রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ‘ফুয়েল লোডিং’ কী; কীভাবে আসবে বিদ্যুৎ?

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র | ছবি: এখন টিভি
0

বাংলাদেশ আজ এক অনন্য ইতিহাসের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে। পাবনার ঈশ্বরদীতে পদ্মা নদীর কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রূপপুরে শুরু হয়েছে প্রথম ইউনিটের ফুয়েল লোডিং (Fuel Loading) কার্যক্রম। এর মধ্য দিয়ে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারকারী দেশ হিসেবে বিশ্বের ৩৩তম দেশ হওয়ার গৌরব অর্জন করছে বাংলাদেশ। এটি কেবল একটি কারিগরি প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি বিদ্যুৎকেন্দ্রটির নির্মাণ পর্যায় থেকে সরাসরি উৎপাদন পর্যায়ে উত্তরণের এক ঐতিহাসিক মাইলফলক।

বিষয় (Details) কারিগরি তথ্য (Technical Data) তাৎপর্য (Significance)
ফুয়েল টাইপ ইউরেনিয়াম-২৩৫ (২.৫-৫% পরিশোধিত) কার্বন নিঃসরণহীন উচ্চশক্তির জ্বালানি
পেলেটের শক্তি ৫ গ্রাম ইউরেনিয়াম ১ টন কয়লার সমান তাপ উৎপাদন
রিয়্যাক্টর কোরের অ্যাসেম্বলি মোট ১৬৩টি অ্যাসেম্বলি বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রধান উৎস স্থাপন
নিরাপত্তা ক্লিয়ারেন্স BAERA ও IAEA লাইসেন্স আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ
উৎপাদন ক্ষমতা ১২০০ মেগাওয়াট (ইউনিট-১) দেশের বিশাল জ্বালানি চাহিদা পূরণ

প্রথমবারের মতো পারমাণবিক ফুয়েল লোডিং আসলে কী? (What is First Nuclear Fuel Loading?)

আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (IAEA) এর সংজ্ঞা অনুযায়ী, একটি নবনির্মিত রিয়্যাক্টরের কোরে প্রথমবারের মতো ফুয়েল অ্যাসেম্বলি স্থাপন করাই হলো ‘প্রথম পারমাণবিক ফুয়েল লোডিং’। এটি এমন একটি ধাপ যার মাধ্যমে একটি নির্জীব স্থাপনা জীবন্ত হয়ে ওঠে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রকৃত উৎস হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

রূপপুরে স্থাপিত এক হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার সর্বাধুনিক ভিভিইআর-১২০০ রিয়্যাক্টরে (VVER-1200 Reactor) ফ্রেশ ফুয়েল লোড করার মাধ্যমে প্রথম তাপ উৎপাদন ও পারমাণবিক বিক্রিয়া ঘটানোর পথ উন্মুক্ত হবে。 মূলত বাণিজ্যিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথে এটিই চূড়ান্ত কারিগরি ধাপ হিসেবে বিবেচিত।

আরও পড়ুন:

ইউরেনিয়াম পেলেট: এক অকল্পনীয় শক্তির উৎস (Power of Uranium Pellet)

পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি হিসেবে যে ইউরেনিয়াম ব্যবহার করা হয়, তা মূলত ছোট ছোট দানা বা পেলেট (Uranium Dioxide Pellets) আকারে থাকে।

বিস্ময়কর শক্তিমত্তা: একেকটি পেলেটের ওজন মাত্র ৪.৫ থেকে ৫ গ্রাম।

কয়লার সাথে তুলনা: মাত্র ৫ গ্রাম ওজনের এই একটি পেলেট থেকে যে তাপ উৎপন্ন হয়, তা এক টন কয়লা পোড়ালে পাওয়া তাপের সমান।

পরিবেশবান্ধব জ্বালানি: কোনো প্রকার কার্বন নিঃসরণ ছাড়াই মাত্র একটি পেলেট বাংলাদেশের একটি সাধারণ পরিবারের কয়েক মাসের প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে সক্ষম।

