রাজনৈতিক দলের নেতারা মনোনয়ন দৌড়ে এগিয়ে থাকবেন এটিই স্বাভাবিক, যদিও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ক্ষেত্রে ঘটেছে এর উল্টো।
দলের ত্যাগী নেতাদের ছাপিয়ে মনোনয়ন বাগিয়ে নিয়েছেন বেশকিছু বিদেশ ফেরত নেতা। জনগণের সাথে সম্পৃক্ততা না থাকলেও কেবল হাইকমান্ডের সুপারিশে মিলেছে নির্বাচনের টিকিট। বিশেষ করে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে অবস্থানরত সফল ব্যবসায়ী ও পেশাজীবীরা তালিকায় প্রাধান্য পেয়েছেন।
বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলে রয়েছেন এমন একাধিক প্রার্থী। যারা গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে দেশে ফিরে গণসংযোগে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। আর এতেই তৈরি হয়েছে বিভক্তি। কোন কোন আসনে দেখা দিয়েছে দলের অভ্যন্তরীণ ভাঙন।
শরীয়তপুর-৩ আসনের কথাই ধরা যাক। আসনটিতে দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচনের জন্য মাঠ গুছিয়েছেন বিএনপির জেলা সাংগঠনিক সম্পাদক সাঈদ আসলাম। কিন্তু প্রায় ৮ বছর পর লন্ডন থেকে দেশে ফিরে সেখানে প্রার্থী হন তারেক রহমানের একান্ত সচিব মিয়া নুরুদ্দীন অপু।
এমন বাস্তবতায় সাঈদ আসলামকে সরিয়ে দেয়া হয় শরীয়তপুর-১ আসনে। তবে কপাল পুড়েছে সেই এলাকার মনোনয়ন প্রত্যাশী বিএনপির জেলা সেক্রেটারি সরদার নাসিরউদ্দিনের। যিনি বিগত ১৭ বছর আন্দোলন-সংগ্রামে ছিলেন সক্রিয় ভূমিকায়।
তবে কী ত্যাগী নেতারা বঞ্চিত হচ্ছেন? এমন প্রশ্নে তৃণমূলে অভ্যন্তরীণ কোনো দ্বন্দ্ব বা ক্ষোভ নেই বলে মন্তব্য মনোনয়ন পাওয়া প্রার্থীদের। বলেন, দল ও জনগণের সমর্থনেই এমন সিদ্ধান্ত।
শরীয়তপুর-৩ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মিয়া নুরুদ্দিন অপু বলেন, ‘বিএনপির মতো দলে বিভিন্ন আসনে ১০ থেকে ১৫ জন এমপি ইলেকশন করার মতো আছে। সবাইকে কি দিতে পারবেন? বাকিরা কি দল ছেড়ে চলে গেছে? না। আপনি দেখেন কোনো জায়গায় বিদ্রোহ হয় নি। সব জায়গায় আমাদের ঘোষিত প্রার্থীর জন্য কাজ করছে।’
কেবল বিএনপি নয়, জামায়াতের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা। বগুড়া-৪ আসনে মনোনয়ন প্রত্যাশী জেলা সভাপতি কিংবা সেক্রেটারি নির্বাচনের টিকিট না পেলেও সবুজ সংকেত পেয়েছেন মোস্তফা ফয়সাল পারভেজ। যিনি দীর্ঘ সময় ছিলেন তুরস্কে। অপরিচিত মুখ হওয়ায় এতে স্থানীয়রা পড়েছেন দ্বিধাদ্বন্দ্বে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এবার অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি সংখ্যক বিদেশ ফেরত প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। এতে জনগণের সঙ্গে জনপ্রতিনিধির সম্পর্কে টানাপোড়ন দেখা দেবে বলেও মত তাদের। রয়েছে রাজনৈতিক পরিবেশ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কাও।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘যে লোক রাজপথে ছিল তার কোয়ালিটি নাই, সামর্থ্য নাই, অর্থ দিতে পারছে না, যোগ্যতা দেখাতে পারছেন না। সে রাজপথ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। একই অবস্থা হচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলোতেও। দেখা যাচ্ছে যে বিদেশ থেকে আসছে সে শারীরিকভাবে সুস্থ। সে পারিবারিকভাবে স্বচ্ছল। সে বিদেশে থাকার কারণে বিভিন্ন ধরনের ডিগ্রি নিয়েছে, লেখাপড়া করেছে, যোগ্যতা অর্জন করেছে। নেটওয়ার্ক মেইনটেইন করেছে। সে আজকে আবার মনোনয়ন পাচ্ছে।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেন, ‘যারা নমিনেশন পেয়েছে, যেহেতু বাইরে থেকে এসেছে তৃণমূলে যোগাযোগ নাই তাদের তো কর্মী লাগবে ভোটে জিততে হলে। তাদের জন্য তো কাজ করতে হবে বিএনপির নেতাকর্মীদের। আমার মনে হয় সেখানে বিএনপি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।’
বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াত দলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব কাটিয়ে উঠতে পারলেও ক্ষতির মুখে পড়বে বিএনপি। তাই গেল ১৭ বছর মাঠের কর্মীদের প্রাধান্য দেয়া প্রয়োজন বলেও মনে করছেন তারা।
অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেন, ‘যেকোনো পার্টি বিশেষ করে বিএনপি ক্ষতিগ্রস্ত হবে বেশি। কারণ জামায়াতের মধ্যে শৃঙ্খলা আছে। তাদের মধ্যে কাউকে বাদ দিলেও বিশৃঙ্খলা বা পার্টিকে চ্যালেঞ্জ করা এমন কিছু হবে না।’
অধ্যাপক কাজী মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘আপনি যদি রাজনৈতিক দলকে সঠিকভাবে চালাতে চান তাহলে ডেডিকেটেড কর্মীদের প্রাধান্য দিতে হবে। ডেডিকেটেড কর্মীদের প্রাধান্য দিলে দল সঠিক পথে চলবে। আর আপনি যদি হাইব্রিড কর্মীদের প্রাধান্য দেন তারা দলটাকে ব্যবহার করবে।’
রাজনীতি পথে হাটতে বিদেশ থেকে ফিরে এনসিপিতে যোগ দেন তাসনিম জারা। পরে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনের নমিনেশন নেন। এমন বিদেশ ফেরত স্বতন্ত্র প্রার্থীও দেখা যাবে আগামী ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে।





