যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক চাপে যুক্তরাজ্যের নতুন অংশীদার চীন, ১০ চুক্তি স্বাক্ষর

চীনের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের চুক্তি স্বাক্ষর
চীনের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের চুক্তি স্বাক্ষর | ছবি: সংগৃহীত
0

চীনের বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ থাকলেও, ব্রিটিশ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে বেইজিংয়ের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্কে আগ্রহী লন্ডন। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের অব্যাহত শুল্ক চাপের মুখে বাণিজ্যের নতুন অংশীদার খুঁজছে স্টারমার প্রশাসন। গতকাল (বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারি) কৌশলগত সম্পর্ক উন্নয়নে চীনের সঙ্গে ১০টি চুক্তি স্বাক্ষর করেন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার।

কানাডার পর চীনের সঙ্গে কৌশলগত বাণিজ্য সম্পর্ক জোরদারে বাড়তি মনোনিবেশ ব্রিটেনের। গত বুধবার (২৮ জানুয়ারি) চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের আমন্ত্রণে চার দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে বেইজিংয়ের মাটিতে পা রাখেন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। আট বছরের মধ্যে এটিই কোনো ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর প্রথম বেইজিং সফর।

বৃহস্পতিবার সফরসূচির অংশ হিসেবে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকে বসেন স্টারমার। আলোচনা শেষে নিজেদের মধ্যে কৌশলগত সম্পর্ক বাড়ানোর প্রতি গুরুত্বারোপ করেন দুই নেতা। এসময় স্বাক্ষর হয় ১০ চুক্তি। এর মধ্যে চীনে ব্রিটিশ নাগরিকদের ভিসা ছাড়া ৩০ দিনের ভ্রমণের সুযোগ ও ২০৩০ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ ওষুধ কোম্পানি আস্ট্রাজেনেকার চীনে ১৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত অন্তর্ভুক্ত।

তবে নতুন করে বেইজিং ও লন্ডনের বাণিজ্য সম্পর্ক জোরদারের উদ্যোগ নিয়ে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা। কেননা দীর্ঘদিন ধরে চীনা নাগরিকদের বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ তুলে আসছিলো ব্রিটেন। সম্প্রতি এটি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন যুক্তরাজ্যের এম ফিফটিন গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান। জানান, চাইনিজরা প্রতিনিয়ত ব্রিটেনের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হচ্ছে। তবুও লন্ডনে বেইজিংয়ের মেগা দূতাবাস খোলার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে স্টারমার প্রশাসন।

আরও পড়ুন:

বিশেষজ্ঞদের অভিমত, এত কিছুর পরও নিজেদের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে আগ্রহী যুক্তরাজ্য। কেননা ২০১৬ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে আসার পর হিমশিম খাচ্ছে দেশটির অর্থনীতি। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ব্যুরো অব ইকোনোমিক রিসার্চের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইইউ থেকে বেরিয়ে আসার ফলে যুক্তরাজ্যের জিডিপি গত বছর ছয় এর নিচে নেমেছে। এছাড়া সংস্থাটির অনুমান বিনিয়োগ কমেছে ১২ থেকে ১৮ শতাংশ এবং কর্মসংস্থান হ্রাস পেয়েছে তিন থেকে চার শতাংশ। তবে চীনের সঙ্গে স্বাক্ষরিত নতুন চুক্তিতে আশার আলো দেখছেন বিশ্লেষকরা ।

কিংস কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক কেরি ব্রাউন বলেন, ‘চীনের ওষুধ, জীব বিজ্ঞান ও অন্যান্য প্রযুক্তি খাত বেশ এগিয়ে। সুতরাং এগুলোতে বিনিয়োগ মানে শুধু পকেটে অর্থ আসাই নয়, বরং এগুলো বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞান অর্জনেও ভূমিকা রাখবে।’

পাশাপাশি চীনের প্রতি যুক্তরাজ্যের বাড়তি মনোযোগের আরেকটি কারণ ট্রাম্পের শুল্ক নীতি। ন্যাটোর অন্যতম মিত্র হওয়া সত্ত্বেও দেশটির ওপর অতিরিক্ত শুল্কারোপের হুমকি অব্যাহত রেখেছে ওয়াশিংটন। কিছুদিন আগেও গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে ব্রিটেনের ওপর ১০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক বসায় ট্রাম্প প্রশাসন। যদিও ন্যাটো প্রধানের সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্তটি থেকে সরে আসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

ভূ- রাজনীতির ক্রমবর্ধমান জটিলতায় চীন-যুক্তরাজ্যের সম্পর্ক জোরদারদের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরাও।

কেরি ব্রাউন বলেন, ‘ইউরোপের দেশগুলো নতুন ভূ- রাজনীতির শিকার। কেননা যুক্তরাষ্ট্র এখন আর কারোই বন্ধু নয়। সুতরাং দেশগুলোর উচিত নতুন কিছু ভাবা এবং সুযোগের নতুন দ্বার উন্মোচিত করা। বরং দেশগুলোর নিজেদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে মনোযোগী হওয়া উচিত। এটিই ভবিষ্যতে তাদেরকে নিরাপত্তা নিশ্চয়তা দেবে।’

স্টারমারের বেইজিং সফরে দুই দেশের সম্ভাব্য নিরাপত্তা নিশ্চয়তার বিষয়টিও বিশেষভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে। ইংলিশ চ্যানেল ব্যবহার করে যুক্তরাজ্যে পাচার হওয়া মাদক কারবারিদের ধরতে একত্রে কাজ করবে চীন ও ব্রিটেন।

এসএস