বাংলাদেশে কেন এত বজ্রপাত? কোন জেলাগুলো বেশি ঝুঁকিতে, দেখুন তালিকা

বাংলাদেশে বজ্রপাতের কারণ কী
বাংলাদেশে বজ্রপাতের কারণ কী | ছবি: এখন টিভি
0

বাংলাদেশে গত কয়েকদিনে বজ্রপাতে (Lightning) কমপক্ষে ৪০ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, প্রতিবছর এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রায় ৩০০ মানুষ প্রাণ হারান। মূলত মার্চ থেকে মে মাস, এই প্রাক-বর্ষার মৌসুমেই (Pre-monsoon Season) দেশে ৩৮ শতাংশ বজ্রঝড় ও তীব্র বজ্রপাত ঘটে থাকে। কিন্তু প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় আমাদের এখানে কেন এর প্রকোপ এত বেশি?

বিষয় (Topic) বিস্তারিত তথ্য (Detailed Info)
শীর্ষ ঝুঁকিপূর্ণ জেলা সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, টাঙ্গাইল, পাবনা, রাজশাহী
প্রধান কারণসমূহ ভৌগোলিক অবস্থান, বায়ুদূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তন
সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি মার্চ থেকে মে (প্রাক-বর্ষা মৌসুম)
নিরাপদ কৌশল বজ্রধ্বনি শুনলে পাকা দালানে বা নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়া

ভৌগোলিক অবস্থান ও বাতাসের সংঘাত (Geographical Location and Wind Conflict)

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানই বজ্রপাতের প্রধান কারণ। দক্ষিণ-পশ্চিম দিক থেকে আসা জলীয়বাষ্পপূর্ণ বাতাস (Moist Air) সিলেট ও চট্টগ্রামের পাহাড়গুলোতে ধাক্কা খেয়ে ওপরে উঠে ঠান্ডা হয়। অন্যদিকে, উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে আসা উষ্ণ ও শুষ্ক বাতাসের সাথে এর সংঘাত ঘটে। এই দুই বিপরীতধর্মী বাতাসের মিলনে তৈরি হয় দানবীয় বজ্রমেঘ (Thundercloud/Cumulonimbus)।

আরও পড়ুন:

বায়ুদূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব (Impact of Air Pollution and Climate Change)

বজ্রপাত বাড়ার পেছনে বায়ুদূষণ (Air Pollution) ও জলবায়ু পরিবর্তনকে দায়ী করছেন আবহাওয়াবিদরা। বাতাসে সালফেট কণার পরিমাণ বাড়লে তা বজ্রমেঘ তৈরিতে অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। এছাড়া বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে বাষ্পায়নের হার (Evaporation Rate) বাড়ছে, যা বজ্রপাতের তীব্রতা বাড়িয়ে দিচ্ছে। সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, টাঙ্গাইল ও রাজশাহীর মতো এলাকাগুলো এখন বজ্রপাতের হটস্পটে (Lightning Hotspot) পরিণত হয়েছে।

সচেতনতাই জীবন বাঁচাবে (Awareness Saves Lives)

বজ্রধ্বনি শোনামাত্রই নিরাপদ আশ্রয়ে (Safe Shelter) যাওয়া এবং খোলা জায়গায় কাজ করা চাষি ও মৎস্যজীবীদের দ্রুত সতর্কতা অবলম্বন করাই মৃত্যুর হার কমানোর একমাত্র উপায়।

অবস্থান (Location) করণীয় (What to do) বর্জনীয় (What to avoid)
বাড়ির ভেতরে বৈদ্যুতিক প্লাগ খুলে রাখুন জানালা স্পর্শ ও পানি ব্যবহার
খোলা মাঠে হাঁটু গেড়ে গুটিসুটি হয়ে বসুন দৌড়ানো বা শুয়ে পড়া
নদী বা জলাশয়ে দ্রুত তীরে উঠে আসুন গোসল করা বা মাছ ধরা
রাস্তায় বা ভ্রমণে পাকা দালান বা গাড়িতে থাকুন গাছ বা বৈদ্যুতিক খুঁটির নিচে দাঁড়ানো

আরও পড়ুন:

বজ্রপাত সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও উত্তর (Q&A on Lightning)

প্রশ্ন: বাংলাদেশে কোন কোন জেলা বজ্রপাতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ? (Which districts are most at risk of lightning?)

উত্তর: ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ, পাবনা ও রাজশাহী জেলা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে।

প্রশ্ন: বজ্রপাত কেন হয়? (Why does lightning occur?)

উত্তর: মেঘের ভেতরে বাতাসের ঘর্ষণে পজিটিভ ও নেগেটিভ চার্জ তৈরি হয়। যখন এই দুই বিপরীত চার্জের শক্তি অনেক বেড়ে যায়, তখন বিদ্যুৎ চমকায় এবং বজ্রপাত ঘটে।

প্রশ্ন: বজ্রপাত থেকে বাঁচার প্রধান উপায় কী? (What is the main way to survive lightning?)

