কঙ্গোতে দ্রুত ছড়াচ্ছে ইবোলা; হাসপাতালে জায়গা সংকট

কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের মংবোয়ালু হাসপাতালে সুরক্ষা সরঞ্জাম পরছেন স্বাস্থ্যকর্মীরা
কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের মংবোয়ালু হাসপাতালে সুরক্ষা সরঞ্জাম পরছেন স্বাস্থ্যকর্মীরা | ছবি: গার্ডিয়ান
0

গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে (ডিআরসি) নতুন করে ইবোলা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ায় গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থা ও স্বাস্থ্যকর্মীরা সতর্ক করে বলেছেন, দেশটির ভঙ্গুর স্বাস্থ্যব্যবস্থা পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে এবং সংক্রমণ নিশ্চিত আক্রান্তের সংখ্যার চেয়েও বেশি এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে বলে আশঙ্কা রয়েছে। দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

এনজিও মার্সি কর্পসের ডিআরসি পরিচালক রোজ চুয়েঙ্কো গত বৃহস্পতিবার বলেন, ‘ইবোলার এ প্রাদুর্ভাব যেভাবে দ্রুত ছড়াচ্ছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। আরও বিস্তৃত সংক্রমণের ঝুঁকি বাস্তব এবং জরুরি ভিত্তিতে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহায়তা প্রয়োজন।’

আলিমা সহায়তা সংস্থার বুনিয়া শহরের ফিল্ড সমন্বয়ক হামা আমাদো বলেন, ‘ভাইরাসটি দ্রুত বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে। তিনি বলেন, ‘সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এসেছে—এ কথা বলার সময় এখনও আসেনি।’

এক সপ্তাহ আগে দেশটি ইবোলার ১৭তম প্রাদুর্ভাবের ঘোষণা দেয়। ভাইরাসটি দেহের তরল বা দূষিত বস্তু থেকে ছড়ায়। এতে অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ক্ষতি, রক্তনালির জটিলতা এবং কখনও ভয়াবহ অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক রক্তক্ষরণ হতে পারে। রোগটিতে মৃত্যুহার প্রায় ২৫ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।

গত ২৪ এপ্রিল দেশটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের ইতুরি প্রদেশের রাজধানী বুনিয়ায় একজন আক্রান্ত ব্যক্তির মৃত্যু হয়। পরে কাছের মংবওয়ালু শহরে তার জানাজায় অংশ নেয়া লোকজন মরদেহ স্পর্শ করলে সেখান থেকে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে।

এদিকে হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো দ্রুত রোগীতে পূর্ণ হয়ে যাচ্ছে। মেডসাঁ সঁ ফ্রঁতিয়েরের জরুরি কর্মসূচি ব্যবস্থাপক ট্রিশ নিউপোর্ট বলেন, ‘তাদের একটি দল সপ্তাহান্তে বুনিয়ার সালামা হাসপাতালে সন্দেহভাজন রোগী শনাক্ত করে। কিন্তু আশপাশে কোনো আইসোলেশন ওয়ার্ড খালি পাওয়া যায়নি।’

সামাজিক মাধ্যমে তিনি লেখেন, ‘যে স্বাস্থ্যকেন্দ্রেই ফোন করা হয়েছে, তারা বলেছে—সন্দেহভাজন রোগীতে আমরা পূর্ণ। কোনো জায়গা নেই। এতে বোঝা যায় পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ।’

সহায়তা কার্যক্রমে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে কয়েকটি বিষয়। ভাইরাসটির এ ধরনটির জন্য এখনও অনুমোদিত কোনো টিকা বা চিকিৎসা নেই। প্রাদুর্ভাবের এলাকা দুর্গম ও সংঘাতকবলিত। পাশাপাশি স্থানীয় দাফনপ্রথার সঙ্গে রোগ নিয়ন্ত্রণের কড়াকড়ির সংঘাতও রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বৈদেশিক সহায়তার ঘাটতি। বিশেষ করে ট্রাম্প প্রশাসনের বিদেশি সহায়তা কমানোর সিদ্ধান্ত পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করেছে।

