তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান গত সপ্তাহে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সঙ্গে আলাদা ফোনালাপে শান্তি আলোচনার প্রতি তার দেশের সমর্থনের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। এর আগের সপ্তাহে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনালাপে এরদোয়ান এপ্রিলে শুরু হওয়া যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়টিকে স্বাগত জানান। একই সঙ্গে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে থাকা অমীমাংসিত বিষয়গুলোর সমাধান হবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কৌশলগত নমনীয়তার কারণে তুরস্ক এই আঞ্চলিক অস্থিরতা থেকে লাভবান হলেও তাদের দুর্বল অর্থনীতি এই প্রাপ্তিকে সীমিত করে দিয়েছে। এছাড়া দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে তাদের একক পরাশক্তি হয়ে ওঠার পথও কঠিন হবে।
সাপ্লাই চেইন পরামর্শক প্রতিষ্ঠান টাইডালওয়েভ সলিউশনসের জ্যেষ্ঠ অংশীদার ক্যামেরন জনসন বলেন, ‘এই সংঘাত তুরস্কের দীর্ঘদিনের কৌশলগত অস্পষ্টতাকে সামনে নিয়ে এসেছে, যা তাদের এই অস্থিরতার মধ্যেও অন্যতম লাভবান দেশে পরিণত করেছে।’ ন্যাটো সদস্য হয়েও যুক্তরাষ্ট্র বা চীনের সঙ্গে সরাসরি কোনো পক্ষে না যাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘দিন শেষে তুরস্কের কৌশলগত অস্পষ্টতা ও নমনীয়তা তাদের জন্য একটি সম্পদে পরিণত হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘জ্বালানি থেকে শুরু করে সড়ক পরিবহন, আকাশপথ, কার্গো ও উৎপাদন—সবকিছুর জন্যই তুরস্ক একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প পথ। তাই যেসব কোম্পানি এই অস্থিরতা মোকাবিলা করার চেষ্টা করছে, তাদের জন্য তুরস্ক একটি স্বাভাবিক চাপ কমানোর জায়গা হিসেবে কাজ করছে।’
আরও পড়ুন:
মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য পরাশক্তিগুলো যখন তেলের ওপর নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা করছে, তখন তুরস্কে আগে থেকেই একটি সুপ্রতিষ্ঠিত উৎপাদন খাত, সুশিক্ষিত জনবল এবং তুলনামূলক কম মজুরির সুবিধা রয়েছে। সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আঙ্কারা তাদের এই সুবিধাগুলো প্রতিযোগীদের চেয়ে অনেক দ্রুত ও কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে পারবে বলে জানান জনসন।
বেইজিংভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্যাঙ্গোয়াল ইনস্টিটিউশনের মিডল ইস্ট স্টাডিজ বিভাগের নির্বাহী পরিচালক ঝু জাওয়ি একমত প্রকাশ করে বলেন, ‘ইরান যুদ্ধ আঙ্কারাকে কৌশলগতভাবে কৌশলী হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে।’ বিশ্ববাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির ফলে ইউরেশীয় অঞ্চলের সেতুবন্ধন হিসেবে তুরস্কের ভূমিকা আরও জোরালো হয়েছে। পাশাপাশি রাশিয়া ও তুরস্কের মধ্যে সংযোগকারী ‘তুর্কস্ট্রিম’ পাইপলাইনের গুরুত্বও বেড়েছে। তিনি জানান, এই সংঘাত উপসাগরীয় দেশগুলোতে তুরস্কের ড্রোন ও অন্যান্য প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম রপ্তানির আরও বেশি সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে।
তবে ঝু জাওয়ি মনে করেন, তুরস্ক কাঠামোগতভাবে জয়ী হওয়ার বদলে বরং একটি ‘সীমিত ও সুবিধাবাদী লাভবান’ দেশ। কারণ, এসব অর্জনের সঙ্গে ঝুঁকিও রয়েছে, যার মধ্যে দেশের উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও চলতি হিসাবের ঘাটতি বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা অন্যতম। তিনি উল্লেখ করেন, সংঘাত আরও বাড়লে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও ইরানের মধ্যে আঙ্কারার যে ভারসাম্য রক্ষার নীতি রয়েছে, তা অস্থিতিশীল হতে পারে। এর ফলে তাদের যেকোনো এক পক্ষ বেছে নেয়ার মতো কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়তে হতে পারে, যা তাদের কৌশলগত লাভের চেয়ে বেশি ক্ষতির কারণ হতে পারে।
