ইউরেনিয়াম কী, কেন আলোচনায়; জানুন আদ্যোপান্ত

ইউরেনিয়াম
ইউরেনিয়াম | ছবি: এখন টিভি
0

বর্তমান বিশ্বের রাজনীতি ও নিরাপত্তার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা একটি নাম হলো ‘ইউরেনিয়াম’ (Uranium)। একদিকে এটি যেমন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো প্রকল্পের মাধ্যমে আধুনিক সভ্যতার উজ্জ্বল ভবিষ্যতের প্রতীক, অন্যদিকে পারমাণবিক বোমার (Nuclear Bomb) মতো ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের কারিগর। সম্প্রতি রূপপুর প্রকল্পের জ্বালানি আসার পর থেকে বাংলাদেশে ইউরেনিয়াম নিয়ে সাধারণ মানুষের আগ্রহ তুঙ্গে।

একনজরে ইউরেনিয়ামের তথ্য তালিকা

বৈশিষ্ট্যবিবরণবিশদ তথ্য
আবিষ্কারকমার্টিন হাইনরিখ ক্ল্যাপরথ (১৭৮৯)
পারমাণবিক সংখ্যা৯২ (প্রতীক: U)
ঘনত্ব১৮.৭ গ্রাম/সেমি³
প্রধান আইসোটোপU-235, U-238
প্রধান ব্যবহারপারমাণবিক বিদ্যুৎ ও প্রতিরক্ষা
তদারকি সংস্থাআন্তর্জাতিক অ্যাটমিক এনার্জি এজেন্সি (IAEA)

ইউরেনিয়াম আসলে কী? (What is Uranium)

ইউরেনিয়াম হলো প্রকৃতিতে পাওয়া যায় এমন একটি অত্যন্ত ভারী এবং তেজস্ক্রিয় ধাতব মৌল (Radioactive Element)। এটি রুপালি-ধূসর রঙের এবং পানির তুলনায় প্রায় ১৮.৭ গুণ বেশি ঘন। রসায়নের পর্যায় সারণিতে এর প্রতীক ‘U’ এবং পারমাণবিক সংখ্যা ৯২।

১৭৮৯ সালে মার্টিন হাইনরিখ ক্ল্যাপরথ এটি আবিষ্কার করেন। এর প্রায় এক শতাব্দী পর হেনরি বেকরেল ইউরেনিয়ামের তেজস্ক্রিয়তা (Radioactivity) আবিষ্কার করেন, যা আধুনিক পারমাণবিক বিজ্ঞানের (Nuclear Science) ভিত্তি স্থাপন করে।

ইউরেনিয়ামের প্রকারভেদ ও শক্তি (Types of Uranium & Power)

প্রাকৃতিক ইউরেনিয়ামে মূলত তিনটি আইসোটোপ (Isotopes) থাকে:

  • ইউরেনিয়াম-২৩৫ (U-235): এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটি সহজে বিভাজিত হয়ে বিপুল শক্তি উৎপন্ন করতে পারে।
  • ইউরেনিয়াম-২৩৮ (U-238): প্রকৃতিতে এটিই সবচেয়ে বেশি পরিমাণে থাকে।
  • ইউরেনিয়াম-২৩৪ (U-234): এটি অত্যন্ত বিরল।

শক্তির তুলনা: মাত্র ১ কেজি ইউরেনিয়াম-২৩৫ থেকে যে পরিমাণ শক্তি (Energy) পাওয়া সম্ভব, তা পেতে প্রায় ৩৪ লাখ টনেরও বেশি কয়লা পোড়াতে হয়।

ইউরেনিয়ামের বহুমুখী ব্যবহার (Uses of Uranium)

ইউরেনিয়াম বর্তমানে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে ব্যবহৃত হচ্ছে:

বিদ্যুৎ উৎপাদন (Power Generation): পারমাণবিক চুল্লিতে (Nuclear Reactor) নিয়ন্ত্রিত ফিশন বিক্রিয়ার মাধ্যমে বিশ্বের প্রায় ১০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়।

চিকিৎসা ও কৃষি (Medicine & Agriculture): ক্যানসার চিকিৎসায় রেডিওথেরাপি (Radiotherapy), মেডিক্যাল ইমেজিং এবং উন্নত জাতের ফসল উদ্ভাবনে এর তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ ব্যবহৃত হয়।

