Recent event

বাংলা একাডেমির একাল–সেকাল: বাংলাকে আগলে রাখার ৭০ বছর

বাংলা একাডেমির একাল-সেকাল
বাংলা একাডেমির একাল-সেকাল | ছবি: এখন টিভি
0

ফেব্রুয়ারি শব্দটি বাকি এগারোটি মাসের মতোই একটি মাসের নাম হলেও, বেশিরভাগ বাংলাদেশির মনে ফেব্রুয়ারি কেবল মাসের নাম নয়; আরও বহু স্মৃতি ও তথ্যের এক চমৎকার মিশেল। একগুচ্ছ সাদা মিনারের পেছনে লাল সূর্য, খালি পায়ে ফুল হাতে ভোরের সকাল, কালো পিচঢালা রাস্তায় রঙিন আল্পনা কিংবা আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর ‘ছেলে হারা শত মায়ের অশ্রু গড়া এ ফেব্রুয়ারি…’; আমাদের মনে এ রকম অসংখ্য স্মৃতি জড়িয়ে আছে ফেব্রুয়ারি শব্দটির সঙ্গে।

ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি— আরও স্পষ্ট করে বললে, এ মাসের ২১তম দিন আমাদের জাতীয় স্মৃতির এক অনিবার্য অনুষঙ্গ। একদিকে শহিদদের রক্তে রচিত ভাষার অধিকার, অন্যদিকে সেই ভাষাকে যুগের পর যুগ বাঁচিয়ে রাখার নিরবচ্ছিন্ন সাংস্কৃতিক সাধনা। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের তাৎপর্য কেবল একটি দিনের আবেগে মাপা সমীচীন নয়; বরং এটি একটি দীর্ঘ যাত্রার নাম; যে যাত্রায় ধীরে ধীরে ভাষা হয়ে উঠেছে পরিচয়, প্রতিরোধ ও সৃজনের ভিত্তি।

এ দীর্ঘ যাত্রাকে প্রাতিষ্ঠানিক ও আনুষ্ঠানিক রূপ দিতে যে উদ্যোগ, যে সংগঠন, যে পরিশ্রম— তার কেন্দ্রস্থলে রয়েছে বাংলা একাডেমি। প্রতিষ্ঠার পর থেকে ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির গবেষণা, প্রকাশনা, মান নির্ধারণ, সংরক্ষণ এবং জনমানসে ভাষাবোধ জাগ্রত রাখার দায়িত্ব বাংলা একাডেমি সাত দশক ধরে ধারাবাহিকভাবে বহন করে চলেছে। সময়ের সঙ্গে ভাষার ব্যবহার, প্রযুক্তি ও পাঠাভ্যাস বদলেছে; তবু বাংলা একাডেমির লক্ষ্য অপরিবর্তিত থেকেছে। প্রতিষ্ঠানটি কাজ করে গেছে বাংলাকে প্রমিত করা, সমৃদ্ধ করা এবং আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্যে। তাই ফেব্রুয়ারি মাসে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের তাৎপর্য স্মরণ করতে গেলে বাংলা একাডেমির সাত দশকের সাধনাও অনিবার্যভাবে আলোচনায় আসে। একুশের চেতনা কেবল স্মৃতিস্তম্ভে নয়, প্রতিষ্ঠান-পরিকল্পনা ও সংস্কৃতি নির্মাণের দীর্ঘ ধারাতেও জীবিত।

বাংলা একাডেমি নিয়ে লিখলে বিস্তর আলোচনার সুযোগ রয়েছে। এ প্রেক্ষিতে একটি মজার তথ্য দেয়ার লোভ সংবরণ করা যায় না। আমরা অনেকেই জানি, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের গণভবন— যা সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন হিসেবে ব্যবহৃত হতো; সেটিকে জাদুঘরে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত হয়েছে। কিন্তু এ ধরনের ঘটনা বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম নয়।

আরও পড়ুন:

এমনই একটি ঘটনা ঘটেছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন বর্ধমান হাউজের ক্ষেত্রেও। আজ আমরা এই স্থাপনাটিকেই ‘বাংলা একাডেমি’ নামে চিনি। প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি মাসে হাজারো মানুষের পদচারণায় মুখরিত হয় একাডেমির প্রাঙ্গণ। তৎকালীন বাসভবনের স্থাপনাটি বর্তমানে ভাষা আন্দোলন জাদুঘর হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে।

যে বাংলা ভাষা নিয়ে আমরা এত গর্ব করি, ’৫২-তে ঝরিয়েছি রক্ত— সেই ভাষা ও ভাষাসংস্কৃতি চর্চা ও গবেষণার জন্য একটি সুসংগঠিত প্রতিষ্ঠান থাকা প্রয়োজন— এ ভাবনাটি প্রথম উত্থাপন করেছিলেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্। পরবর্তীতে ১৯৫৫ সালের অগ্রহায়ণের এক দিনে, ৩ ডিসেম্বর প্রতিষ্ঠিত হয় বাঙালি জাতির সংস্কৃতির ধারক-বাহক এক অগ্রগামী প্রতিষ্ঠান ‘বাংলা একাডেমি’।

