দেশে এখন
পরিবেশ ও জলবায়ু
১২শ' কোটি টাকার তীর রক্ষা প্রকল্প নিয়ে প্রশ্ন
কোনভাবেই থামছে না নদী দূষণ। বর্ষাকালে কিছুটা ব্যবহার উপযোগী হলেও শুষ্ক মৌসুমে রাজধানীর চারপাশের নদীর পানির বিষ যেন কমছেই না। গৃহস্থালি ও রাসায়নিক বর্জ্যের পাশাপাশি শুধু তৈরি পোশাক শিল্প থেকে ৭২ রকমের ক্ষতিকর পদার্থ গিয়ে মিশছে বুড়িগঙ্গা-তুরাগে। নদী শুকিয়ে চরে পরিণত হওয়ায় ঢাকার চারপাশে চলমান প্রায় ১২শ কোটি টাকার তীর রক্ষা প্রকল্পের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

দৃষ্টিনন্দন ঝকঝকে ওয়াকওয়ে আর এর মাঝে ছোট ছোট বেইলি সেতু. সঙ্গে নানা নকশার রেলিং আর নিচে রঙ বেরংয়ের টাইলস। রয়েছে আধুনিক জেটি ও মাথা উঁচু করে দাড়িয়ে থাকা শত শত সীমানা পিলার। ঢাকার চারপাশের নদী তীর রক্ষায় করা হচ্ছে এসব স্থাপনা। কংক্রিকের খাড়া পাইল বা পানি প্রবাহ ঠিক রেখে করা পিলারের ওপর করা হয়েছে এসব নির্মাণ।

পণ্য উঠা-নামার জন্য আধুনিক জেটি। ছবি: এখন টিভি

তবে যে নদী বা নদীর পানির জন্য করা হচ্ছে এসব, সেই পানি এখন শতভাগ কুচকুচে কালো আর দুর্গন্ধময়। যা আলকাতরার ঘন কালোকেও হার মানাবে। নানা ধরনের প্লাস্টিক, তরল ও জৈব রাসায়নিক বর্জ্য এবং গৃহস্থালি ও হাসপাতালের ময়লা আবর্জনা মিশে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ যেন পরিণত হয়েছে বিষাক্ত ভাগাড়ে। যে ভাগাড় প্রাণ কেড়ে নিয়েছে ময়লা আবর্জনা হজম করার মতো শক্তিশালী সাকার মাছেরও।

পাশাপাশি বিষাক্ত পানি দিয়ে নানা ধরনের রোগজীবানুতেও আক্রান্ত হচ্ছেন স্থানীয়রা। বলেন, এই পানিতে তো এখন গোসল চলেই না। হাত-পা ধুইলে ঘা হইয়া যায়। আগে এই নদী থেকে অনেক বড় বড় মাছ খাইছি। আর এখন একটা পুটি মাছও পাওয়া যায় না। এই পানি বিষাক্ত ব্যবহারের উপযুক্ত না। গোসল করলে শরীরে পচন ধরবে।

শুধু দূষণই নয়, এসব অব্যবস্থাপনার কারণে বুড়িগঙ্গা তুরাগের অনেক জায়গাতেই সৃষ্টি হয়েছে বড় বড় চর। বিশেষ করে ধউড় সেতু থেকে টঙ্গী পর্যন্ত পুরো তুরাগ শুকিয়ে পরিণত হয়েছে নালাতে।

বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ নদীর পানি এখন ঘন কালো। ছবি: এখন টিভি

নদী রক্ষা কমিশনের তথ্য বলছে, ঢাকার চারপাশের নদীতে প্রায় ৭০০ উৎসমুখ থেকে রাসায়নিক, গৃহস্থালি ও ওয়াসার বর্জ্য ফেলা হচ্ছে। শুধু পোশাক শিল্প কলকারাখানা থেকেই ৭২ রকমের ক্ষতিকর রাসায়নিক মিশছে পানিতে। আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান এলেন ম্যাকআর্থার ফাউন্ডেশনের তথ্য বলছে, প্রতিবছর যে পরিমাণ রঙ ঢাকার চারপাশের নদীতে মিশছে, তা দিয়ে অলিম্পিকের ৩৭ মিলিয়ন সুইমিংপুল ভরে ফেলা সম্ভব। ভুক্তভোগীরা বলছেন, তীর রক্ষার চেয়ে এখন দূষণ বন্ধ করা জরুরি।

পরিবেশ আইনজীবী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, 'প্রকল্পগুলো যতটুকুই বাস্তবায়িত হয়েছে তার সুফল নগরবাসী পাচ্ছে না। নদী জনসম্পত্তি, পানির প্রতিটা আধারকে নষ্ট করে দিয়ে কীভাবে উন্নয়নকে টেকসই করা সম্ভব! নদীর পানি দূষিত হয়ে যাওযার কারণে আন্ডারগ্রাউন্ড পানির উপর চাপ পড়ছে। যে কারণে ঢাকা শহরে পানির স্তর নেমে যাচ্ছে।'

নদীতে ভাসছে মৃত সাকার মাছ। ছবি: এখন টিভি

পরিবেশমন্ত্রী এসবের জন্য শিল্প কলকারখানা ও বিভিন্ন সরকারি সংস্থার অনিয়মকে দায়ী করে ব্যবস্থা নেয়ার কথা জানিয়েছেন। আর বিআইডব্লিউটিএ বলছে, বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়নে ঢাকার চারপাশের নদীর তলদেশে থাকা বর্জ্য তুলে দূষণমুক্ত করতে একাধিক প্রকল্প হাতে নেয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান কমডোর আরিফ আহমেদ মোস্তফা বলেন, 'নদীর তলদেশে যে প্লাস্টিক আছে তা ড্রেজারের মাধ্যমে তোলা সম্ভব না। সেই জন্য আমরা গ্রাব ড্রেজার সংগ্রহ করছি। এ বছরেই আমরা গ্রাব ড্রেজার গ্রহণ করতে সক্ষম হবো। যেহেতু সংযোগকারী নদী তাই খনন করা হলে ঢাকার নদীগুলোতে পানি প্রবাহ বাড়বে।'

শিল্প কলকারখানার বর্জ্য মিশছে নদীতে। ছবি: এখন টিভি

বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রী সাবের হোসেন চৌধুরী বলেন, 'অনেক জায়গায় ইটিপি আছে তবে তা ব্যবহার করা হয় না। সরাসরি পয়:নিষ্কাশনগুলোও দায়ী। স্মার্ট মনিটরিংয়ের মাধ্যমে নিশ্চিত করতে যাচ্ছি যে ইটিপি যেন তার কাজটা করে। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে যেন আমরা মনিটর করতে পারি। দায়ীদের বিরুদ্ধে অবশ্যই কঠিন ব্যবস্থা নেয়া হবে।'

বিশ্ব ব্যাংকের তথ্যমতে, নদী দূষণ বন্ধে পদক্ষেপ না নিলে আগামী ২০ বছরে রাজধানী ঢাকা প্রায় ৫১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হবে।

এভিএস