Recent event

যাকাত কাদের দেবেন, কাদের দেবেন না? যা জানা জরুরি

যাকাত কারা পাবেন, আর কারা পাবেন না?
যাকাত কারা পাবেন, আর কারা পাবেন না? | ছবি: এখন টিভি
0

ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের মধ্যে ঈমান ও সালাতের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হলো যাকাত (Zakat)। পবিত্র কোরআনে সালাত বা নামাজের পাশাপাশি বহুবার যাকাত আদায়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যাকাত কেবল দান নয়; এটি ধনীদের সম্পদকে পবিত্র করে এবং সমাজের অসহায় মানুষের অধিকার নিশ্চিত করে। তবে যাকাত আদায়ের ক্ষেত্রে অনেক সময় আমরা বিভ্রান্তিতে পড়ি—কাকে যাকাত দেওয়া যাবে আর কাকে দেওয়া যাবে না।

যাকাত দেওয়া যাবে (যাদের) যাকাত দেওয়া যাবে না (যাদের)
দরিদ্র ও নিঃস্ব ব্যক্তি নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক
ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি পিতা-মাতা ও দাদা-দাদী
বিপদে পড়া মুসাফির ছেলে-মেয়ে ও নাতি-নাতনি
ভাই-বোন ও অন্যান্য আত্মীয় স্বামী বা স্ত্রী (একে অপরকে)
মুসলিম মিসকিন মসজিদ-মাদ্রাসা ও জনকল্যাণমূলক কাজ

আরও পড়ুন:

কোরআনে সালাত ও যাকাতের গুরুত্ব (Importance of Zakat in Quran)

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—

وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ وَآتُوا الزَّكَاةَ ۚ وَمَا تُقَدِّمُوا لِأَنْفُسِكُمْ مِنْ خَيْرٍ تَجِدُوهُ عِنْدَ اللَّهِ ۗ إِنَّ اللَّهَ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ

‘তোমরা নামাজ আদায় করো এবং যাকাত প্রদান করো। তোমরা নিজেদের জন্য যে উত্তম কাজ অগ্রে পাঠাবে, তা আল্লাহর কাছে পাবে। নিশ্চয়ই তোমরা যা করো আল্লাহ তা দেখছেন।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ১১০)

অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে—

وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ وَآتُوا الزَّكَاةَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ

‘তোমরা নামাজ আদায় করো, যাকাত দাও এবং রাসুলের আনুগত্য করো—যাতে তোমরা অনুগ্রহপ্রাপ্ত হতে পারো।’ (সুরা নূর: আয়াত ৫৬)

যাকাতের নির্ধারিত ৮টি খাত (Designated Sectors of Zakat)

কোরআন মজিদে যাকাত ব্যয়ের ৮টি নির্দিষ্ট খাতের কথা বলা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে—

إِنَّمَا الصَّدَقَاتُ لِلْفُقَرَاءِ وَالْمَسَاكِينِ وَالْعَامِلِينَ عَلَيْهَا وَالْمُؤَلَّفَةِ قُلُوبُهُمْ وَفِي الرِّقَابِ وَالْغَارِمِينَ وَفِي سَبِيلِ اللَّهِ وَابْنِ السَّبِيلِ ۖ فَرِيضَةً مِنَ اللَّهِ ۗ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ

‘যাকাত তো কেবল নিঃস্ব, অভাবগ্রস্ত, যাকাত আদায়ে নিয়োজিত কর্মচারী, যাদের মন জয় করা প্রয়োজন, দাসমুক্তির জন্য, ঋণগ্রস্তদের জন্য, আল্লাহর পথে এবং মুসাফিরদের জন্য। এটি আল্লাহর নির্ধারিত বিধান। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।’ (সুরা তাওবা: আয়াত ৬০)

আরও পড়ুন:

যাদের যাকাত দেওয়া যাবে (Who can Receive Zakat)

১. দরিদ্র ও অভাবগ্রস্ত (Poor and Needy): যার কাছে অতি সামান্য সম্পদ আছে বা কিছুই নেই, এমনকি একদিনের খাবারও নেই, তাকে যাকাত দেওয়া যাবে।

২. নিসাব বিহীন ব্যক্তি (Person below Nisab): যার কাছে যাকাতযোগ্য সম্পদ বা প্রয়োজনের অতিরিক্ত কোনো মাল নিসাব পরিমাণ (Nisab amount) নেই।

