প্রবাস
অর্থনীতি
উৎসবের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করছে রেমিট্যান্স
প্রবাসীদের পরিশ্রমের রেমিট্যান্সে নতুন গতি পায় প্রান্তিক থেকে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি। গ্রামের টিনের ঘর রূপ নেয় অট্টালিকায়। ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষি উৎপাদন থেকে শিক্ষা, সবখানেই লাগে পরিবর্তনের ছোঁয়া।

কুয়েত প্রবাসী দুই সন্তানের টাকায় বদলে গেছে কুমিল্লার দাউদকান্দির আলী হোসেনের দিন। নিয়মিত পাঠানো রেমিট্যান্সে তার পরিবার এখন স্বচ্ছল।

আলী হোসেন বলেন, 'আমার দুই ছেলে। বড় ছেলে বিদেশ গেছে প্রায় নয় বছর, ছোট ছেলে গেছে প্রায় দেড় বছর। আমাদের পরিবার ছেলেদের উপর নির্ভরশীল। আমাদের সেরকম অর্থ-সামর্থ্য নেই। ছেলেরা টাকা পয়সা পাঠালে সেটা দিয়ে আমরা চলাফেরা করি।'

কুয়েত প্রবাসীর বাবা আলী হোসেন। ছবি: এখন টিভি

একই চিত্র সে গ্রামেরই জালাল ভূইঁয়ার পরিবারেও। তারও অভাব ঘুঁচে গেছে প্রবাসী দুই ছেলের কল্যাণে। শুধু তার পরিবার নয়, বিদেশ থেকে আসা অর্থে এলাকায় লেগেছে আধুনিকতার ছোঁয়া। জীবনযাত্রার মানে এসেছে পরিবর্তন।

জালাল বলেন, 'আল্লাহ বহু টাকার মালিক করছে। সব বাড়িই এখন উন্নত হয়েছে। এখন আর আগের মতো নেই।'

প্রবাসী অধ্যুষিত এ অঞ্চলে শুধুই বদলে যাওয়ার গল্প। কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার প্রায় প্রতিটি ঘরেই আছে প্রবাসী। যাদের শ্রম-ঘামের রেমিট্যান্সে উন্নয়নের সুবাতাস বইছে।

এখানকার বাসিন্দারা বলছেন, পারিবারিক স্বচ্ছলতার পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতি, আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতির উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে প্রবাসীরা। তাদের পাঠানো অর্থ ব্যয় হচ্ছে দালানকোঠা নির্মাণ, ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষি উৎপাদন, শিক্ষা ও চিকিৎসায়। যার সুফল ব্যক্তি ছাড়িয়ে সার্বজনীন রূপ পেয়েছে।

প্রবাস থেকে ফিরে দোকান দিয়েছেন প্রবাসী। ছবিতে ফিরে আসা প্রবাসীর ছেলে সামলাচ্ছেন দোকান। ছবি: এখন টিভি

এখানকার একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, 'এই গ্রামের প্রায় সবাই এখন স্বচ্ছল। বিদেশি টাকায় এখানে আমিও একটা দোকান দিয়েছি। আগে যাদের দেখতাম যে বাচ্চাদের পড়াতে পারছে না, এখন অর্থনৈতিকভাবে স্বচ্ছল হওয়ায় বাচ্চাদের স্কুলে পাঠাচ্ছে। গ্রামের স্কুল ছাড়াও অনেকেই ঢাকা ও কুমিল্লাকেন্দ্রিক হচ্ছে।'

শুধু দাউদকান্দি নয়, পাশের মেঘনা উপজেলার বিভিন্ন গ্রামেও প্রবাসীদের কল্যাণে লেগেছে উন্নয়নের ছোঁয়া। প্রান্তিক অঞ্চলেও হরহামেশাই দেখা মেলে দর্শনীয় অট্টালিকার মতো বাড়ি। এলাকাবাসী বলছেন, সুন্দর, স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবন নিশ্চিত করেছে প্রবাসীদের অর্থ।

প্রবাস ফেরত একজন বলেন, 'বাড়িঘর করছি, ভাই-বোনদের লেখাপড়া করেয়েছি। ভাই-বোনদের বিয়েও দিয়েছি। আশেপাশেও সবাই এখন আগের ঘর বাদ দিয়ে বিল্ডিং করছে। প্রবাসীদের উপর নির্ভর করে এখন আমাদের এলাকা খুব উন্নত হয়েছে।'

প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সে করা হচ্ছে নতুন বাড়ি। ছবি: এখন টিভি