প্রতিরক্ষা খাত (Defense Sector): সামরিক সাবমেরিন এবং ট্যাঙ্কের বর্ম তৈরিতে ডিপ্লিটেড ইউরেনিয়াম (Depleted Uranium) ব্যবহার করা হয়।

পারমাণবিক বোমা ও ইউরেনিয়াম (Uranium in Atomic Bomb)

ইউরেনিয়ামের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো পারমাণবিক বোমা। ১৯৪৫ সালে জাপানের হিরোশিমায় নিক্ষিপ্ত ‘লিটল বয়’ (Little Boy) বোমাটিতে ইউরেনিয়াম-২৩৫ ব্যবহার করা হয়েছিল। অনিয়ন্ত্রিত চেইন রিঅ্যাকশনের (Chain Reaction) ফলে সৃষ্ট সেই বিস্ফোরণ মুহূর্তেই একটি শহরকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছিল।

ইউরেনিয়াম উৎপাদন ২০২৬: শীর্ষ দেশসমূহ ও খনি উত্তোলনের আধুনিক পদ্ধতি

বৈশ্বিক অর্থনীতি ডেস্ক: বর্তমান বিশ্বের মোট ইউরেনিয়াম চাহিদার সিংহভাগ পূরণ করে মাত্র ৫টি দেশ। বিশেষ করে ২০২৬ সালে এসে কাজাখস্তান তার আধিপত্য আরও সুসংহত করেছে। আন্তর্জাতিক অ্যাটমিক এনার্জি এজেন্সি (IAEA) এবং ওয়ার্ল্ড নিউক্লিয়ার অ্যাসোসিয়েশন (WNA)-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী বৈশ্বিক উৎপাদনের চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো।

১. ইউরেনিয়াম উৎপাদনকারী শীর্ষ ৫টি দেশ (Top 5 Uranium Producing Countries 2026)

অবস্থান (Rank)দেশের নাম (Country)বিশ্ববাজারের শেয়ার (Global Share)প্রধান খনিসমূহ (Major Mines)
কাজাখস্তান (Kazakhstan)৪৩% - ৪৫%ইনকাই (Inkai), বুদোনভস্কয় (Budenovskoye)
কানাডা (Canada)১৫% - ১৮%সিগার লেক (Cigar Lake), ম্যাকআর্থার রিভার
নামিবিয়া (Namibia)১০% - ১২%হুসাব (Husab), রসিং (Rossing)
অস্ট্রেলিয়া (Australia)৮% - ১০%অলিম্পিক ড্যাম (Olympic Dam), ফোর মাইল
উজবেকিস্তান (Uzbekistan)৫% - ৭%নাভোই (Navoi Operations)

দ্রষ্টব্য: রাশিয়া, চীন এবং নাইজারও গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদনকারী দেশ, তবে তারা বর্তমানে তাদের অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

২. ইউরেনিয়াম খনি উত্তোলন পদ্ধতি (Uranium Mining Methods)

ইউরেনিয়াম উত্তোলনের জন্য প্রধানত তিনটি পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়। বর্তমানে পরিবেশগত সুরক্ষা এবং খরচ কমানোর জন্য আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে।

ক. ইন-সিটু রিকভারি বা আইএসআর (In-Situ Recovery - ISR)

এটি বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় পদ্ধতি (বিশেষ করে কাজাখস্তান ও উজবেকিস্তানে)। ভূগর্ভস্থ ইউরেনিয়াম স্তরে পাইপের মাধ্যমে এক ধরনের রাসায়নিক দ্রবণ (সাধারণত অক্সিজেনযুক্ত পানি বা ক্ষার) প্রবেশ করানো হয়। এই দ্রবণ পাথর থেকে ইউরেনিয়ামকে গলিয়ে নেয়, যা পরে অন্য পাইপ দিয়ে ওপরে পাম্প করে তোলা হয়। মাটির উপরে বড় গর্ত করার প্রয়োজন হয় না এবং পরিবেশের ক্ষতি কম হয়।

খ. ওপেন-পিট মাইনিং (Open-Pit Mining)

যখন ইউরেনিয়ামের আকরিক ভূপৃষ্ঠের খুব কাছাকাছি থাকে তখন এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। মাটির ওপরের স্তর সরিয়ে বিশাল গর্ত করে পাথর উত্তোলন করা হয়। নামিবিয়ার ‘হুসাব’ খনি এই পদ্ধতির বড় উদাহরণ।

