কাবার গিলাফ স্পর্শ বা চুমু খাওয়ায় কি সওয়াব হয়?

কাবার গিলাফ চুমু খাওয়ার বিধান
কাবার গিলাফ চুমু খাওয়ার বিধান | ছবি: এখন টিভি
0

পবিত্র কাবা শরিফ (Holy Kaaba) মুসলিম উম্মাহর কাছে পৃথিবীর সবচাইতে পবিত্র ও সম্মানিত স্থান। হজের সময় কিংবা ওমরাহ পালনকালে হাজিদের আবেগময় মুহূর্তে কাবার দেয়াল বা কাবার গিলাফ (Kiswah of Kaaba) জড়িয়ে ধরে কাঁদতে দেখা যায়। অনেকে ভক্তিভরে গিলাফে চুমু খেয়ে থাকেন। কিন্তু ইসলামের শরয়ী বিধান (Islamic Sharia Rules) অনুযায়ী এটি কতটুকু সঠিক এবং এতে কোনো সওয়াব আছে কি না, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে অনেক জিজ্ঞাসা রয়েছে।

শরীয়তের দৃষ্টিতে গিলাফ চুমু খাওয়ার বিধান (Islamic Ruling on Kissing Kaaba Cover)

ভারতের প্রখ্যাত ইসলামী বিদ্যাপীঠ দারুল উলুম দেওবন্দের (Darul Uloom Deoband) ইফতা বিভাগ এ বিষয়ে একটি সুস্পষ্ট ফতোয়া প্রদান করেছে। নির্ভরযোগ্য মাসআলা সংক্রান্ত কিতাব ‘মুয়াল্লিমুল হাজ্জাজ’-এর উদ্ধৃতি দিয়ে তারা জানিয়েছেন:

১. চুম্বনের নির্ধারিত স্থান: কাবার হাজরে আসওয়াদ (Black Stone) এবং কাবার চৌকাঠ বা মুলতাজাম (Multazam) ছাড়া অন্য কোনো কোণ বা দেয়াল চুম্বন করা শরীয়তে নিষেধ।

২. রুকনে ইয়ামানি: কাবার অন্যতম কোণ ‘রুকনে ইয়ামানি’ (Rukn-e-Yamani) কেবল হাত দিয়ে স্পর্শ করা সুন্নাহ, তবে এখানেও চুম্বন করা যাবে না।

৩. গিলাফ ধরা বা ঘষা: ইবাদতের অংশ মনে করে কাবার গিলাফ ধরা, তাতে শরীর ঘষা বা গিলাফ জড়িয়ে ধরা শরীয়তের দৃষ্টিতে অনুমোদিত নয়। সুন্নাহর সঠিক অনুসরণের জন্য এসব থেকে বিরত থাকাই শ্রেয়।

আরও পড়ুন:

গিলাফের টুকরো সংরক্ষণ ও স্পর্শ (Rules for Keeping Pieces of Kiswah)

অনেকের সংগ্রহে কাবার পুরনো বা নতুন গিলাফের টুকরো (Pieces of Kaaba cloth) থাকে। ফতোয়া অনুযায়ী, ভক্তি ও ভালোবাসার নিদর্শন হিসেবে গিলাফের আলাদা কোনো টুকরো হাতে নেওয়া বা স্পর্শ করায় কোনো ক্ষতি নেই। এটি জায়েজ বলে গণ্য হবে। কাবা শরিফ জিয়ারতের সময় আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে শরীয়ত নির্ধারিত স্থানগুলো ছাড়া অন্য কোথাও চুম্বন বা স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকাই সুন্নাহর সঠিক অনুসারী হওয়ার লক্ষণ।

স্থানের নাম (Name of Place) শরয়ী বিধান (Sharia Ruling) মন্তব্য (Comments)
হাজরে আসওয়াদ চুম্বন ও স্পর্শ করা সুন্নাত আমল
মুলতাজাম (চৌকাঠ) চুম্বন ও জড়িয়ে ধরা দোয়া কবুলের স্থান
রুকনে ইয়ামানি শুধু হাত দিয়ে স্পর্শ চুম্বন করা নিষেধ
কাবার গিলাফ চুম্বন বা জড়িয়ে ধরা অনুচিত সুন্নাহর পরিপন্থী

আরও পড়ুন:

কাবার গিলাফ ও জিয়ারত সংক্রান্ত প্রশ্নোত্তর-FAQ

প্রশ্ন: কাবার গিলাফ চুমু খেলে কি সওয়াব হয়?

উত্তর: শরীয়তের নির্ভরযোগ্য কিতাব অনুযায়ী, হাজরে আসওয়াদ এবং মুলতাজাম ছাড়া কাবার অন্য কোনো স্থান বা গিলাফ চুমু খাওয়ার আলাদা কোনো সওয়াব নেই।

প্রশ্ন: কাবার গিলাফ কি জড়িয়ে ধরা জায়েজ?