৩. ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি (Debtor): যে ব্যক্তি ঋণের চাপে জর্জরিত এবং ঋণ পরিশোধ করলে তার কাছে নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকে না।

৪. অসহায় মুসাফির (Stranded Traveler): নিজ শহরে ধনী হলেও সফরে এসে রিক্তহস্ত হয়ে পড়লে তাকে প্রয়োজন অনুযায়ী যাকাত দেওয়া যাবে।

৫. দ্বীনদার দরিদ্র: যাকাত এমন দরিদ্রকে দেওয়া উত্তম যে দ্বীনদার। তবে উপযুক্ত হলে অন্যকেও দেওয়া যাবে, যদি সে টাকা পাপে ব্যয় না করে।

৬. মুসলিম গ্রহীতা (Muslim Receiver): যাকাত শুধু মুসলমানদেরই দেওয়া যাবে। অমুসলিমকে যাকাত দিলে তা আদায় হবে না, তবে সাধারণ নফল দান করা যাবে।

৭. মালিকানা নিশ্চিত করা (Ensuring Ownership): যাকাত আদায়ের জন্য উপযুক্ত ব্যক্তিকে সম্পদের মালিক বানিয়ে দিতে হবে।

৮. নিকটাত্মীয় (Relatives): উপযুক্ত হলে ভাই-বোন, চাচা-মামা, ফুফু-খালা এবং ভাতিজা-ভাগনেদের যাকাত দেওয়া উত্তম। এতে দ্বিগুণ সওয়াব পাওয়া যায়।

আরও পড়ুন:

যাদের যাকাত দেওয়া যাবে না (Who cannot Receive Zakat)

১. নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক: যার কাছে যাকাতযোগ্য সম্পদ বা প্রয়োজনীয় অতিরিক্ত সম্পদ নিসাব পরিমাণ আছে (যেমন স্বর্ণ-রুপা বা বাণিজ্য পণ্য)।

২. জনকল্যাণমূলক কাজ (Public Welfare Work): যাকাতের টাকা রাস্তা, সেতু নির্মাণ, কূপ খনন বা বিদ্যুৎ-পানির ব্যবস্থায় ব্যয় করলে যাকাত আদায় হবে না।

৩. মসজিদ-মাদ্রাসা নির্মাণ: যাকাতের টাকা দিয়ে মসজিদ-মাদ্রাসা নির্মাণ, ইমাম-মুয়াজ্জিনের বেতন বা ওয়াজ মাহফিলের খরচ মেটানো জায়েজ নয়।

৪. রক্তের সম্পর্কীয় ঊর্ধ্বতন ও অধস্তন আত্মীয়: নিজের পিতা-মাতা, দাদা-দাদী, নানা-নানী (ঊর্ধ্বতন) এবং ছেলে-মেয়ে, নাতি-নাতনি (অধস্তন)-কে যাকাত দেওয়া যাবে না।

৫. স্বামী-স্ত্রী: স্বামী স্ত্রীকে এবং স্ত্রী স্বামীকে যাকাতের টাকা দিতে পারবেন না।

৬. পারিশ্রমিক হিসেবে যাকাত: কাজের লোক বা কর্মচারীকে তার কাজের পারিশ্রমিক বা বেতন হিসেবে যাকাত দেওয়া যাবে না। তবে উপযুক্ত হলে বেতনের বাইরে আলাদাভাবে দেওয়া যাবে।

৭. অমুসলিম: গ্রহীতা অমুসলিম হলে যাকাত আদায় হবে না। পুনরায় তা আদায় করতে হবে।

আরও পড়ুন:

স্বর্ণ ও রুপার নিসাব তালিকা ২০২৬

সম্পদ (Asset) নিসাব পরিমাণ (ভরি) নিসাব পরিমাণ (গ্রাম) যাকাতের হার
স্বর্ণ (Gold) ৭.৫ ভরি ৮৭.৪৮ গ্রাম ২.৫%
রুপা (Silver) ৫২.৫ ভরি ৬১২.৩৬ গ্রাম ২.৫%
নগদ টাকা / সঞ্চয় ৫২.৫ ভরি রুপার বাজার মূল্যের সমান ২.৫%

যাকাত কারা পাবেন, আর কারা পাবেন না সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর (FAQs)

প্রশ্ন: যাকাত দেওয়ার মূল শর্ত কী? (Conditions for Zakat)

উত্তর: যাকাত ফরয হওয়ার জন্য মুসলিম হওয়া, সুস্থ মস্তিষ্ক, প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া এবং সম্পদের মালিকানা এক বছর পূর্ণ হওয়া শর্ত।

প্রশ্ন: যাকাতের নিসাব (Zakat Nisab) বলতে কী বোঝায়?