গ. আন্ডারগ্রাউন্ড মাইনিং (Underground Mining)

ইউরেনিয়াম আকরিক যখন অনেক গভীরে থাকে, তখন সুড়ঙ্গ তৈরি করে এটি উত্তোলন করা হয়। মাটির গভীরে লিফট ও সুড়ঙ্গ তৈরি করে ডিনামাইট ব্লাস্টিংয়ের মাধ্যমে আকরিক সংগ্রহ করা হয়। কানাডার উচ্চমানের আকরিকগুলো সাধারণত এভাবেই তোলা হয়।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র আপডেট ২০২৬: কবে জাতীয় গ্রিডে আসছে পরমাণু বিদ্যুৎ?

বাংলাদেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের স্বপ্ন এখন বাস্তবে রূপ নেওয়ার পথে। পাবনার ঈশ্বরদীতে নির্মাণাধীন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের (RNPP) প্রথম ইউনিট থেকে পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। ২০২৬ সালের মধ্যে দেশের বিদ্যুৎ খাতের এই ‘গেম চেঞ্জার’ প্রকল্পটি জাতীয় গ্রিডে বড় পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে।

একনজরে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র

  • অবস্থান: ঈশ্বরদী, পাবনা।
  • প্রযুক্তি: রুশ প্রযুক্তির VVER-1200 রিঅ্যাক্টর।
  • মোট উৎপাদন ক্ষমতা: ২৪০০ মেগাওয়াট (১২০০+১২০০)।
  • জ্বালানি: ইউরেনিয়াম-২৩৫।
  • প্রথম ইউনিটের চালুর সম্ভাব্য তারিখ: মার্চ - মে, ২০২৬।
  • সহযোগিতায়: রোসাটম (রাশিয়া)।

১. প্রকল্পের বর্তমান অগ্রগতি (Current Progress Status)

২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের সামগ্রিক কাজ প্রায় ৯৫ শতাংশের বেশি সম্পন্ন হয়েছে। এরইমধ্যে রাশিয়ার সহযোগিতায় প্রথম ইউনিটের রিঅ্যাক্টর কোরে ‘ফ্রেশ নিউক্লিয়ার ফুয়েল’ বা ইউরেনিয়াম লোড করার প্রক্রিয়া এবং ক্রিটিকালিটি পরীক্ষা (Criticality Test) সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। প্রথম ইউনিটের ফিজিক্যাল স্ট্রাকচার এবং টারবাইন আইল্যান্ডের কাজ ১০০ শতাংশ শেষ। এখন মূলত কন্ট্রোল সিস্টেম এবং সেফটি মেকানিজমগুলোর নিবিড় পর্যবেক্ষণ চলছে। রূপপুর থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য যমুনা ও পদ্মা নদীর ওপর দিয়ে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন সঞ্চালন লাইনের (Transmission Line) কাজ এখন শেষ পর্যায়ে।

২. গ্রিডে বিদ্যুৎ সংযোগের সময়সীমা (Commissioning Timeline)

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী—

  • প্রথম ইউনিট (১২০০ মেগাওয়াট): ২০২৬ সালের মার্চ থেকে মে মাসের মধ্যে প্রথম ইউনিট থেকে বাণিজ্যিক উৎপাদন (Commercial Operation) শুরু হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। এর আগে ৩-৪ মাস এটি পরীক্ষামূলকভাবে জাতীয় গ্রিডে (Test Run) বিদ্যুৎ সরবরাহ করবে।
  • দ্বিতীয় ইউনিট (১২০০ মেগাওয়াট): ২০২৬ সালের শেষার্ধে বা ২০২৭ সালের শুরুর দিকে দ্বিতীয় ইউনিটটি চালুর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

৩. রূপপুর প্রকল্পের প্রভাব (Impact on Power Sector)

পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ: এই কেন্দ্র থেকে বছরে ২৪০০ মেগাওয়াট কার্বন-মুক্ত বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে, যা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বড় ভূমিকা রাখবে। দীর্ঘমেয়াদে পারমাণবিক বিদ্যুৎ হবে দেশের সবচেয়ে সস্তা বিদ্যুতের উৎস। আমদানিকৃত কয়লা বা গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে রূপপুর প্রকল্প দেশের বেস-লোড বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করবে।

এসআর