নেত্রকোণায় আগাম বন্যায় ফসলের ব্যাপক ক্ষতি; লোকসানের মুখে হাওরের কৃষকরা

ডুবে যাওয়া ফসল তুলছেন কৃষকরা
ডুবে যাওয়া ফসল তুলছেন কৃষকরা | ছবি: এখন টিভি
0

পানি নেমে যাওয়ায় নেত্রকোণায় ডুবে যাওয়া ফসল কেটে ঘরে তুলছেন হাওরের কৃষকরা। বাড়তি টাকা খরচ করে ফসল কাটলেও অনেক ধান এখন বিক্রির অনুপযোগী। সব মিলিয়ে অতিবৃষ্টি ও আগাম বন্যায় জেলায় আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ অন্তত ৩৭৫ কোটি টাকা। কৃষি বিভাগ বলছে, তালিকা করে প্রণোদনার আওতায় আনা হচ্ছে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের।

বানের পানি নেমে যাওয়ার সাথে সাথে হাওরে ভেসে উঠছে ক্ষতির চিহ্ন। হাওরের বাতাসে এখন শুধু পচা ধানের দুর্গন্ধ আর প্রান্তিক কৃষকদের চোখে-মুখে হতাশার ছাপ।

বাগরার হাওরের কৃষক মো. আবুল কাশেম। চলতি বছর হাওরের প্রায় ৯০ কাঠা জমিতে চাষ করেন ধান। চাষাবাদে প্রায় দুই লাখ টাকা খরচ হলেও উৎপাদন খরচ তোলা নিয়ে চিন্তিত তিনি।

কৃষক আব্দুল কাশেম বলেন, ‘এ পানির মধ্যে ধান কাটা, নৌকা তোলা, আবার তোলা, আবার নেয়া বাড়িতে, টানাটানি ভীষণ একটা কষ্টের মধ্যে পড়ে গেছি আমরা।’

হাওরপাড়ের হাজারও কৃষকের গল্প এখন হতাশা আর অনিশ্চয়তায় ভরা। মহাজনের ঋণ আর সঞ্চিত অর্থে হাওরে ফসল আবাদ করলেও এবার ডুবেছে সব। সেই ফসল কোনো রকমে কেটে পাড়ে তুললেও অনেক ধানে গজিয়েছে চারা।

কৃষকদের একজন বলেন, ‘এ রৌদ্রের কারণে ১০০ বস্তার মধ্যে ২০ পারসেন্ট ধান আনা যাচ্ছে আর ৮০ পারসেন্ট তো নষ্ট হয়ে গেছে।’

আরও পড়ুন:

অন্য আরেকজন কৃষক বলেন, ‘ব্যাপারীরা আসে আবার সঠিক দাম দেয় না, আবার নেয়ও না। ভেজা ধান জন্য নেয় না। এ জন্য কী করবো, এইসব ধান পানিতে ফেলে দিচ্ছি।’

প্রকৃতির বৈরিতা আর বাজারের অস্থিরতা—এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট হাওরের কৃষকরা। এখনো হাওরে একরের পর একর জমি ডুবে আছে পানির নিচে। এসব জমি থেকে ধান সংগ্রহ করতে কৃষকদের কাঠা প্রতি খরচ হচ্ছে ৩০০০ টাকারও বেশি। তবে অতিরিক্ত টাকা খরচ করেও বাজারে কাঙ্ক্ষিত মূল্য মিলছে না বলে অভিযোগ কৃষকদের।

জেলার মদন, মোহনগঞ্জ, খালিয়াজুড়িসহ হাওরের প্রায় ৪১ হাজার হেক্টর জমির মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় ১১ হাজার হেক্টর। কৃষকরা বলছেন, হাওরে ধানের দাম ৫০০ থেকে সর্বোচ্চ ৭০০ টাকা। বাজারে মানভেদে মোটা ধান বিক্রি হচ্ছে সর্বোচ্চ ৯০০ টাকা দরে। এদিকে, কৃষকরা বলছেন, নষ্ট হওয়া ধান বাজারে বিক্রি করা না গেলেও কোনো রকমে হাঁসের খামারিদের কাছে ন্যূনতম দামে বিক্রি করা যাবে।

হাওরের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা তৈরি করে সরকারিভাবে প্রণোদনা ব্যবস্থার কথা জানায় কৃষি বিভাগ। পাশাপাশি কৃষকরা যাতে ন্যায্য মূল্যে ধান বিক্রি করতে পারেন, সে ব্যাপারেও খোঁজ রাখা হচ্ছে।

নেত্রকোণা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. আমিরুল ইসলাম বলেন, ‘হাওড় অঞ্চলের যে কৃষকের সংখ্যা ৩৮ হাজার ২৩৮ জন কৃষক। এখানে কিন্তু আমাদের সব শ্রেণীর কৃষক ক্যাটাগরি, অর্থাৎ ভূমিহীন, ক্ষুদ্র, প্রান্তিক, মাঝারি, বড় চাষি সবাই আছে। আমাদের ৩৯ হাজার ১২৫ জন আমাদের নন-হাওড়ে যে আমাদের ক্ষতি, যে পরিমাণ হচ্ছে, সেটা আমাদের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সংখ্যা আমরা আপাতত আমরা তথ্য পেয়েছি।’

প্রতিবছরের মতো এবারও জেলায় ১ লাখ ৮৫ হাজার ৫৪৭ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে হাওরসহ জেলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয় ১৮ হাজার ৭৪৮ হেক্টর জমি, যার আর্থিক ক্ষতি প্রায় ৩৭৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে শুধু হাওরাঞ্চলেই ক্ষতির পরিমাণ ২৩৭ কোটি টাকা।

এফএস