙ্গে তুলনা করেন। এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য রয়টার্স অনুরোধ করলেও রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় কোনো সাড়া দেয়নি। গত সপ্তাহে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন স্বীকার করেন যে ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলা ক্ষয়ক্ষতি করছে, তবে তা রাশিয়ার অর্থনীতির জন্য হুমকি নয়।

ইউক্রেনের অন্যতম কৌশলগত লক্ষ্য হলো রুশ বাহিনীকে অগ্রসর হওয়ার বদলে পিছু হটতে বাধ্য করা। ব্রোভদি বলেন, ‘আমরা এমন পরিস্থিতি তৈরি করবো, যার ফলে সামরিক কর্মী বা প্রতিরক্ষা শিল্পের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের জন্য সাময়িকভাবে দখলকৃত ক্রিমিয়াতে অবস্থান করা বা সেখানে যাওয়ার পথ ব্যবহার করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে।’

সামরিক বিশ্লেষকরা বলছেন, রুশ নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলের ভেতরে ইউক্রেনের মাঝারি পাল্লার এই হামলাগুলো ফ্রন্টলাইনে সরবরাহ ব্যাহত করেছে এবং গত মাসে রুশ বাহিনীর অগ্রগতি প্রায় থামিয়ে দিতে সাহায্য করেছে। এই হামলাগুলো রাশিয়ার আকাশ প্রতিরক্ষাকেও দুর্বল করেছে, যা রাশিয়ার আরও গভীরে তেল অবকাঠামো এবং অস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্রে ইউক্রেনের দূরপাল্লার হামলার পথ পরিষ্কার করেছে।

গত জুনে ইউক্রেনের ড্রোন বাহিনীর দায়িত্ব নেন ব্রোভদি। এরপর থেকে এর কার্যক্রম ব্যাপকভাবে বাড়ানো হয়েছে। ৫০ বছর বয়সী সাবেক এই শস্য ব্যবসায়ী জানান, গত এক বছরে মাঝারি পাল্লার যুদ্ধ অভিযানের সংখ্যা ২৮ গুণ বেড়েছে। একই সময়ে রাশিয়ার অভ্যন্তরে দূরপাল্লার হামলা বেড়েছে প্রায় চার গুণ। ব্রোভদির দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম পাঁচ মাসে ইউক্রেনীয় ড্রোন ইউনিটগুলো প্রায় ৫৪০ কোটি ডলার মূল্যের ১৭৪টি রুশ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করেছে।

তিনি জানান, রুশ সেনা, তেল স্থাপনা এবং অস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্রগুলোতে পরিকল্পিতভাবে হামলা চালানোর উদ্দেশ্য হলো মস্কোর যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা ও সদিচ্ছা কমিয়ে দেয়া। ব্রোভদি বলেন, ‘আমরা যুদ্ধের কষ্টগুলো বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ছড়িয়ে দেয়ার পথ খুলছি। ইউক্রেনের প্রায় প্রতিটি শহরের মতো তাদের (রাশিয়ার) বাসিন্দাদেরও এই কষ্ট অনুভব করা উচিত।’ তবে তিনি দাবি করেন, ইউক্রেন সরাসরি কোনো বেসামরিক নাগরিককে লক্ষ্যবস্তু করেনি এবং করবেও না। যদিও সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে রাশিয়া কিয়েভের বিরুদ্ধে রুশ নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে কয়েক ডজন বেসামরিক নাগরিক হত্যার অভিযোগ এনেছে।

কার্নেগি এন্ডোমেন্টের রাশিয়া ও ইউরেশিয়া কর্মসূচির সিনিয়র ফেলো মাইকেল কফম্যান বলেন, ড্রোনের প্রযুক্তিগত উন্নতির ফলে ইউক্রেনের পক্ষে সময়ের সাথে সাথে ক্রিমিয়াকে বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব হতে পারে। তবে রুশ সেনাদের পিছু হটতে বাধ্য করার বৃহত্তর লক্ষ্য অর্জনে একটি সমন্বিত স্থল অভিযানের প্রয়োজন হবে। তিনি জানান, মাঝারি পাল্লার ড্রোন যুদ্ধে ইউক্রেনের বর্তমান সুবিধা ঠেকাতে রাশিয়ার অভিজাত ‘রুবিকন’ ড্রোন ইউনিট কাজ করছে।

গত মার্চে রাশিয়ায় ব্রোভদির বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদের অভিযোগে তার অনুপস্থিতিতে সাজা ঘোষণা করা হয়। তিনি মস্কোর অন্যতম প্রধান লক্ষ্যবস্তু। ফ্রন্টলাইনের কাছে একটি ভূগর্ভস্থ কেন্দ্র থেকে তিনি এই কার্যক্রম পরিচালনা করেন। ২০২২ সালে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে তিনি ‘মাদিয়ারস বার্ডস’ ইউনিট প্রতিষ্ঠা করেন, যা এখন ইউক্রেনের সবচেয়ে শক্তিশালী ড্রোন ব্রিগেডে পরিণত হয়েছে। সেখানে প্রতিটি হামলার ভিডিও ধারণ করে যাচাই করা হয় এবং প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ টেরাবাইট তথ্য সংরক্ষণ করা হয়, যা ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মডেলে ব্যবহার করা হতে পারে।

ব্রোভদির দেয়া তথ্যে দেখা যায়, ২০২৬ সালের প্রথম পাঁচ মাসে ইউক্রেনীয় ড্রোন বাহিনী ৫০ হাজার ৯০০ জনের বেশি রুশ সেনাকে হত্যা করেছে এবং এক লাখ ৭৬ হাজার ৫০০টির বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। প্রতিদিন গড়ে ৩৩৭ জন রুশ সেনা নিহত হয়েছে এবং এক হাজার ১৬৯টি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা হয়েছে। তবে রয়টার্স এসব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি। গত এক বছরে একজন রুশ সেনাকে হত্যার গড় ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৯১৮ ডলার।

বর্তমানে ড্রোন ইউনিটগুলো ইউক্রেনের সশস্ত্র বাহিনীর মাত্র আড়াই শতাংশ হলেও, গত ১২ মাসে রাশিয়ার মোট ক্ষয়ক্ষতির প্রায় এক-তৃতীয়াংশের জন্য তারাই দায়ী। ব্রোভদি জানান, ইউক্রেন তাদের সেনাবাহিনীতে ড্রোন বাহিনীর অংশ পাঁচ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা করেছে।

এএম