এখানে কী হয় না? ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির গবেষণা, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নির্ধারণের পাশাপাশি দেশজ সংস্কৃতি, কৃষ্টি, ইতিহাস, ঐতিহ্য, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, সমকালীন শিল্প ও সাহিত্য সংরক্ষণ ও উন্নয়নের মাধ্যমে জাতির মানসিক বিকাশ ও উৎকর্ষ সাধনের প্রয়াস, সবই এখানে পরিচালিত হয়।

প্রতিষ্ঠানটি কত দক্ষতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে, তা স্পষ্ট হয় যখন জানা যায়; শিল্প ও সংস্কৃতিচর্চায় অনন্য অবদানের জন্য ২০১০ সালে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার “স্বাধীনতা পুরস্কার” লাভ করে বাংলা একাডেমি।

বাংলা একাডেমির এ দীর্ঘ যাত্রা মোটেই গড়পড়তা ছিল না। বাংলা ভাষার বর্তমান সংগঠিত রূপ গড়ে তুলতে একাডেমিকে শুরু থেকেই গুরুত্বপূর্ণ, দীর্ঘমেয়াদি, জটিল ও কষ্টসাধ্য ভিত্তিগত কাজ করতে হয়েছে— এবং আধুনিক বিশ্বের চাহিদা বিবেচনায় সেই ধারাবাহিকতা এখনো চলমান।

প্রতিষ্ঠার পরপরই যে কাজটি সর্বাধিক গুরুত্ব পায়, তা হলো বাংলা ভাষার শুদ্ধ বানানরীতি নির্ধারণ ও প্রামাণ্য অভিধান প্রণয়ন। ১৯৫০–৬০-এর দশকে বাংলা ভাষায় বানানের ঐক্য ছিল না; বিভিন্ন পত্রিকা, লেখক ও প্রকাশনায় ভিন্ন ভিন্ন বানান ব্যবহৃত হতো। ভাষা আন্দোলনের পর ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হলেও, ভাষাকে বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে দাঁড় করানো ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। এই জায়গায় বাংলা একাডেমি পথিকৃতের ভূমিকা পালন করে।

আরও পড়ুন:

তাদের উদ্যোগে প্রণীত হয় প্রামাণ্য বানানরীতি; শুরু হয় বৃহৎ বাংলা অভিধান সংকলন প্রকল্প; সংগ্রহ করা হয় লোকসাহিত্য ও প্রাচীন পুঁথি। ফলে আঞ্চলিক বাংলা শব্দভাণ্ডার ক্রমশ সমৃদ্ধ হতে থাকে। ’৫২-এর রক্তার্জিত ভাষাকে শৃঙ্খলাবদ্ধ, প্রামাণ্য ও টেকসই রূপ দিতে কলম ধরেছিল বাংলা একাডেমি।

এগুলো ছিল প্রতিষ্ঠানের শুরুর দিকের ভিত্তিগত উদ্যোগের কয়েকটি দিক। বাংলা একাডেমির কাজ আজও থেমে নেই; বরং তা ক্রমবর্ধমান। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলা একাডেমি শুধু বইমেলা আয়োজনেই সীমাবদ্ধ নেই— যুগের চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রবেশ করেছে ডিজিটাল যুগে। প্রকাশিত হয়েছে অনলাইন বাংলা অভিধান; ডিজিটাল আর্কাইভের মাধ্যমে পুরোনো প্রকাশনা ও গবেষণা সহজলভ্য হয়েছে। বইমেলার তথ্য, ক্যাটালগ ও কার্যক্রমও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে স্থান পেয়েছে; যা সারাবছর বইমেলার অপেক্ষায় থাকা পাঠকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ।

একসময় যে বাংলা একাডেমি হাতে-কলমে অভিধান রচনা করেছে, আজ সেই একাডেমিই অনলাইনে ছড়িয়ে দিচ্ছে বাংলা ভাষার ভাণ্ডার— সীমান্ত পেরিয়ে, প্রজন্ম অতিক্রম করে।

প্রাণের ভাষা ও সংস্কৃতি যেন কালের গর্ভে ম্লান না হয়ে যায়, বরং পরিবর্তনশীল পৃথিবীতে এর জ্যোতি উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাক— এ আমাদের সবার কামনা। সেই উদ্দেশ্যে নিরলসভাবে কাজ করে যাওয়া প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমিকে নিয়ে ভাষার মাস ফেব্রুয়ারিতে আমাদের জানার পরিসর সামান্য হলেও বাড়বে, এই প্রত্যাশাতেই এই নিবেদন।

প্রাণের বাংলা ভাষা অমর হোক।

লেখক: রিফাত হোসেন দিগন্ত

শিক্ষার্থী, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

এনএইচ