একটি বৃহত্তর শান্তি চুক্তির জন্য আলোচনা চললেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান বর্তমানে কূটনৈতিক অচলাবস্থার মধ্যে রয়েছে। এপ্রিলে শুরু হওয়া যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও তারা পাল্টাপাল্টি হামলা চালিয়েছে। ওয়াশিংটন বারবার বলে আসছে যে উভয় পক্ষ একটি চুক্তির কাছাকাছি রয়েছে, তবে তারা আরও কঠিন শর্ত আরোপের জন্য চাপ দিচ্ছে। অন্যদিকে তেহরানের দাবি, চূড়ান্ত চুক্তিতে না পৌঁছানো পর্যন্ত কোনো কিছুই নিশ্চিত নয়।
আরও পড়ুন:
হরমুজ প্রণালির কাছে অবস্থিত বন্দর শহর বন্দর আব্বাসের কাছে গত বুধবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান পাল্টাপাল্টি হামলা চালিয়েছে। বাণিজ্যিক চলাচলের জন্য প্রণালিটি এখনো বন্ধ রয়েছে। সপ্তাহান্তে উভয় পক্ষই নতুন করে বিমান হামলার খবর দিয়েছে। এই গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন রুটে দ্বিমুখী নৌ অবরোধ বহাল থাকায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি, সার ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে বড় প্রভাব পড়ছে।
এদিকে তুরস্কের কর্মকর্তারা ‘মিডল করিডোর’-কে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হিসেবে তুলে ধরেছেন। পশ্চিম চীন থেকে মধ্য এশিয়া হয়ে তুরস্ক ও ইউরোপ পর্যন্ত বিস্তৃত এই বাণিজ্য পথটি ইরান ও ইউক্রেন যুদ্ধসহ প্রধান সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলগুলো এড়িয়ে পণ্য পরিবহনে সক্ষম।
তবে ঝু জাওয়ির মতে, বেইজিং ও আঙ্কারার সম্পর্ক কৌশলগত জোটের বদলে ‘সীমিত সহযোগিতা ও নিয়ন্ত্রিত মতপার্থক্যের’ মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। শিনজিয়াং ইস্যু এবং তুর্কিভাষী মধ্য এশিয়ার দেশগুলোতে আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতার কারণে দুই দেশের মধ্যে এই দূরত্ব রয়েছে। জনসনও একমত যে, ভবিষ্যতে চীন-তুরস্ক সম্পর্ক হবে অনেক বেশি বাস্তবমুখী এবং মূলত অর্থনীতিকে কেন্দ্র করে।
তিনি বলেন, ‘ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্য উভয়ের কাছাকাছি হওয়ায় তুরস্ক বাড়তি সুবিধা পাবে, কারণ চীন ইউরোপের কাছাকাছি থাকতে চায়। তুরস্ক চীনা কোম্পানিগুলোকে ঝুঁকি কমানোর এমন একটি সুবিধা দেয়, যার অর্থ হলো তাদের সেখানে একটি নিরাপদ উৎপাদন ভিত্তি রয়েছে, যেখানে হামলার কোনো শঙ্কা নেই।’ তবে যুদ্ধের কারণে তুরস্কের অর্থনৈতিক লাভের পাশাপাশি তাদের সম্ভাব্য ভূরাজনৈতিক অর্জনেরও একটি সীমা রয়েছে।
ঝু জাওয়ি বলেন, ‘তুরস্ক ইসলামী বিশ্বের প্রধান পরাশক্তি হয়ে উঠবে আর সৌদি আরব তা চুপচাপ বসে দেখবে, এমনটা কখনো হবে না। মিসরও আরেকটি সম্ভাব্য প্রতিযোগী হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে, অন্যদিকে রাশিয়া আঙ্কারাকে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করলেও তাদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এর ফলে এরদোয়ানের মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার বাস্তব রূপটি একক পরাশক্তির বদলে বিভিন্ন আঞ্চলিক ইস্যুতে একটি ‘এজেন্ডা নির্ধারণকারী’ শক্তি হিসেবে প্রকাশ পাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।’




