বাংলাদেশে অর্থবছর কেন ১ জুলাই থেকে শুরু হয়? এর পেছনের মূল রহস্য

বাজেট ২০২৬-২৭
বাজেট ২০২৬-২৭ | ছবি: এখন টিভি
0

জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আজ (বৃহস্পতিবার, ১১ জুন) বিকেল ৩টায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার মেগা বাজেট উপস্থাপন করতে যাচ্ছেন। এটি দেশের ৫৫তম জাতীয় বাজেট (Why Financial Year in Bangladesh Starts from July 1: The Main Reasons)।

আমরা সাধারণ মানুষ আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ইংরেজি বা বাংলা ক্যালেন্ডার (পঞ্জিকা) মেনে চললেও, রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি বা বাজেট প্রণয়ন চলে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক নিয়মে। বাংলাদেশে ১ জানুয়ারি থেকে নয়, বরং অর্থবছর জুলাই থেকে জুন (Fiscal year from July to June) পর্যন্ত হিসাব করা হয়। কিন্তু কখনো কি মনে প্রশ্ন জেগেছে, কেন এই জুলাই মাসকেই অর্থবছরের শুরু ধরা হয়? এর পেছনে রয়েছে দেশের কৃষি অর্থনীতি, বিশ্বব্যাংকের নীতি এবং ঐতিহাসিক কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণ।

আরও পড়ুন:

১. কৃষিপ্রধান দেশের ফসল উৎপাদন চক্র (Agricultural Crop Cycle and Season)

বাংলাদেশ মূলত একটি কৃষিপ্রধান দেশ এবং দেশের বাজেটের বড় একটি অংশ কৃষির ওপর নির্ভরশীল। জুলাই মাস হলো বর্ষাকাল। এই সময়ে দেশের প্রধান ফসলগুলোর একটি বড় অংশ মাঠে থাকে কিংবা কৃষকের ঘরে উঠতে শুরু করে। বছরের এই মধ্যবর্তী সময়ে কৃষিখাতের সার্বিক উৎপাদন পরিস্থিতি, বাম্পার ফলন বা কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করে বাজেটের বরাদ্দ নির্ধারণ করা সহজ হয়। মূলত কৃষিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতেই জুলাই মাসকে অর্থবছর (July as financial year to prioritize agriculture) করার প্রথা শুরু হয়।

২. বিশ্বব্যাংক ও দাতা সংস্থাগুলোর সাথে সামঞ্জস্যতা (Alignment with World Bank and Western Countries)

উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ (IMF) এবং পশ্চিমা বিভিন্ন দাতা সংস্থার কাছ থেকে ঋণ ও অনুদান নিতে হয়। বিশ্বব্যাংকের নিজস্ব অর্থবছর শুরু হয় ১ জুলাই থেকে। তাদের সাথে মিল রেখে হিসাব করলে বৈদেশিক সাহায্য ও ঋণের হিসাব সহজ হয় (Foreign aid and loan accounting becomes easier)। অতীতের পাকিস্তান আমলে প্রথমে এপ্রিল মাসকে অর্থবছর ধরা হলেও, পরবর্তীতে বিশ্বব্যাংকের ঋণের শর্ত ও সুবিধার কথা বিবেচনা করে তারাও জুলাই প্রথা চালু করে, যা স্বাধীন বাংলাদেশেও বহাল রয়েছে।

আরও পড়ুন:

৩. নতুন সরকারের জন্য বাজেট প্রণয়নের পর্যাপ্ত সময় (Sufficient Time for New Government to Prepare Budget)

রাজনৈতিক দিক থেকে চিন্তা করলে, বাংলাদেশে সাধারণত জাতীয় নির্বাচনগুলো বছরের শেষে (নভেম্বর-জানুয়ারি) অনুষ্ঠিত হয়। জানুয়ারি বা ফেব্রুয়ারিতে যদি কোনো নতুন রাজনৈতিক দল রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে, তবে ১ জুলাই অর্থবছর হওয়ার কারণে তারা বাজেট তৈরির জন্য হাতে প্রায় ৫-৬ মাস সময় পায়। এই দীর্ঘ সময়ে নতুন সরকার জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন বাজেটে তুলে ধরার (Reflecting peoples expectations in the budget) সুবর্ণ সুযোগ পায়।

অর্থবছর কি পরিবর্তন করা সম্ভব? কী বলে বাংলাদেশের সংবিধান? (Can Fiscal Year be Changed in Bangladesh Constitution)