গেল কয়েক দশকে প্রবাসে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে দেশের অনেক জেলাকে ছাড়িয়ে গেছে কুমিল্লা। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো'র তথ্যমতে, ২০১২ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত দেশ থেকে প্রবাসে মোট কর্মী গেছে ৮২ লাখ ৮৭ হাজার ৫৯৫ জন। আর শুধু কুমিল্লা থেকেই গেছে ৮ লাখ ১৮ হাজার ৬৮৪ জন। প্রতিবছর দেশের বাইরে যাওয়া জনশক্তির প্রায় ১০ শতাংশই এই জেলার বাসিন্দা।

রেমিট্যান্স আয়ের দিক থেকেও অন্যতম শীর্ষে কুমিল্লা। ২০২২-২৩ অর্থবছরে মোট ২ হাজার ১শ' ৬১ কোটি ডলার রেমিট্যান্সের বিপরীতে কুমিল্লার আয় ১২৮ কোটি ৫০ লাখ ডলার।

কুমিল্লা জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিসের সহকারী পরিচালক রাহেনুর ইসলাম বলেন, 'দক্ষতা উন্নয়ন, ভাষা প্রশিক্ষণ, নিজের অর্থনৈতিক শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা। এই চারটা জিনিস পরিবারের সাথে শেয়ার করে নিজের একটা ক্লিয়ার কনসেপ্ট নিয়ে বিদেশ যেতে পারলে আমাদের মাইগ্রেশনটা আরও বেশি সেফ হবে।'

এখন টিভির সাথে কথা বলছেন কুমিল্লা জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিসের সহকারী পরিচালক রাহেনুর ইসলাম। ছবি: এখন টিভি

দাউদকান্দিতে রাষ্ট্রীয় সোনালী ব্যাংকের সাম্প্রতিক হিসাব বলছে, এখানকার প্রায় ৫৫ শতাংশ মানুষ রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভরশীল। প্রায় ৯০টি দেশ থেকে রেমিট্যান্স আসে এই শাখায়। সবশেষ দুই মাসে রেমিট্যান্স প্রবাহ ছিল অন্য সময়ের তুলনায় বেশি। আসন্ন ঈদ উৎসবে এ পরিমাণ আরও বাড়বে বলে জানান ব্যাংক কর্মকর্তারা।

দাউদকান্দি সোনালি ব্যাংক শাখার ম্যানেজার মোশাররফ হোসেন বলেন, 'বাধ্যতামূলক অ্যাকাউন্ট খোলার পরে হুন্ডির প্রচলনটা অনেকাংশে কমে যাচ্ছে। যার কারণে দাউদকান্দিতে রেমিট্যান্সের প্রবাহ বাড়ছে। গত একমাসে অন্য মাসের তুলনায় আমাদের প্রায় ৪০ শতাংশের উপরে রেমিট্যান্স বেড়েছে।'

অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের অর্থনীতির মূল ভিত্তি প্রবাসী আয়। দুই ঈদে তাদের পাঠানো রেমিট্যান্সের পরিমাণ দুই বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়। তবে এই অর্থ ভোগ-বিলাসে নয়, উৎপাদনশীল কাজে ব্যয়ের পক্ষে মত তাদের।

বৈধ পথে পাঠানো রেমিট্যান্সের বিসয়ে গ্রাহকদের সাহায্য করেন ব্যাংক কমকর্তারা। ছবি: এখন টিভি

ব্র্যাকের হেড অব মাইগ্রেশন শরিফুল হাসান বলেন, 'মধ্যপ্রাচ্য, মালয়েশিয়া বা সিঙ্গাপুরে যে কর্মীরা আছে তারা প্রবাসী আয় পাঠাচ্ছে। যে কোনো সংকটে তারা পরিবারের পাশে দাঁড়াচ্ছে। প্রবাসীদের ছেলেমেয়ের স্কুলে বাড়তি কিছু সুযোগ দেয়া, প্রবাসীদের কল্যাণে বিভিন্ন উদ্যোগ নিলে আমি মনে করি আমাদের প্রবাসী আয় ৩০ বিলিয়ন পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া সম্ভব।'

বিশেষজ্ঞরা বলছে, প্রবাসীদের পরিশ্রমের ফল হিসেবে দেশে আসে রেমিট্যান্স। এর প্রতিদান হিসেবে তাদের মূল্যায়ন করাটা জরুরি।

অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রামের চেয়ারম্যান শাকিরুল ইসলাম বলেন, 'একজন অভিবাসী কর্মী কতটুকু ভালো আছে, তার নিরাপত্তার জায়গা নিশ্চিত আছে কি না? তাকে রাষ্ট্র থেকে আরও কিছু সুযোগ সুবিধা দেয়া উচিত।'

প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিকে যেমন চাঙ্গা করছে তেমনি উৎসবের অর্থনীতিতেও যোগ করেছে নতুন মাত্রা।

এমএসআরএস