আমেরিকার বিশ্বকাপ দলে অভিবাসীদের মিলনমেলা

যুক্তরাষ্ট্র ফুটবল দল
যুক্তরাষ্ট্র ফুটবল দল | ছবি: সংগৃহীত
0

প্যারাগুয়েকে ৪-১ গোলে উড়িয়ে দিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপে নিজেদের ঘরের মাঠে রাজকীয় শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু মাঠের সেই জাদুকরী পারফরম্যান্স ছাপিয়ে এখন বিশ্বজুড়ে তোলপাড় চলছে ইউএসএ ফুটবল দলের অন্দরমহল নিয়ে।

আমেরিকান সকার দলের ২৬ সদস্যের স্কোয়াডের দিকে তাকালে এটিকে ফুটবল টিম কম, আন্তর্জাতিক অভিবাসী মেলা বেশি মনে হতে পারে! দলের অর্ধেকের বেশি বুটের মালিকের রয়েছে দ্বৈত নাগরিকত্ব, আর ছয়জন তো আমেরিকার মাটিতে জন্মই নেননি।

সবচেয়ে বড় ধামাকা হলো, উদ্বোধনী ম্যাচের জোড়া গোলের মহানায়ক ফোলারিন বালোগান আজ মার্কিন জার্সি গায়ে জড়াতে পেরেছেন কেবল এমন এক আইনি মারপ্যাঁচে, যা চিরতরে উপড়ে ফেলতে গত ২০ জানুয়ারি, ২০২৫-এ নির্বাহী আদেশ সই করে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে খোদ ট্রাম্প প্রশাসন।

সুপ্রিম কোর্টে গত এপ্রিল মাসে এ নিয়ে জোরদার আইনি লড়াই ও বিতর্ক হয়েছে এবং চলতি জুন বা জুলাইয়ের শুরুতেই এর চূড়ান্ত রায় আসার কথা রয়েছে, যা মাঠের উত্তাপ বারান্দা পর্যন্ত নিয়ে গেছে।

আরও পড়ুন

ফুটবল রোমান্টিকদের জন্য বালোগানের গল্পটা একদম সিনেমার মতো। ২০০১ সালের গ্রীষ্মে তার নাইজেরিয়ান মা ফ্লোরেন্স যখন নিউ ইয়র্ক থেকে লন্ডনে ফেরার ফ্লাইটে উঠতে যান, তখন তিনি সাত মাসের গর্ভবতী হওয়ায় এয়ারলাইন কর্মীরা প্রয়োজনীয় মেডিকেল ক্লিয়ারেন্স না থাকার অজুহাতে তাকে আটকে দেয়। ব্যাস, বাধ্য হয়ে নিউ ইয়র্কে থেকে যাওয়া এবং ৩ জুলাই ব্রুকলিনের মাটিতে বালোগানের প্রথম কান্নার আওয়াজ শোনা। মার্কিন সংবিধানের ১৪তম সংশোধনীর বার্থরাইট সিটিজেনশিপের কল্যাণে অবলীলায় আমেরিকান বনে যান তিনি। অথচ ট্রাম্পের নতুন নীতি যদি তখন থাকত, যেখানে বাবা-মা বৈধ বাসিন্দা বা নাগরিক না হলে সন্তান নাগরিকত্ব পাবে না, তাহলে আজ মার্কিন ডাগআউটে নয়, বালোগান হয়তো গ্যালারিতে বসে পপকর্ন খেতেন! ম্যাচ শেষে আবেগাপ্লুত বালোগান নিজেই বলেছেন, বিশ্বকাপে অভিষেকের রাতে গোল করার যে স্বপ্ন তিনি দেখতেন, বাস্তবতার আনন্দ সেই কল্পনাকেও ছাড়িয়ে গেছে।

শুধু বালোগানই নন, মার্কিন স্টার ক্রিশ্চিয়ান পুলিসিকের রক্তেও বইছে ক্রোয়েশিয়ান অভিবাসী দাদা মেট পুলিসিকের রক্ত, যিনি বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি ওলিব দ্বীপ থেকে যুগোস্লাভিয়ার অভিবাসী ঢেউয়ের সঙ্গে আমেরিকায় এসেছিলেন। সেই ক্রোয়েশিয়ান পাসপোর্টের জোরেই কোনো ওয়ার্ক পারমিট ছাড়াই মাত্র ১৬ বছর বয়সে জার্মানির বরুশিয়া ডর্টমুন্ডে খেলার সুযোগ পান পুলিসিক। উইঙ্গার টিম উইয়াহর ধমনীতে কাঁপন তোলে জ্যামাইকান-আমেরিকান মা ক্লারের টান, আর বাবা জর্জ উইয়াহ তো ব্যালন ডি’অর জয়ী একমাত্র আফ্রিকান ফুটবল ঈশ্বর ও লাইবেরিয়ার ২৫তম প্রেসিডেন্ট! লস অ্যাঞ্জেলেসে জন্ম নেয়া কভেন্ট্রি সিটির তারকা হাজি রাইটের বাবা ঘানার এবং মা লাইবেরিয়ার নাগরিক। আবার টেক্সাসের এল পাসোতে জন্ম নেয়া রিকার্ডো পেপি এবং ক্যালিফোর্নিয়ার ক্রিশ্চিয়ান রোলডান, উভয়ই মেক্সিকান আমেরিকান দ্বৈত নাগরিক।

দলের বাকি তিন বিদেশি বংশোদ্ভূতের গল্পও কম আকর্ষণীয় নয়। রাইট-ব্যাক সার্জিনো ডেস্টের জন্ম নেদারল্যান্ডসের আলমেরে-তে; তার সুরিনামি আমেরিকান বাবা মার্কিন সামরিক বাহিনীতে প্রায় ২৫ বছর সেবা দিয়েছেন। লেফট-ব্যাক অ্যান্টনি রবিনসন জন্মেছেন ইংল্যান্ডের মিল্টন কেইনসে; তার বাবা মার্লন পরে নিউ ইয়র্কের হোয়াইট প্লেইনসে চলে আসেন এবং ডিউক ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করে মার্কিন নাগরিক হন। মিডফিল্ডার মালিক টিলম্যানের জন্ম জার্মানির নুরেমবার্গে মার্কিন সামরিক ঘাঁটির কাছে এবং তার বাবাও মার্কিন সেনাবাহিনীতে ছিলেন।

এছাড়া জিও রেইনা ইংল্যান্ডের সান্ডারল্যান্ডে এবং সেবাস্তিয়ান বারহাল্টার লন্ডনে জন্মগ্রহণ করেন, যখন তাদের বাবারা সেখানে পেশাদার ফুটবল খেলতেন। মেক্সিকোর সিউদাদ জুয়ারেজে জন্ম নেয়া আলেজান্দ্রো জেন্দেজাস তো বুক ফুলিয়ে বলেন, একই সঙ্গে দুই দেশের নাগরিকত্ব পেয়ে তিনি দারুণ কৃতজ্ঞ।

মাঠের দুর্দান্ত ফুটবল আর মাঠের বাইরের এ ইমিগ্রেশন পলিটিক্স সব মিলিয়ে ঘরের মাঠের বিশ্বকাপ আমেরিকার জন্য যেমন এক নতুন সোনালী অধ্যায়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে, তেমনি ট্রাম্পের কড়া নীতির মুখে মার্কিন সকারের এ ‘গ্লোবাল রূপ’ টুর্নামেন্ট জুড়ে এক চরম থ্রিলার ড্রামা তৈরি করে রাখবে, তা বলাই বাহুল্য!

জেআর