আন্তর্জাতিক রেডক্রস কমিটির (আইসিআরসি) এক গবেষণায় বলা হয়েছে, উত্তর ও দক্ষিণ কিভু প্রদেশের অর্ধেকের বেশি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। সংঘাত ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে প্রায় অর্ধেক প্রতিষ্ঠান উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কর্মী হারিয়েছে। এর মধ্যেই মঙ্গলবার ইতুরি প্রদেশের মামবাসা শহরের কাছে কয়েকটি গ্রামে সশস্ত্র গোষ্ঠী অ্যালায়েড ডেমোক্রেটিক ফোর্সেসের (এডিএফ) হামলায় অন্তত ১৭ জন নিহত হন।

মামবাসার বাসিন্দা জাওয়াদি জিন বলেন, ‘আমরা দুই ধরনের যুদ্ধের মুখোমুখি—একটি অস্ত্রের, আরেকটি রোগের।’ বৃহস্পতিবার বুনিয়ার কাছে রওয়াম্পারায় এক চিকিৎসাকেন্দ্রে আগুন দেয় ক্ষুব্ধ জনতা। তারা ইবোলায় মৃত এক ব্যক্তির মরদেহ নিজেদের মতো করে দাফন করতে চেয়েছিল। কিন্তু কর্তৃপক্ষ মরদেহ বুঝিয়ে দিতে অস্বীকৃতি জানালে এ ঘটনা ঘটে।

ইবোলায় মৃত ব্যক্তির দাফন স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে সম্পন্ন করা হয়, কারণ মরদেহ অত্যন্ত সংক্রামক হতে পারে। তবে স্থানীয় অনেক পরিবার ঐতিহ্যগতভাবে মরদেহ ধোয়া ও স্পর্শ করে দাফন করতে চায়, যা অতীতের প্রাদুর্ভাবে সংক্রমণ বাড়ানোর অন্যতম কারণ ছিল।

শুক্রবার ইতুরি প্রদেশে দাফনের আগের ধর্মীয় জমায়েত নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বিশেষায়িত দল ছাড়া অন্য কারও মাধ্যমে দাফনও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এছাড়া চিকিৎসাবহির্ভূত যানবাহনে মরদেহ পরিবহন বন্ধ এবং জনসমাগম ৫০ জনে সীমিত করা হয়েছে।

বুনিয়ার বাসিন্দা জ্যাকসন লুবুলা বলেন, ‘আমাদের সমাজে প্রতিদিন করমর্দন করা খুব স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু এই রোগের ক্ষেত্রে সামান্য ভুলও বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে।’ অ্যাকশনএইডের এক জরুরি মূল্যায়নে দেখা গেছে, বুনিয়া, নিজি ও নিয়ানকুন্ড এলাকার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ স্কুলে অন্তত একজন সন্দেহভাজন ইবোলা রোগী বা আক্রান্তের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তির তথ্য পাওয়া গেছে।

রওয়াম্পারার বাসিন্দারা বলছেন, রোগটি হঠাৎ করে ছড়িয়ে পড়ে এবং প্রথমদিকে অনেকেই একে ম্যালেরিয়া ভেবে ভুল করেছিলেন। ছেলে হারানো বটওয়িন সোয়াঞ্জে বলেন, ‘সে বলেছিল তার বুকে ব্যথা করছে। পরে ব্যথায় কাঁদতে শুরু করে। এরপর রক্তক্ষরণ ও প্রচণ্ড বমি শুরু হয়।’

আইসিআরসির চিকিৎসক নুরিয়া কারেরা গ্রানিও বলেন, ডিআরসির পরিস্থিতি এখন মানবিক, রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সংকটের সমন্বিত রূপ নিয়েছে। তার ভাষায়, অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে আন্তর্জাতিক সমন্বয় জোরদার করা জরুরি।

আলিমার নিবিড় পরিচর্যা বিশেষজ্ঞ ডা. রিচার্ড কোজান বলেন, ‘পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।’ তার মতে, টিকা ও অনুমোদিত চিকিৎসা না থাকায় রোগীদের দ্রুত চিকিৎসাকেন্দ্রে নেয়া, নিবিড় পরিচর্যা নিশ্চিত করা এবং সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের শনাক্ত করাই এখন প্রধান কৌশল।

এএম