উত্তর: বজ্রপাতের মেঘ ডাকলে বা আকাশ কালো হলে দ্রুত কোনো পাকা দালানের নিচে বা নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে হবে। খোলা মাঠ বা গাছের নিচে থাকা যাবে না।

প্রশ্ন: বজ্রপাতের সময় বাড়িতে থাকলে কী করা উচিত? (What to do during lightning if at home?)

উত্তর: জানালার কাছ থেকে দূরে থাকতে হবে এবং সকল বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির (যেমন: ফ্রিজ, টিভি) প্লাগ খুলে রাখা নিরাপদ। পানি ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকাও ভালো।

প্রশ্ন: গাড়ির ভেতরে থাকলে কি বজ্রপাত থেকে বাঁচা সম্ভব? (Is it safe inside a car during lightning?)

উত্তর: হ্যাঁ, যদি গাড়ির জানালা ও দরজা বন্ধ থাকে, তবে ধাতব বডি ‘ফ্যারাডে কেজ’ হিসেবে কাজ করে আপনাকে সুরক্ষিত রাখবে। তবে গাড়ির বডি স্পর্শ করা যাবে না।

প্রশ্ন: বজ্রপাতের সময় পুকুরে গোসল করা কি বিপজ্জনক? (Is it dangerous to bathe in a pond during lightning?)

উত্তর: অত্যন্ত বিপজ্জনক। পানি বিদ্যুৎ পরিবাহী, তাই বজ্রপাতের সময় পুকুর বা নদী থেকে দূরে থাকতে হবে।

প্রশ্ন: গাছের নিচে দাঁড়ালে কেন বজ্রপাত বেশি হয়? (Why does lightning strike trees?)

উত্তর: গাছ সাধারণত উঁচু হয় এবং এতে জলীয় বাষ্প থাকে, যা মাটির সাথে চার্জ চলাচলের সহজ পথ তৈরি করে দেয়। ফলে বজ্রপাত গাছকেই বেশি টার্গেট করে।

প্রশ্ন: বাংলাদেশে কোন মাসে সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত হয়? (Which month has the most lightning in Bangladesh?)

উত্তর: প্রাক-বর্ষার সময় অর্থাৎ মার্চ, এপ্রিল এবং মে মাসে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত রেকর্ড করা হয়।

প্রশ্ন: বজ্রপাত নিরোধক দণ্ড বা আর্থিং কী কাজ করে? (How does a lightning rod work?)

উত্তর: এটি বজ্রপাতের বিদ্যুৎকে সরাসরি মাটিতে পাঠিয়ে দেয়, ফলে ভবনের বা মানুষের কোনো ক্ষতি হয় না।

প্রশ্ন: বজ্রপাত হওয়ার কতক্ষণ পর বাইরে বের হওয়া নিরাপদ? (When is it safe to go out after lightning?)

উত্তর: শেষ বজ্রধ্বনি শোনার অন্তত ৩০ মিনিট পর নিরাপদ আশ্রয় থেকে বের হওয়া উচিত।

প্রশ্ন: বজ্রপাতে আহত ব্যক্তিকে স্পর্শ করলে কি কারেন্ট লাগবে? (Will I get a shock if I touch a lightning victim?)

উত্তর: না, বজ্রপাতে আহত ব্যক্তির শরীরে বিদ্যুৎ জমা থাকে না। তাকে দ্রুত সিপিআর (CPR) বা প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া জরুরি।

প্রশ্ন: রাবার বা চপ্পল কি বজ্রপাত থেকে বাঁচাতে পারে? (Can rubber shoes protect from lightning?)

উত্তর: এটি একটি ভুল ধারণা। বজ্রপাতের বিশাল বিদ্যুৎ প্রবাহ ঠেকানোর জন্য জুতোর রাবারের সোল পর্যাপ্ত নয়।

প্রশ্ন: বজ্রপাতের সময় মোবাইল বা ল্যাপটপ ব্যবহার করা কি নিরাপদ? (Is it safe to use mobile/laptop during lightning?)

উত্তর: কর্ডলেস ফোন বা মোবাইল ব্যবহার নিরাপদ, তবে এগুলো চার্জে লাগিয়ে ব্যবহার করা যাবে না। তারযুক্ত ল্যান্ডফোন ব্যবহার করা বিপজ্জনক।

প্রশ্ন: বজ্রপাতের সময় যদি খোলা মাঠে থাকেন তবে কী করবেন? (What to do if caught in an open field?)

উত্তর: মাটিতে উপুড় হয়ে শোবেন না। দুই পা একসাথে করে মাথা নিচু করে দুই হাত দিয়ে কান ঢেকে হাঁটু গেড়ে বসে থাকুন। এতে শরীরের উচ্চতা কম থাকে।

প্রশ্ন: বজ্রপাত বাড়ার পেছনে বায়ুদূষণের ভূমিকা কী? (How does air pollution affect lightning?)

উত্তর: বাতাসে সালফেট কণা ও কার্বনের মাত্রা বাড়লে মেঘের ঘনত্ব ও ঘর্ষণ বেড়ে যায়, যা বজ্রপাতের সংখ্যা বাড়িয়ে দেয়।


এসআর