ঘণ্টায় ২৮ হাজার কিলোমিটার— এই গতি থামাবে কে?
মহাকাশ থেকে পৃথিবীতে ফেরার সময় একটি ক্যাপসুলের গতিবেগ থাকে ঘণ্টায় প্রায় ২৮ হাজার কিলোমিটার। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে ঢোকার সময় ঘর্ষণে ক্যাপসুলের বাইরের তাপমাত্রা ওঠে প্রায় ২ হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত। এত ভয়াবহ গতি ও তাপ সামলে একটি যানকে নিরাপদে মাটিতে নামানো রীতিমতো দুঃসাধ্য।
প্যারাশুট খুললে গতি অনেকটাই কমে আসে ঠিকই, তবু ক্যাপসুলটি যখন পৃষ্ঠে এসে পৌঁছায়, তখনো তার গতিবেগ থাকে ঘণ্টায় ২০ থেকে ৩০ কিলোমিটারের মতো। এই গতিতে শক্ত মাটিতে পড়লে ধাক্কাটা হবে প্রচণ্ড। নভোচারীদের শরীরে এই আঘাত প্রাণঘাতী হতে পারে।
পানি কেন? মাটি নয় কেন?
এখানেই আসে পদার্থবিজ্ঞানের একটি মৌলিক বিষয়। পানি প্রাকৃতিকভাবেই একটি চমৎকার ‘শক অ্যাবজর্বার’ বা ‘আঘাত শোষক’। শক্ত মাটিতে আছড়ে পড়লে যে ধাক্কা লাগে, পানিতে তা অনেকটাই শুষে নেয়। ক্যাপসুলটি পানিতে পড়ার মুহূর্তে পানির পৃষ্ঠটান ও তরলের প্রতিরোধ মিলে একটি ‘কুশন’ বা নরম বালিশের মতো কাজ করে। ফলে নভোচারীদের শরীরে ধাক্কার মাত্রা অনেক কম হয়।
সহজ ভাষায় বললে— উঁচু থেকে কংক্রিটের মেঝেতে লাফ দেয়া আর সুইমিং পুলে ঝাঁপ দেয়ার মধ্যে যে পার্থক্য, ক্যাপসুলের ক্ষেত্রেও ঠিক তা-ই।
সাগর কেন? পুকুর বা নদী নয় কেন?
ক্যাপসুল নামানোর জন্য বিশাল খোলা জায়গা দরকার। মহাকাশ থেকে ফেরার সময় ক্যাপসুলের অবতরণ স্থান শতভাগ নির্ভুলভাবে নিয়ন্ত্রণ করা প্রায় অসম্ভব। বাতাসের গতি, প্যারাশুটের আচরণ— সবকিছু মিলিয়ে কয়েক কিলোমিটার এদিক-ওদিক হতে পারে। তাই প্রয়োজন হয় এমন একটি জায়গা যেখানে—
১. বিশাল খোলা এলাকা আছে, জনবসতি নেই
২. ক্যাপসুল এদিক-ওদিক পড়লেও কারও ক্ষতি হবে না
৩. উদ্ধার দল সহজে পৌঁছাতে পারবে
আর এই তিন শর্ত একসঙ্গে পূরণ করে সাগর। পুকুর, নদী বা হ্রদে গভীরতা ও আয়তন যথেষ্ট নয়, আশপাশে জনবসতি থাকে এবং নিরাপত্তাঝুঁকি অনেক বেশি।
তাহলে রাশিয়ার সয়ুজ মাটিতে নামে কীভাবে?
অনেকেরই প্রশ্ন থাকতে পারে— রাশিয়ার সয়ুজ ক্যাপসুল তো মাটিতেই নামে! ব্যাপারটি সত্য। তবে সয়ুজ ক্যাপসুলে মাটি স্পর্শের ঠিক আগ মুহূর্তে ছোট ছোট রেট্রো-রকেট জ্বলে ওঠে। এগুলো নিচের দিকে আগুন ছুড়ে গতি আরও কমিয়ে দেয়। আর নামার জন্য বেছে নেওয়া হয় কাজাখস্তানের বিস্তীর্ণ তৃণভূমি, যেখানে জনবসতি নেই বললেই চলে।
তবুও মাটিতে নামার ধাক্কা বেশ জোরালো হয়। অনেক নভোচারীই ফেরার পর বলেছেন, অবতরণটা ‘গাড়ি দুর্ঘটনার মতো’ লেগেছে।
স্পেসএক্সের নতুন কৌশল
ইলন মাস্কের স্পেসএক্স তাদের ক্রু ড্রাগন ক্যাপসুল আটলান্টিক বা মেক্সিকো উপসাগরে নামায়। অবতরণের আগে চারটি বড় প্যারাশুট খোলে, গতি কমিয়ে আনে। পানিতে পড়ার পর দ্রুত উদ্ধার জাহাজ এগিয়ে আসে, ক্যাপসুল পানি থেকে তুলে নভোচারীদের বের করা হয়।
আর স্পেসএক্সের স্টারশিপ রকেটের ক্ষেত্রে আরেক বিস্ময়— পুরো রকেটটিকেই লঞ্চপ্যাডে ফিরিয়ে এনে ‘চপস্টিকস’ দিয়ে ধরে ফেলার প্রযুক্তি তৈরি করা হচ্ছে, যাতে পানিতে নামতেই না হয়। তবে এটি এখনো পরীক্ষামূলক পর্যায়ে।
ভবিষ্যতে কি মাটিতেই নামবে?
বিজ্ঞানীরা বলছেন, ভবিষ্যতে প্রযুক্তি আরও উন্নত হলে মহাকাশযান রানওয়েতে বিমানের মতো করে নামানো সম্ভব হতে পারে। নাসার আগের স্পেস শাটল রানওয়েতেই নামতো, তবে সেটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন নকশার যান ‘ডানাওয়ালা’, যা গ্লাইড করে নামতে পারত। তবে এখনকার ক্যাপসুল-ভিত্তিক যানের জন্য পানিতে অবতরণই সবচেয়ে নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও কার্যকর পদ্ধতি। তাহলে উত্তরটা সোজা— মহাকাশ থেকে ফেরা ক্যাপসুল সাগরে পড়ে, কারণ পানি প্রাকৃতিক কুশন হিসেবে কাজ করে, সাগরে জনবসতি নেই এবং বিশাল খোলা জায়গায় কিছুটা এদিক-ওদিক পড়লেও বিপদ নেই। পদার্থবিজ্ঞান, প্রকৌশল আর নিরাপত্তা; তিনের হিসাব মেলালে পানিতেই শেষ হয় মহাকাশযাত্রার শেষ অধ্যায়।
—নাসা, স্পেসএক্স ও ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা (ইএসএ) প্রকাশিত তথ্যের অবলম্নে লেখা।