উত্তর: ইবাদতের অংশ মনে করে গিলাফ জড়িয়ে ধরা বা তাতে শরীর ঘষা সুন্নাহসম্মত নয়; বরং এটি পরিহার করাই সুন্নাহর সঠিক অনুসরণ।

প্রশ্ন: রুকনে ইয়ামানি (Rukn-e-Yamani) কি চুমু খাওয়া যাবে?

উত্তর: না, রুকনে ইয়ামানি শুধু হাত দিয়ে স্পর্শ করা সুন্নাহ, তবে সেখানে চুম্বন করা শরীয়তে নিষেধ।

প্রশ্ন: কাবার গিলাফ স্পর্শ করার বিধান কী?

উত্তর: কাবার দেয়ালে গিলাফ থাকা অবস্থায় তা ইবাদত মনে করে স্পর্শ করা বা তাতে হাত ঘষা থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে।

প্রশ্ন: মুলতাজাম (Multazam) বা কাবার চৌকাঠ কি চুমু দেওয়া যায়?

উত্তর: হ্যাঁ, হাজরে আসওয়াদ এবং মুলতাজাম (কাবার দরজা ও হাজরে আসওয়াদের মধ্যবর্তী স্থান) চুম্বন করা এবং জড়িয়ে ধরে দোয়া করা অনুমোদিত।

প্রশ্ন: গিলাফের ছোট টুকরো সংগ্রহে রাখা কি জায়েজ?

উত্তর: হ্যাঁ, ভালোবাসা ও ভক্তির নিদর্শন হিসেবে গিলাফের আলাদা কোনো টুকরো সংগ্রহে রাখা বা স্পর্শ করায় কোনো ক্ষতি নেই।

প্রশ্ন: কাবার গিলাফ কোন কাপড় দিয়ে তৈরি করা হয়?

উত্তর: কাবার গিলাফ বা 'কিসওয়াহ' সাধারণত খাঁটি রেশম (Silk) এবং সোনা ও রুপার সুতা দিয়ে তৈরি করা হয়।

প্রশ্ন: প্রতি বছর কখন কাবার গিলাফ পরিবর্তন করা হয়?

উত্তর: ঐতিহ্যগতভাবে ৯ই জিলহজ (আরাফাতের দিন) গিলাফ পরিবর্তন করা হতো, তবে বর্তমানে এটি ১লা মহররম (ইসলামী নববর্ষ) পরিবর্তন করা হয়।

প্রশ্ন: গিলাফ চুমু খাওয়া কি বিদআত?

উত্তর: যেহেতু রাসূল (সা.) হাজরে আসওয়াদ ও মুলতাজাম ছাড়া অন্য কোথাও চুমু খাননি, তাই অন্য স্থানে চুমু খাওয়াকে ইবাদত মনে করা সুন্নাহর পরিপন্থী আমল।

প্রশ্ন: কাবার গিলাফের টুকরো কি বরকতের জন্য শরীরে ছোঁয়ানো যায়?

উত্তর: আলাদা থাকা গিলাফের টুকরো মহব্বতের কারণে স্পর্শ করা জায়েজ বলে ফতোয়ায় উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রশ্ন: কাবার গিলাফে কী লেখা থাকে?

উত্তর: গিলাফে অত্যন্ত চমৎকার ক্যালিগ্রাফিতে পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন আয়াত এবং আল্লাহর গুণবাচক নামসমূহ খচিত থাকে।

প্রশ্ন: গিলাফ স্পর্শ করলে কি ওজু নষ্ট হয়?

উত্তর: না, কাবার গিলাফ স্পর্শ করলে ওজু নষ্ট হয় না।

প্রশ্ন: পুরনো গিলাফ পরিবর্তনের পর সেগুলো কী করা হয়?

উত্তর: পুরনো গিলাফ খুলে টুকরো টুকরো করে বিভিন্ন মুসলিম দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এবং জাদুঘরে উপহার হিসেবে পাঠানো হয়।

প্রশ্ন: কাবার গিলাফ তৈরির কারখানা কোথায় অবস্থিত?

উত্তর: এটি সৌদি আরবের পবিত্র মক্কা নগরীর 'উম্মুল জুদ' এলাকায় অবস্থিত।

প্রশ্ন: কাবার গিলাফ নিয়ে দারুল উলুম দেওবন্দের ফতোয়া কী?

উত্তর: দেওবন্দের ফতোয়া অনুযায়ী, নির্দিষ্ট স্থান (হাজরে আসওয়াদ ও মুলতাজাম) ছাড়া অন্য কোথাও চুম্বন বা স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকাই সুন্নাহর সঠিক অনুসরণ।

এসআর