দেশের অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করেন, জুন-জুলাই মাসে বাংলাদেশে তীব্র বর্ষা ও বন্যা দেখা দেয়। ফলে অর্থবছরের একদম শেষ সময়ে এসে উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ ছাড় ও কাজ শেষ করতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা তৈরি হয়। অনেকেই ভারতের মতো ‘এপ্রিল-মার্চ’ অর্থবছর করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, সমস্যা ঋতুতে নয়, বরং অর্থ বরাদ্দের সঠিক ব্যবস্থাপনায়। যদি অবকাঠামোগত ও প্রশাসনিক সংস্কার না করা হয়, তবে মাস পরিবর্তন করে কোনো লাভ হবে না। আইনিভাবে বাংলাদেশের অর্থবছর পরিবর্তন করতে হলে (To change the financial year in Bangladesh) দেশের সংবিধানের বিধান অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সংশোধন আনতে হবে (সংবিধানে অর্থবছরকে ‘বার্ষিক আর্থিক বিবরণী’ হিসেবে অনুচ্ছেদ ৮৭-তে উল্লেখ করা হয়েছে)। তবে বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এর কোনো প্রয়োজন নেই বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

আরও পড়ুন:

একনজরে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের মেগা বাজেট রূপরেখা (At a Glance FY 2026-27 Mega Budget Outline)

আজ ঘোষিত হতে যাওয়া দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বাজেটের মূল অংশগুলো নিচে দেয়া হলো:

  • বাজেটের মোট আকার: ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা।
  • রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা: ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা।
  • সামগ্রিক বাজেট ঘাটতি: ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা (Total budget deficit is 2.43 lakh crore Taka)।
  • জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা: সাড়ে ৬ শতাংশ (GDP growth target 6.5 percent)।
  • মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা: সাড়ে ৭ শতাংশ।

একনজরে জুলাই থেকে অর্থবছর শুরু হওয়ার মূল কারণ ও ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট রূপরেখা

প্রধান কারণসমূহ (Key Reasons) অর্থনৈতিক ও কৌশলগত ব্যাখ্যা (Economic & Strategic Explanations) ২০২৬-২৭ বাজেট রূপরেখা (FY 2026-27 Outline)
কৃষি উৎপাদন ও ফসল চক্র
(Crop Cycle & Agriculture)
জুলাই মাসে বর্ষাকালীন ফসল মাঠে থাকে এবং কিছু ফসল কৃষকের ঘরে ওঠে। কৃষিপ্রধান দেশ হিসেবে এই সময়ে কৃষিখাতের সার্বিক চিত্র বুঝে সঠিক বাজেট বরাদ্দ দেওয়া সহজ হয়। ৯,৩৮,০০০ কোটি টাকা
(বাজেটের মোট আকার)
বিশ্বব্যাংক ও বৈশ্বিক মিল
(World Bank Alignment)
বিশ্বব্যাংকসহ অধিকাংশ আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থার অর্থবছর শুরু হয় ১ জুলাই থেকে। তাদের সাথে মিল রাখলে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বৈদেশিক সাহায্য ও ঋণের হিসাব সহজ হয়। ৬,৯৫,০০০ কোটি টাকা
(রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য)
নতুন সরকারের জন্য সময়
(Time for New Government)
বছরের শেষে নতুন কোনো দল ক্ষমতায় এলে বাজেট প্রণয়নের জন্য তারা প্রায় ৫-৬ মাস সময় পায়, যা জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার নানা প্রতিফলন বাজেটে তুলে আনতে সাহায্য করে। ২,৪৩,০০০ কোটি টাকা
(বাজেট ঘাটতি)
আইনি ও সাংবিধানিক ভিত্তি
(Constitutional Basis)
বাংলাদেশের সংবিধানে বাজেটকে 'বার্ষিক আর্থিক বিবরণী' বলা হয়েছে। এই অর্থবছর পরিবর্তন করতে হলে সংবিধানের সংশ্লিষ্ট অনুচ্ছেদে সংশোধন আনতে হবে, যার বর্তমান প্রয়োজন নেই। প্রায় ৩,০০,০০০ কোটি টাকা
(উন্নয়ন বাজেট / এডিপি)
সামষ্টিক অর্থনৈতিক নির্দেশক ২০২৬-২৭: আজ বৃহস্পতিবার পেশ হতে যাওয়া স্বাধীন বাংলাদেশের ৫৫তম এই জাতীয় বাজেটে দেশের জিডিপি (GDP) প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা সাড়ে ৬% এবং সাধারণ মানুষের স্বস্তির জন্য মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা সাড়ে ৭% নির্ধারণ করা হয়েছে।

আরও পড়ুন:

এসআর