কেন সবসময় বৃহস্পতিবারই দেশের জাতীয় বাজেট পেশ করা হয়?

বাজেট ২০২৬-২৭
বাজেট ২০২৬-২৭ | ছবি: এখন টিভি
1

জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নেতৃত্বাধীন আজ (বৃহস্পতিবার, ১১ জুন) বিকেল ৩টায় নতুন সরকারের প্রথম জাতীয় বাজেট উত্থাপন করতে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এই বিশাল মেগা বাজেটকে ঘিরে সারা দেশে চলছে টানটান উত্তেজনা (Why Bangladesh National Budget is Always Presented on Thursday)।

তবে এই বাজেট ঘোষণার দিনে দেশের কোটি মানুষের মনে একটি সাধারণ কিন্তু অত্যন্ত যৌক্তিক প্রশ্ন দেখা দিয়েছে বাজেট কেন সবসময় বৃহস্পতিবার পেশ করা হয় (Why budget is always presented on Thursday)? স্বাধীনতার পর ১৯৭২-৭৩ অর্থবছর থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত দেশের প্রায় সব বাজেটই এই দিনটিতে উপস্থাপন করা হয়েছে। ব্যতিক্রম ছিল শুধু বিগত ২০২৫-২৬ অর্থবছর, যখন দেশের ৫৪তম বাজেটটি সোমবার উত্থাপন করা হয়েছিল। তা ছাড়া প্রতিবারই কেন এই বিশেষ দিনটিকে বেছে নেওয়া হয়? এর পেছনে লুকিয়ে রয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও সংসদীয় কাঠামোর ৪টি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত কারণ।

আরও পড়ুন:

কেন বাজেট পেশের দিন সবসময় বৃহস্পতিবার? ৪টি প্রধান কারণ (4 Main Reasons Why Budget is Presented on Thursday)

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বা এনবিআর (NBR)-এর সাবেক চেয়ারম্যান ড. আব্দুল মজিদ এই প্রথার পেছনের মূল রহস্য ও সুবিধাগুলো উন্মোচন করেছেন। কারণগুলো নিচে বিশদভাবে আলোচনা করা হলো:

১. কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিশ্রাম ও ধকল মুক্তি (Rest for Budget Making Officials)

একটি পূর্ণাঙ্গ জাতীয় বাজেট প্রণয়ন ও উপস্থাপনের পেছনে সংশ্লিষ্ট অর্থ মন্ত্রণালয় ও এনবিআরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাসের পর মাস দিন-রাত অক্লান্ত পরিশ্রম করতে হয়। বৃহস্পতিবার বাজেট উপস্থাপনের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলে, পরের দুই দিন (শুক্রবার ও শনিবার) তারা কাঙ্ক্ষিত সাপ্তাহিক ছুটি পান। এতে দীর্ঘদিনের মানসিক ও শারীরিক ধকল কাটিয়ে ওঠা তাদের পক্ষে সহজ হয়।

২. শুল্ক ফাঁকি ও অবৈধ পণ্য মজুত রোধ (Preventing Duty Evasion and Product Stockpiling)

বাজেটে কোন কোন পণ্যের দাম বাড়বে বা কমবে তা নিয়ে ব্যবসায়ীদের মাঝে তীব্র আগ্রহ থাকে। বৃহস্পতিবার বিকেলে বাজেট ঘোষণার পরপরই দেশের সব শুল্ক স্টেশন, ব্যাংক এবং বড় বড় পাইকারি বাজার বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে কোনো অসাধু ব্যবসায়ী আগেভাগে পণ্য কিনে অবৈধভাবে মজুত করার বা শুল্ক ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ পায় না (No chance of tax evasion or hoarding)। যেহেতু পরবর্তী দুই দিন সরকারি ছুটি, তাই নতুন ট্যাক্স বা ভ্যাট কার্যকর করার আইনি প্রক্রিয়াগুলো বাজার ব্যবস্থায় স্থিতিশীলভাবে বসে যাওয়ার সময় পায়।

আরও পড়ুন:

৩. আইনি জটিলতা ও তাৎক্ষণিক মামলা এড়ানো (Avoiding Immediate Legal Actions)

বাজেটের অনেক নতুন কর কাঠামো বা শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিকভাবে অনেকেই আইনি পদক্ষেপ বা রিট করতে চাইতে পারেন। কিন্তু বৃহস্পতিবার বাজেট পেশের পর আদালত ও সরকারি অফিস বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কেউ হুট করে কোনো আইনি জটিলতা তৈরি করতে পারে না। দুই দিনের এই বিরতিতে সরকার ও ব্যবসায়ী উভয় পক্ষই নতুন আইনগুলো ঠান্ডা মাথায় মূল্যায়নের সুযোগ পায়।

