ফের যুদ্ধে জড়ালো হুতিরা, আতঙ্কে দিন পার করছেন ইয়েমেনবাসী

ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠী
ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠী | ছবি: সংগৃহীত
0

একদিকে ফিলিস্তিন ও লেবাননের প্রতি সমর্থন জানানোর গর্ব, অন্যদিকে ১১ বছরের রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের পর নতুন করে ধ্বংসযজ্ঞের শঙ্কা—এই দুই মেরুতে এখন বিভক্ত ইয়েমেনের সাধারণ মানুষ। লোহিত সাগরে ইসরাইলি জাহাজের ওপর ‘পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা’ আরোপ এবং ইসরাইলকে লক্ষ্য করে মিসাইল ছোড়ার মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ফের যুদ্ধে জড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে হুতি বিদ্রোহীরা। আর এর মাঝেই পুরো অঞ্চল ঘিরে নতুন এক ‘নিরাপত্তা বলয়’ তৈরির হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

গতকাল (সোমবার, ৭ জুন) ইয়েমেনের এই পদক্ষেপকে ‘প্রতিরোধের অক্ষ’ বা অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স-এর ক্রমবর্ধমান সমন্বয়ের প্রমাণ বলে প্রশংসা করেছেন ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) কুদস ফোর্সের প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইসমাইল কায়ানি। তিনি ঘোষণা দেন, হরমুজ প্রণালি থেকে বাব আল-মান্দাব এবং পারস্য উপসাগর থেকে লোহিত সাগর পর্যন্ত একটি নতুন ‘নিরাপত্তা বলয়’ গড়ে তোলা হবে। কায়ানি সতর্ক করে বলেন, এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের আগ্রাসন অব্যাহত থাকলে ‘প্রতিরোধ ফ্রন্ট’ সম্মিলিতভাবে তার কড়া জবাব দেবে। প্রয়োজনে এই বলয়ে আরও নতুন গোষ্ঠী যুক্ত হতে পারে।

এর আগে গত সপ্তাহে ইরান হুমকি দিয়েছিল, ইসরাইল যদি যুদ্ধ চালিয়ে যায়, তবে দক্ষিণ-পূর্ব ইয়েমেন সীমান্তবর্তী গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ বাব আল-মান্দাব প্রণালি বন্ধ করে দেয়া হবে। লোহিত সাগরে ইসরাইল, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলোতে হামলা চালানো হুতিদের পক্ষেই মূলত এই প্রণালি বন্ধ করা সম্ভব। ফিলিস্তিন, লেবানন ও ইরানের ওপর ইসরাইলি হামলা বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত হুতিরা তাদের এই অভিযান চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেছে।

হুতিদের এই সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানিয়েছেন ইয়েমেনের অনেক নাগরিক। রাজধানী সানার ৪৮ বছর বয়সি বাসিন্দা ও খাদ্য সরবরাহকারী আহমেদ আল-ফাকিহ বলেন, ‘একজন ইয়েমেনি হিসেবে আমি আনসারুল্লাহর (হুতি) পদক্ষেপে গর্বিত। তারা ফিলিস্তিন, লেবানন ও ইরানের ভাইদের একা ফেলে যায়নি; বরং এই সম্মানের লড়াইয়ে অংশ নিয়েছে।’ কোনো রাজনৈতিক দলের সমর্থক না হলেও ফাকিহ মনে করেন, মুসলিমদের এই কঠিন সময়ে চুপ থাকা অমানবিক।

ব্যক্তিগত উদ্যোগ হিসেবে তিনি ইসরাইল সংশ্লিষ্ট কোম্পানির পণ্য কেনাও বয়কট করেছেন। ২০২৩ সালে গ্যালাক্সি লিডার জাহাজ জব্দ করা এবং গত আগস্টে (২০২৫) সানায় ইসরাইলি বিমান হামলায় প্রধানমন্ত্রীসহ বেশ কয়েকজনের প্রাণহানির কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘ইসরাইল ইয়েমেনের ওপর ক্ষুব্ধ, কারণ ১৯৭৩ সালের যুদ্ধ থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত আমরা তাদের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থানে দাঁড়িয়েছি।’

তবে আহমেদ আল-ফাকিহর এই আবেগের সঙ্গে একমত নন অনেক ইয়েমেনি। ২০১৫ সালের মার্চ মাস থেকে হুতি ও সৌদি সমর্থিত আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের মধ্যকার গৃহযুদ্ধে ইয়েমেন এখন একটি ধ্বংসস্তূপ। এই সংঘাতে এ পর্যন্ত প্রায় ৩ লাখ ৭৭ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং ৪৫ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।

সানা ও তাইজ শহরের মধ্যে বাস চালানো ৩৯ বছর বয়সি চালক আহমেদ দাগেজ বলেন, ‘১১ বছরের অভ্যন্তরীণ যুদ্ধই আমাদের জন্য অনেক বেশি। যে ক্ষতি হয়েছে, তা পূরণ করতে কয়েক দশক লাগবে। নতুন করে কোনো আঞ্চলিক যুদ্ধে জড়ানোর ভার নেয়ার সক্ষমতা আমাদের নেই।’ দাগেজ সানায় ইসরাইলি বিমান হামলার ভয়াবহতার কথা স্মরণ করে শঙ্কা প্রকাশ করেন যে, গাজার মতো ইয়েমেনেও একই ধরনের গণহত্যা চালাতে পারে ইসরাইল।

অনেক বিশ্লেষক ও সাধারণ নাগরিক আবার মনে করেন, হুতিরা মূলত ‘ইরানের হাতিয়ার’ হিসেবে কাজ করছে। প্রবীণ সাংবাদিক মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘একজন ইয়েমেনি হিসেবে আমার মনে হয় না যে হুতিরা আমাদের কথা ভাবে; তারা কেবল নিজেদের ও ইরানের স্বার্থ রক্ষা করছে। সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা এখন আর হুতিদের হাতে নেই, তা ইরানের হাতে চলে গেছে।’ তিনি মনে করেন, লোহিত সাগরে হুতিদের সাম্প্রতিক এই হামলাগুলো মূলত বিশ্বকে একটি বার্তাই দিচ্ছে—তারা এই অঞ্চলে ইরানের নির্দেশ বাস্তবায়নের প্রধান শক্তি।

এদিকে সোমবার সকালে ইরান ইসরাইলের ওপর তাদের অভিযান স্থগিত করার ঘোষণা দিলেও হুতিরা রাতভর হামলা চালিয়েছে। ইসরাইলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, সোমবার গভীর রাতে দক্ষিণ ইসরাইলের ইলাত অঞ্চলের আকাশে ইয়েমেন থেকে আসা একটি ‘সন্দেহভাজন আকাশযান’ প্রতিহত করা হয়েছে। এছাড়া সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইয়েমেন থেকে ছোড়া একটি ব্যালিস্টিক মিসাইল সৌদি-ইয়েমেন সীমান্তের একটি নির্জন এলাকায় আছড়ে পড়েছে, যা মূলত ওই অঞ্চলের অন্য কোনো দেশের দিকে তাক করে ছোড়া হয়েছিল।

এএম