‘আমরা আগেই পুলিশকে সতর্ক করেছিলাম’— ঘাতকের ভাইয়ের আক্ষেপ

ফ্লোরিডায় জামিল-বৃষ্টি হত্যাকাণ্ড

নিহত দুই শিক্ষার্থী
নিহত দুই শিক্ষার্থী | ছবি: এখন টিভি
0

ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার দুই বাংলাদেশি ডক্টরাল শিক্ষার্থী জামিল লিমন ও নাহিদা সুলতানা বৃষ্টির হত্যার ঘটনায় উত্তাল এখন পুরো ক্যাম্পাস ও কমিউনিটি। জানা যায়, এ নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মূল অভিযুক্ত হিশাম সালেহ আবুগারবিয়েহ হঠাৎ করে ভারসাম্যহীন হয়ে পড়া কোনো ব্যক্তি নন; বরং দীর্ঘ সময় ধরেই তিনি ছিলেন পরিবারের জন্য আতঙ্কের নাম। তার নিজের পরিবার বছরের পর বছর ধরে এ আতঙ্ক নিয়েই চলছিলো। এমনকি পরিবারের পক্ষ থেকে পুলিশকে সতর্কও করা হয়েছিল, আবেদনও করা হয়েছিল আদালতে সুরক্ষা আদেশের। কিন্তু আইনি প্রক্রিয়া ও সিস্টেমের ব্যর্থতায় শেষ পর্যন্ত ঝরে গেলো দুটি প্রাণ।

হিশামের ছোট ভাই ২২ বছর বয়সী আহমাদ আবুগারবিয়েহ সিবিএস নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ হত্যাকাণ্ডের প্রেক্ষাপট ও পরিবারের অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরেছেন। তার কণ্ঠে ছিল গভীর অপরাধবোধ ও অনুতাপ।

আহমাদ বলেন, ‘আমরা আগেই পুলিশকে সতর্ক করার চেষ্টা করেছিলাম। আমি শুধু জামিল ও বৃষ্টির কথা ভাবছি। আমি সত্যিই সব কিছুর জন্য দুঃখিত। আমার পুরো পরিবার এখন লজ্জা ও গভীর অপরাধবোধে ডুবে আছে।’

আহমাদ জানান, হিশাম খুব দ্রুত রেগে যেত। তার আচরণ ছিলো চরম অস্বাভাবিক। তিনি বলেন, ‘তার কখনোই কোনো রুমমেটের সঙ্গে থাকা উচিত ছিলো না। তার একা থাকা উচিত ছিলো, নয়তো সে গৃহহীন হওয়ার যোগ্য ছিলো।’

জানা যায়, ২০২৩ সাল থেকেই হিশাম তার পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলো।

আদালতের নথিপত্র অনুযায়ী, ২০২৩ সালে আহমাদ নিজেই তার বড় ভাইয়ের বিরুদ্ধে সুরক্ষা আদেশের আবেদন করেছিলেন। আবেদনে তিনি উল্লেখ করেছিলেন, হিশাম তাকে শারীরিকভাবে আঘাত করেছে, মাথায় ঘুষি মেরেছে এবং তার শার্ট ছিঁড়ে ফেলেছে। শুধু তাই নয়, পারিবারিক কলহের জের ধরে মাঝরাতে হিশাম চিৎকার করে নিজেকে ‘ঈশ্বর’ দাবি করতো এবং সবাইকে তাকে প্রণাম করার নির্দেশ দিত। সেই সময় সুরক্ষা আদেশটি মঞ্জুরও হয়েছিলো।

২০২৫ সালে পরিবার হিশামের বিরুদ্ধে দ্বিতীয়বার সুরক্ষা আদেশের আবেদন করে। কিন্তু আইনি মারপ্যাঁচে সেই আবেদন আদালত নাকচ করে দেন। কারণ হিসেবে জানানো হয়, হিশামের বিরুদ্ধে ব্যাটারির (শারীরিক আঘাত) আগের ফৌজদারি অভিযোগটি আইনিভাবে অগ্রসর হয়নি।

আহমাদ স্বীকার করেছেন, ২০২৩ সালে তিনি নিজেই আইনি খরচ বহনের সামর্থ্য না থাকায় বড় ভাইয়ের বিরুদ্ধে করা ব্যাটারির মামলাটি প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন। আজ সেই সিদ্ধান্তের ভয়াবহ পরিণতির কথা ভেবে তিনি আফসোস করছেন।

আরও পড়ুন:

তিনি বলেন, ‘আমি সেই মামলা তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্তটি নেয়ার পরপরই অনুশোচনা করেছিলাম।’

জামিল লিমন নিজেও এ হত্যাকাণ্ডের আগে বিশ্ববিদ্যালয়ে হিশামকে ‘সাইকোপ্যাথিক’ হিসেবে উল্লেখ করে অভিযোগ জানিয়েছিলেন। তবুও এই বিপজ্জনক ব্যক্তিকে থামানোর জন্য সিস্টেম কোনো কার্যকর ভূমিকা নিতে ব্যর্থ হয়েছে।

গত শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) সকালে হিশাম তার পারিবারিক বাড়িতে ফিরে এলে পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করে। আহমাদ জানান, ভাইয়ের অদ্ভুত আচরণের কারণে তিনি পুলিশ ডাকতে বাধ্য হন।

আদালতের নথি থেকে জানা যায়, হিশাম বাড়ির ভেতরে মাত্র একটি তোয়ালে পরিহিত অবস্থায় ছিল এবং তার ছোট বোনকে উত্ত্যক্ত করার চেষ্টা করেছিল। পরে সোয়াট টিমের উপস্থিতিতে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে।

হিলসবোরো কাউন্টির স্টেট অ্যাটর্নি সুজি লোপেজ স্পষ্টভাবে বলেন, ‘হিশাম আবুগারবিয়েহ আমাদের সমাজের জন্য বিপজ্জনক। বিচার না হওয়া পর্যন্ত তাকে কোনোভাবেই জামিন দেয়া যাবে না।’

অন্যদিকে, পাবলিক ডিফেন্ডারের অফিস জানিয়েছে, তারা মক্কেলের আইনি অধিকারের স্বার্থে এখনই এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করবে না।

আহমাদ আবুগারবিয়েহ ভিকটিমদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে বলেন, ‘আমার পুরো পরিবার অনুতপ্ত।’

উল্লেখ্য, বর্তমানে হিশাম আবুগারবিয়েহ জামিনবিহীন কারাগারে বন্দি। তার বিরুদ্ধে প্রথম শ্রেণির দুটি পরিকল্পিত হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। আজ আদালতে তার পরবর্তী শুনানি অনুষ্ঠিত হবে।

এসএইচ