উত্তর: নিসাব হলো শরীয়ত নির্ধারিত সম্পদের সেই সর্বনিম্ন পরিমাণ, যা কারো কাছে থাকলে তার ওপর যাকাত ফরয হয়।

প্রশ্ন: রুপার নিসাব (Nisab of Silver) কতটুকু?

উত্তর: রুপার নিসাব হলো ৫২.৫ তোলা বা ভরি (৬১২.৩৬ গ্রাম)।

প্রশ্ন: যাকাত কি নিজের ভাই-বোনকে দেওয়া যাবে?

উত্তর: হ্যাঁ, ভাই-বোন যদি যাকাত গ্রহণের উপযুক্ত বা দরিদ্র হন, তবে তাদের যাকাত দেওয়া যাবে এবং এটি উত্তম।

প্রশ্ন: পিতা-মাতাকে কি যাকাত দেওয়া যায়?

উত্তর: না, নিজের জন্মদাতা পিতা-মাতা, দাদা-দাদী বা নানা-নানীকে যাকাত দেওয়া জায়েজ নয়।

প্রশ্ন: যাকাত কি অমুসলিমকে দেওয়া যাবে?

উত্তর: যাকাত কেবল অভাবগ্রস্ত মুসলমানদের হক। কোনো অমুসলিমকে যাকাত দিলে তা আদায় হবে না।

প্রশ্ন: মসজিদ বা মাদ্রাসার নির্মাণ কাজে কি যাকাত দেওয়া যাবে?

উত্তর: যাকাতের টাকা সরাসরি কোনো দরিদ্র ব্যক্তিকে মালিক বানিয়ে দিতে হয়। তাই মসজিদ-মাদ্রাসা নির্মাণে যাকাত দেওয়া যায় না।

প্রশ্ন: ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির যাকাত কি মাফ?

উত্তর: ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির ঋণের টাকা বাদ দেওয়ার পর যদি নিসাব পরিমাণ সম্পদ না থাকে, তবে তার ওপর যাকাত ফরয নয়।

প্রশ্ন: ব্যবহৃত অলংকারের ওপর কি যাকাত দিতে হয়?

উত্তর: হ্যাঁ, ব্যবহৃত বা অব্যবহৃত উভয় প্রকার স্বর্ণ-রুপার অলংকার যদি নিসাব পরিমাণ হয়, তবে তার ওপর যাকাত ফরয।

প্রশ্ন: যাকাত কি রমজান মাসেই দিতে হবে?

উত্তর: সম্পদের মালিকানা এক বছর পূর্ণ হলেই যাকাত ফরয হয়। তবে সওয়াবের আশায় অনেকে রমজান মাসে এটি আদায় করেন।

প্রশ্ন: স্ত্রী কি স্বামীকে যাকাত দিতে পারেন?

উত্তর: নির্ভরযোগ্য ফতোয়া অনুযায়ী, স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে যাকাত দিতে পারেন না।

প্রশ্ন: ব্যবসায়িক পণ্যের যাকাত কীভাবে দিতে হয়?

উত্তর: ব্যবসার উদ্দেশ্যে রাখা পণ্যের বর্তমান বাজার মূল্য হিসাব করে তার ওপর ২.৫% হারে যাকাত দিতে হয়।

প্রশ্ন: বেতন বা জমানো টাকার ওপর যাকাত কখন আসে?

উত্তর: জমানো টাকা যদি নিসাব পরিমাণ (৫২.৫ ভরি রুপার মূল্যের সমান) হয় এবং এক বছর স্থায়ী হয়, তবে যাকাত দিতে হবে।

প্রশ্ন: যাকাত না দিলে কী শাস্তি?

উত্তর: যাকাত না দেওয়া কবীরা গুনাহ। পরকালে এর জন্য কঠিন শাস্তির কথা পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হয়েছে।

এসআর