তেজস্ক্রিয় বিকিরণ থেকে সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এই পেলেটগুলোকে জিরকোনিয়াম অ্যালয় দিয়ে তৈরি টিউব বা ফুয়েল রড (Fuel Rod)-এর ভেতরে রাখা হয়। অনেকগুলো রড গুচ্ছাকারে সাজিয়ে তৈরি হয় একেকটি অ্যাসেম্বলি (Assembly), যা প্রায় ১৫ ফুট লম্বা এবং এতে প্রায় ৫৩৪ কেজি পরিশোধিত ইউরেনিয়াম থাকে। রূপপুরের ১ নম্বর ইউনিটের রিয়্যাক্টর কোরে মোট ১৬৩টি এমন অ্যাসেম্বলি ব্যবহার করা হচ্ছে।

অপারেশনাল রেডিনেস: শতভাগ প্রস্তুতির নিশ্চয়তা (Operational Readiness)

পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রথমবার ফুয়েল লোডিংয়ের জন্য ‘অপারেশনাল রেডিনেস’ বা পরিচালনাগত প্রস্তুতি হলো একটি চূড়ান্ত দালিলিক নিশ্চয়তা। এটি নিশ্চিত করে যে, রিয়্যাক্টরে জ্বালানি ভরার জন্য প্রয়োজনীয় জনবল, যন্ত্রপাতি, কাঠামো এবং নিরাপত্তা বিধিমালা শতভাগ প্রস্তুত রয়েছে।

পরিচালনাগত প্রস্তুতির প্রধান শর্তসমূহ:

প্ল্যান্ট সিস্টেম নির্মাণ: নিরাপত্তা ও নকশা অনুযায়ী সব সিস্টেমের নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করা।

কমিশনিং পরীক্ষা: সব প্রি-অপারেশনাল (এ-স্টেজ) পরীক্ষা সম্পন্ন করে নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের অনুমোদন লাভ।

প্রশিক্ষিত জনবল: ইউনিট পরিচালনার জন্য আইএইএ-র মানদণ্ড অনুযায়ী যোগ্য ও অনুমোদিত জনবল নিশ্চিত করা।

নিরাপত্তা ও সেফগার্ডস: জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রয়োজন অনুযায়ী নিরাপত্তা ও সুরক্ষা অবকাঠামো প্রতিষ্ঠা করা।

রেগুলেটরি ক্লিয়ারেন্স: বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (BAERA) থেকে লাইসেন্স ও প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ছাড়পত্র পাওয়া।

মহড়া সম্পন্নকরণ: ডামি ফুয়েল অ্যাসেম্বলির মাধ্যমে সফল পরীক্ষা এবং ফুয়েল লোডিং কার্যক্রমের মহড়া সম্পন্ন করা।

আরও পড়ুন:

বিষয় (Details) কারিগরি তথ্য (Technical Data) তাৎপর্য (Significance)
ফুয়েল অ্যাসেম্বলি মোট ১৬৩টি (প্রতিটিতে ৩১২টি রড) রিয়্যাক্টর কোরের প্রধান শক্তি উৎস
ইউরেনিয়াম পেলেট ৫ গ্রাম ওজনের ছোট দানা ১ টন কয়লার সমতুল্য তাপ উৎপাদন
রিয়্যাক্টর ক্ষমতা ভিভিইআর-১২০০ (১২০০ মেগাওয়াট) সর্বাধুনিক ৩+ প্রজন্মের প্রযুক্তি
সুরক্ষা কবচ জিরকোনিয়াম অ্যালয় টিউব তেজস্ক্রিয় বিকিরণ থেকে শতভাগ সুরক্ষা
অপারেশনাল রেডিনেস IAEA ও BAERA ছাড়পত্র নিরাপদভাবে জ্বালানি লোডিং নিশ্চিতকরণ

লোডিং প্রক্রিয়ার কারিগরি দিক ও নিরাপত্তা (Technicality and Safety of Loading)

ফুয়েল লোডিং প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর এবং এটি বিশেষায়িত রোবটিক মেশিনের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। ১ নম্বর ইউনিটের প্রশিক্ষিত অপারেটররা রাশিয়ান বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় ১৬৩টি ফুয়েল অ্যাসেম্বলি একে একে রিয়্যাক্টরের ভেতরে স্থাপন করবেন। পুরো প্রক্রিয়া চলাকালীন নিউট্রন মনিটরিং ব্যবস্থা সক্রিয় রাখা হয় এবং ‘সাবক্রিটিকালিটি’ (Subcriticality) বজায় রাখতে অ্যাসেম্বলি স্থাপনের ক্রমটি অত্যন্ত কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়।

