শিল্প-কারখানা
অর্থনীতি
ছোট্ট জেলা কুড়িগ্রামে শিল্পায়নের জোয়ার
ভুটানের জন্য নির্ধারিত ২০০ একরের বেশি জমিতে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে। এ নিয়ে উত্তরের মানুষের আনন্দের সীমা নেই। অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা হলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়বে উত্তরের দারিদ্র্য পীড়িত ছোট্ট জেলা কুড়িগ্রামে। এখান থেকে ভুটানের দূরত্ব কম আর সড়ক নৌ ও বিমানপথে সহজ যোগাযোগ হওয়ায় এ অঞ্চল হয়ে উঠবে উত্তরের বাণিজ্যিক হাব।

ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, ধরলা কিংবা দুধকুমার বিধৌত জেলা কুড়িগ্রাম আর দরিদ্রতা যেন একই মুদ্রার দুই পিঠ। কুড়িগ্রামের দু:খ ছুঁয়েছে কবিতার কলমেও। এ জন্য বুঝি সৈয়দ শামছুল হক লিখেছেন, 'সমস্ত নদীর অশ্রু অবশেষে, ব্রহ্মপুত্রে মেশে।'

২০২২ সালে দেশের ৫৭৭টি উপজেলা ও থানার দারিদ্র্য পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর করা দারিদ্র্য মানচিত্র যেন এ কুড়িগ্রামের পিছিয়ে পড়াকে দিয়েছে দালিলিক স্বীকৃতি। যেখানে দেখানো হয় এ জেলার চর রাজিবপুর দেশের সবচেয়ে দরিদ্র উপজেলা, যেখানে দারিদ্র্যের হার ৭৯.৮ শতাংশ।

ভৌগলিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়েও মঙ্গার দুঃখ কেন ছাড়ে না কুড়িগ্রামকে? এমন প্রশ্নের উত্তরও মেলে সহজে। জেলায় বিসিক শিল্পনগরী ছাড়া নেই আর কোন কর্মমুখী প্রতিষ্ঠান। সেখানকার বেশিরভাগ প্লটে হাসকিং মিল গড়ে ওঠায় হয়নি কর্মসংস্থানের বড় কোন সুযোগ।

অর্থনৈতিক অঞ্চলের ফলে আমূল পরিবর্তন আসবে জেলার কৃষিতে। ছবি: এখন টিভি

এছাড়া জেলার দুটি মাত্র ভারি শিল্প কুড়িগ্রাম টেক্সটাইল ও স্পিনিং মিলেও নেই কোন উৎপাদন কার্যক্রম। এ জন্য এখানকার প্রায় ৮০ ভাগ মানুষকেই কেবল কৃষির উপর নির্ভর করে করতে হয় জীবনযাপন। বছরে বড়জোর ৩ থেকে ৪ মাস স্থানীয়ভাবে কাজ করার সুযোগ থাকে এখানকার কর্মজীবীদের।

তবে এবার মঙ্গার মাটিতে ফুটছে শিল্পায়নের ফুল। গড়ে উঠছে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল। প্রতিবেশী দেশ ভুটানের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়াতে দেশটির জন্য কুড়িগ্রামে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরি করছে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা)। বিশেষ এ অর্থনৈতিক অঞ্চলটির সীমানা কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার মাধবরাম মৌজা, বাঞ্চারাম, সড়া ও কল্যাণ মৌজার অন্তর্ভুক্ত। এ পর্যন্ত বেজা'র অনুকূলে ১৩৩.৯২ একর জমি অধিগ্রহণ হয়েছে। এছাড়া আরও ৬১.৮৭ একর জমি রয়েছে অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ায়।

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইদুল আরীফ বলেন, 'শুধু জেলা নয়, পুরো অঞ্চলে যাতায়াতের সুবিধা হবে। নতুন করে চাহিদা তৈরি হবে। সেগুলো এ অঞ্চলকে আরও প্রসারিত করবে।'

যোগাযোগ খাতের হবে দৃশ্যমান উন্নতি। ছবি: এখন টিভি

কুড়িগ্রামের সোনাহাট স্থলবন্দর হয়ে ভুটানের ফুন্টশোলিং এলাকার দূরত্ব কম। সোনাহাট ও রৌমারী স্থলবন্দর এবং চিলমারী নৌ-বন্দর ব্যবহার করে সহজেই যোগাযোগ করা যায় ভুটানের সঙ্গে। এছাড়া সীমানায় জেলার ৯ উপজেলার মধ্যে ৭ উপজেলার সঙ্গেই ভারতের তিন রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, মেঘালয়ের সীমান্ত প্রায় ২৭৮.২৮ কিলোমিটার। ফলে এ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে উঠলে একদিকে যেমন দুই দেশের মধ্যে নতুন ব্যবসা-বা‌ণি‌জ্যে নব দিগন্তের সূচনা হবে তেমনি এখানে কর্মসংস্থান হবে জেলার হাজারও মানুষের।

কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এ কে এম জাকির হোসেন বলেন, 'এ অর্থনৈতিক অঞ্চলকে কেন্দ্র করে মানবসম্পদ উন্নয়ন হবে এবং কৃষির সঙ্গে একটি অনবদ্য সম্পর্ক তৈরি হবে। এখানে কৃষি বিষয়ক ইন্ড্রাস্ট্রি হবে। এটাকে আমরা কৃষি উন্নয়নের হাব হিসেবে চিন্তা করছি।'

সোনাহাট স্থলবন্দর দিয়ে বাড়বে আমদানি-রপ্তানি। ছবি: এখন টিভি

ভুটানের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রথম অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর হয় ২০২০ সালে। চুক্তির আওতায় ১০০টি পণ্যের শুল্কমুক্ত রপ্তানি ও ৩৪টি পণ্যের দেয়া হয় আমদানি অনুমতি। ফলে ২০২১-২২ অর্থবছরে ভুটানের সঙ্গে বাংলাদেশের মোট বাণিজ্যের পরিমাণ দাঁড়ায় ৪৫.০৬ মিলিয়ন ডলার।

ভুটানে বাংলাদেশের বড় রপ্তানি বাজার ফার্মাসিউটিক্যালস, সিরামিকস, গার্মেন্টস আর খাদ্যপণ্য সামগ্রীর। অন্যদিকে ভুটান থেকেও আমদানি করা হয় ক্যালসিয়াম কার্বাইড, সিমেন্টসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্য।

২০২৩ সালের মে মাসে লন্ডনে ভুটানের রাজা ও রানির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সভায় কুড়িগ্রামে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেই ধারাবাহিকতায় ভুটানের রাজার বাংলাদেশ সফরে ৫৪তম স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে সই হয় অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার চুক্তি।

এভিএস