৪. সংসদ সদস্যদের পর্যালোচনার বাড়তি সময় (Extra Time for MPs to Analyze Budget Copy)

বাজেট উপস্থাপনের ঠিক পরের সপ্তাহে জাতীয় সংসদে সম্পূরক বাজেট পাশ করতে হয় এবং প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর দীর্ঘ আলোচনা ও বিতর্ক চলে। সংসদ সদস্যরা যাতে অর্থমন্ত্রীর দেওয়া বিশাল বাজেট বক্তৃতা ও গ্যাজেট ভালোভাবে পড়াশোনা করতে পারেন (MPs get time to study budget speech and gazette), সে জন্য তাদের কিছুটা সময় প্রয়োজন হয়। বৃহস্পতিবার বাজেট দিলে তারা শুক্র ও শনি এই অতিরিক্ত দুই দিন সময় পান, যা তাদের সংসদীয় বিতর্কে অংশ নিতে সাহায্য করে।

আরও পড়ুন:

একনজরে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের মেগা বাজেট রূপরেখা (At a Glance FY 2026-27 Mega Budget Outline)

বৃহস্পতিবারের এই বিশেষ দিনে আজ সংসদে যে বাজেটটি পাশ হতে যাচ্ছে, তার মূল অর্থনৈতিক নির্দেশকগুলো নিচে দেওয়া হলো:

  • বাজেটের সম্ভাব্য আকার: ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা (দেশের ইতিহাসের সর্বোচ্চ)।
  • রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা: ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা।
  • মোট বাজেট ঘাটতি: ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা (Total budget deficit is 2.43 lakh crore Taka)।
  • জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা: সাড়ে ৬ শতাংশ (GDP growth target 6.5 percent)।
  • মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা: সাড়ে ৭ শতাংশ।
  • বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি): প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা, যার মধ্যে সরকারি নিজস্ব অর্থায়ন ১ লাখ ninety-nine হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক ঋণ ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা।

আরও পড়ুন:

একনজরে বৃহস্পতিবার বাজেট পেশ করার মূল কারণ ও ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট রূপরেখা

প্রধান কারণসমূহ (Key Reasons) কৌশলগত ব্যাখ্যা ও সুবিধা (Strategic Explanations) ২০২৬-২৭ বাজেট কাঠামো (FY 2026-27 Structure)
কর্মকর্তাদের ধকল মুক্তি
(Staff Relaxation)
দীর্ঘদিন দিন-রাত পরিশ্রমের পর বৃহস্পতিবার বাজেট পেশ শেষে অর্থ মন্ত্রণালয় ও এনবিআরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা শুক্র ও শনিবার বিশ্রামের সুযোগ পান। ৯,৩৮,০০০ কোটি টাকা
(বাজেটের মোট আকার)
অবৈধ পণ্য মজুত ও শুল্ক ফাঁকি রোধ
(Preventing Tax Evasion)
বাজেট ঘোষণার পর ব্যাংক, শুল্ক স্টেশন ও বড় বাজার বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অসাধু ব্যবসায়ীরা তাৎক্ষণিকভাবে পণ্য মজুত বা শুল্ক ফাঁকি দিতে পারে না। ৬,৯৫,০০০ কোটি টাকা
(রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য)
আইনি জটিলতা ও রিট এড়ানো
(Avoiding Legal Issues)
নতুন শুল্ক বা করের বিরুদ্ধে হুট করে যাতে কেউ আদালতে রিট বা আইনি চ্যালেঞ্জ করতে না পারে, সেজন্য সাপ্তাহিক ছুটির আগের দিনটি বেছে নেওয়া হয়। ২,৪৩,০০০ কোটি টাকা
(বাজেট ঘাটতি)
সংসদ সদস্যদের পর্যালোচনা
(Analysis Time for MPs)
পরবর্তী সপ্তাহে সম্পূরক বাজেট পাস ও মূল বাজেট আলোচনার আগে সংসদ সদস্যরা বাজেট ডকুমেন্ট ও প্রজ্ঞাপনগুলো পড়ার জন্য ২ দিন বাড়তি সময় পান। প্রায় ৩,০০,০০০ কোটি টাকা
(উন্নয়ন বাজেট / এডিপি)
সামষ্টিক অর্থনৈতিক লক্ষ্যমাত্রা ২০২৬-২৭: আজ বৃহস্পতিবার পেশ হতে যাওয়া স্বাধীন বাংলাদেশের ৫৫তম এই জাতীয় বাজেটে দেশের জিডিপি (GDP) প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা সাড়ে ৬ শতাংশ এবং সাধারণ মানুষের স্বস্তির জন্য মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা সাড়ে ৭ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।

আরও পড়ুন:

এসআর