রয়টার্সের এক বিশেষ প্রতিবেদনে ইরানি কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকদের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে, যুদ্ধের প্রথম দিনেই আলী খামেনেই নিহত হওয়ার পর তার আহত ছেলে মুজতবা খামেনির উত্থান ঘটে। ১৯৭৯ সাল থেকে ইরানের ক্ষমতা সুপ্রিম লিডারের হাতে কেন্দ্রীভূত থাকলেও বর্তমান যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে কোনো একক ধর্মীয় নেতার বদলে আইআরজিসি’র কমান্ডাররাই দেশ পরিচালনা করছেন।
শীর্ষে থাকলেও মুজতবার ভূমিকা সীমিত
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মুজতবা খামেনিই আনুষ্ঠানিকভাবে ইরানের শীর্ষ পদে থাকলেও তার মূল কাজ এখন জেনারেলদের নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোতে বৈধতা দেওয়া। অভ্যন্তরীণ আলোচনার সঙ্গে পরিচিত তিনটি সূত্র জানিয়েছে, মুজতবা নিজে সরাসরি কোনো নির্দেশ দেওয়ার বদলে সামরিক বাহিনীর কমান্ডারদের প্রস্তাবগুলোতে কেবল সম্মতি দিচ্ছেন।
যুদ্ধকালীন চাপের কারণে ক্ষমতা এখন সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল এবং আইআরজিসি-র একটি কট্টরপন্থী চক্রের হাতে চলে গেছে। শান্তি আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তেহরানের পক্ষ থেকে সাড়া পেতে অনেক সময় লাগছে। তিনি বলেন, ‘ইরানিদের জবাব দেওয়ার গতি অত্যন্ত ধীর। মনে হচ্ছে সেখানে কোনো একক সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী কাঠামো নেই। কোনো কোনো ক্ষেত্রে জবাব পেতে দুই থেকে তিন দিন সময় লাগছে।’
আলোচনার চাবিকাঠি আইআরজিসির হাতে
কূটনৈতিক অঙ্গনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ও পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাক ইরানের হয়ে কথা বললেও নেপথ্যে মূল ভূমিকা পালন করছেন আইআরজিসি কমান্ডার আহমদ ওয়াহিদি। শান্তি আলোচনা ও যুদ্ধবিরতির ক্ষেত্রে ওয়াহিদিই এখন ইরানের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন।
অন্যদিকে, যুদ্ধের শুরুতে হামলায় গুরুতর আহত হওয়ার পর থেকে মুজতবা খামেনিই জনসমক্ষে আসেননি। তিনি বর্তমানে আইআরজিসি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে বা সীমিত অডিও বার্তার মাধ্যমে যোগাযোগ রক্ষা করছেন বলে জানা গেছে।
পরমাণু ইস্যুতে তেহরানের প্রস্তাব
রয়টার্স জানায়, সোমবার ইরান ওয়াশিংটনের কাছে একটি নতুন প্রস্তাব পাঠিয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, যুদ্ধ বন্ধ হওয়ার পর এবং হরমজ প্রণালি নিয়ে বিরোধ মিটে যাওয়ার পরেই কেবল পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা হবে। তবে ওয়াশিংটন শুরু থেকেই পরমাণু ইস্যু সমাধানের দাবি জানিয়ে আসছে। সাবেক মার্কিন কূটনীতিক অ্যালান আয়ার বলেন, ‘কোনো পক্ষই এখন নমনীয় হতে চাইছে না। কারণ নমনীয়তাকে তারা দুর্বলতা হিসেবে দেখছে।’
ধর্মীয় নেতৃত্বের বদলে নিরাপত্তা খাতের আধিপত্য
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই ক্ষমতার পরিবর্তন ধর্মীয় প্রাধান্য থেকে নিরাপত্তা খাতের আধিপত্যের দিকে মোড় নিয়েছে। সাবেক মার্কিন আলোচক অ্যারন ডেভিড মিলার বলেন, ‘আমরা এখন ঐশ্বরিক ক্ষমতা থেকে হার্ড পাওয়ার বা কঠোর শক্তির প্রয়োগ দেখছি। পাদ্রি বা ধর্মগুরুদের বদলে এখন রেভল্যুশনারি গার্ডই ইরান শাসন করছে।’
এত সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপের মুখেও ইরানের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থায় বড় কোনো ফাটল বা গণবিক্ষোভের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। এর মানে হলো আইআরজিসি ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কেবল যুদ্ধ পরিচালনা করছে না, বরং তারাই এখন দেশের নীতি নির্ধারণ করছে। তাদের লক্ষ্য হলো পূর্ণ মাত্রার যুদ্ধ এড়িয়ে নিজেদের সক্ষমতা বজায় রাখা এবং হরমজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণকে পুঁজি করে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়া।