বাংলাদেশের জন্য ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা (Challenges and Prospects)

বাংলাদেশের মতো একটি দেশের জন্য নির্মাণ কাজ শেষ করে স্বতন্ত্র ও নিরাপদ পরিচালনার স্তরে উন্নীত হওয়া একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এর জন্য কেবল কারিগরি ব্যবস্থাই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন একটি শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণকারী কাঠামো এবং নিবিড় সমন্বয়। আইএইএ-র নির্দেশনা অনুযায়ী নিরাপদ ও টেকসই পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন নিশ্চিত করতে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা অপরিহার্য।

কীভাবে আসবে বিদ্যুৎ: জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের সময়রেখা

জ্বালানি লোড করার পরপরই বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হয় না; এর জন্য বেশ কিছু বৈজ্ঞানিক ধাপ অতিক্রম করতে হয়।

ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি: জ্বালানি লোডের পর চুল্লির ভেতরে নিয়ন্ত্রিত ‘ফিশন বিক্রিয়া’ বা চেইন রিঅ্যাকশন শুরু করা হয়।

প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ: শুরুতে রিয়্যাক্টরকে তার পূর্ণ ক্ষমতার ১-৩ শতাংশ স্তরে রেখে নিউক্লিয়ার ফিজিকসের প্যারামিটারগুলো নিবিড়ভাবে পরীক্ষা করা হয়।

বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রক্রিয়া: পারমাণবিক বিভাজনের বিপুল তাপশক্তি দিয়ে পানিকে উচ্চচাপে বাষ্পে পরিণত করে টারবাইন ঘোরানো হয়, যা থেকে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়।

আরও পড়ুন:

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে থেকে কবে মিলবে বিদ্যুৎ?

  • জ্বালানি লোডিং শেষে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা শেষ করতে আরও প্রায় ৩৪ দিন সময় লাগবে।
  • চুল্লির সক্ষমতা ধাপে ধাপে ৩০ শতাংশে (৩০০ মেগাওয়াট) উন্নীত করতে আরও প্রায় ৪০ দিন সময় প্রয়োজন।
  • আগস্ট ২০২৬: আশা করা হচ্ছে, আগামী আগস্ট মাসের দিকে পরীক্ষামূলকভাবে জাতীয় গ্রিডে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হবে।
  • পূর্ণ ক্ষমতা: প্রথম ইউনিট থেকে ১,২০০ মেগাওয়াট পূর্ণ ক্ষমতায় বিদ্যুৎ পেতে প্রায় ১০ মাস সময় লাগতে পারে।

রূপপুর প্রকল্পের পটভূমি ও গুরুত্ব

পারমাণবিক শক্তির এই স্বপ্নযাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৬১ সালে। স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৯৫ সালের জাতীয় জ্বালানি নীতিতে এটি অন্তর্ভুক্ত হয় এবং ২০১১ সালে রাশিয়ার সাথে চুক্তির মাধ্যমে গতি পায়।

বিশাল বিনিয়োগ: প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা।

সুদীর্ঘ আয়ুষ্কাল: সাধারণ কেন্দ্র ২৫-৩০ বছর চললেও রূপপুর পারমাণবিক কেন্দ্র চলবে কমপক্ষে ৬০ বছর।

কর্মসংস্থান: নির্মাণকালে প্রতিদিন ২০-২৫ হাজার মানুষ কাজ করেছেন এবং বর্তমানে আড়াই হাজার মানুষের স্থায়ী কর্মসংস্থান হয়েছে।

ধাপ (Phase) সময়কাল (Timeline) লক্ষ্যমাত্রা (Goal)
ফিজিক্যাল স্টার্টআপ জ্বালানি লোডিংয়ের পর ৩৪ দিন প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করা
সক্ষমতা বৃদ্ধি (৩০%) পরবর্তী ৪০ দিন চুল্লির ক্ষমতা ৩০০ মেগাওয়াটে উন্নীত করা
জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ আগস্ট ২০২৬ (সম্ভাব্য) পরীক্ষামূলক ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ
পূর্ণ সক্ষমতা (১০০%) ১০ মাস পর ১২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন

এসআর