রূপপুর থেকে বিদ্যুৎ মিলবে কত বছর?

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র | ছবি: এখন টিভি
1

দীর্ঘ এক দশকের প্রস্তুতি, অবকাঠামো নির্মাণ ও জটিল কারিগরি সক্ষমতা অর্জনের পর আজ (মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল) থেকে শুরু হতে যাচ্ছে পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে জ্বালানি লোডিং কার্যক্রম। এর মাধ্যমে বিশ্বের ৩৩তম দেশ হিসেবে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী দেশের অভিজাত ক্লাবে প্রবেশ করতে যাচ্ছে।

কেন্দ্রটি চালু হলে এর স্বাভাবিক আয়ুষ্কাল হবে ৬০ বছর। এই পুরো সময়জুড়ে পাওয়া যাবে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ। তদুপরি, প্রয়োজনীয় মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ সাপেক্ষে আরও ৩০ বছর পর্যন্ত কেন্দ্রটির আয়ু বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। সব মিলিয়ে ৯০ বছর পর্যন্ত সেবা দিতে পারে এই কেন্দ্র।

প্রথম ইউনিটের পারমাণবিক চুল্লিতে বিক্রিয়ার জন্য প্রয়োজন ১৬৩টি ইউরেনিয়াম বান্ডেল। প্রতিটি বান্ডেলে রয়েছে ১৫টি করে ইউরেনিয়াম প্লেটসমৃদ্ধ রড। দুই বছর আগেই বাংলাদেশ ১৬৮টি বান্ডেল সংগ্রহ করেছে। ১৬৩টি চুল্লি ব্যবহার হবে, বাকি ৫টি থাকবে সংরক্ষণে।

সব বান্ডেল চুল্লিতে স্থাপন করতে সময় লাগবে ৪০ থেকে ৪৫ দিন। এরপর নিউক্লিয়ার ফিশন প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন তাপে পানি বাষ্পে পরিণত হবে, সেই বাষ্প টারবাইন ঘুরিয়ে তৈরি করবে বিদ্যুৎ।

একবার জ্বালানি লোড করলে তা দিয়ে চলবে টানা দেড় বছর। ফলে তেল, গ্যাস বা কয়লার মতো নিয়মিত জ্বালানি কেনার ঝামেলা নেই। দেড় বছর পর পুরো জ্বালানি একসঙ্গে পরিবর্তন না করে এক-তৃতীয়াংশ করে বদলালেই চলে।

জ্বালানি লোডিংয়ের পরেও শতাধিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করতে হবে। সব ধাপ সফলভাবে পার হলে কয়েক মাস পর ধাপে ধাপে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ যুক্ত হবে।

আরও পড়ুন:

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুটি ইউনিট থেকে মোট ২,৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হবে। প্রতিটি ইউনিটের ক্ষমতা ১,২০০ মেগাওয়াট। এই কেন্দ্রটি যখন পূর্ণ ক্ষমতায় চলবে, তখন দেশের মোট চাহিদার প্রায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বিদ্যুৎ একা এই কেন্দ্র থেকেই সরবরাহ করা সম্ভব হবে। এটি বেসলোড পাওয়ার প্ল্যান্ট হিসেবে কাজ করবে, অর্থাৎ এখান থেকে ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে, যা শিল্পায়নের জন্য অত্যন্ত জরুরি।

বাণিজ্যিক উৎপাদনের চূড়ান্ত ধাপ হিসেবে আগস্ট মাস নাগাদ পরীক্ষামূলকভাবে জাতীয় গ্রিডে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হতে পারে বলে আশা করছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়। তবে প্রতিটি স্তরে শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও সময়সাপেক্ষ হওয়ায় জাতীয় গ্রিডে পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ পৌঁছাতে প্রায় ১০ মাস সময় লেগে যাবে। ধাপে ধাপে সম্পন্ন হওয়া এই বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়াটি সফল হলে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে পরমাণু শক্তি দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিচালনা পর্বে স্থায়ীভাবে প্রবেশ করবে।

বর্তমানে বিশ্বের ৩২টি দেশে ৪৪০টিরও বেশি পারমাণবিক চুল্লি সচল রয়েছে। এই ধরনের বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উপকারভোগী শীর্ষ দেশ হলো- যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, চীন, রাশিয়া এবং দক্ষিণ কোরিয়া। দেশগুলো এই প্রযুক্তিতে সবচেয়ে এগিয়ে। ফ্রান্স তাদের মোট চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশ বিদ্যুৎই পরমাণু শক্তি থেকে পায়।

প্রতিবেশী দেশ ভারত ও পাকিস্তান অনেক আগে থেকেই এই প্রযুক্তিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে আসছে। নতুন দেশ হিসেবে বাংলাদেশ ও সংযুক্ত আরব আমিরাত সম্প্রতি এই তালিকায় যুক্ত হলো।

রূপপুর প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশ শুধু সস্তা ও কার্বনমুক্ত বিদ্যুৎই পাবে না, বরং এই উচ্চপ্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে দেশের প্রকৌশলীদের দক্ষতা বৈশ্বিক মানে উন্নীত হবে। এটি দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল একটি প্রকল্প। এতে মোট ব্যয় হয়েছে প্রায় ১২.৬৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। যা বাংলাদেশি মুদ্রায় যা ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকারও বেশি।

এফএস