বজ্রপাত ও অতিবৃষ্টি থেকে বাঁচতে নবীজি (সা.)-এর শেখানো শক্তিশালী ৪টি দোয়া

বজ্রপাত ও অতিবৃষ্টি থেকে বাঁচার দোয়া
বজ্রপাত ও অতিবৃষ্টি থেকে বাঁচার দোয়া | ছবি: এখন টিভি
0

বজ্রপাত (Lightning) এবং বজ্রসহ ঝড়ো হাওয়া মহান আল্লাহতালার অসীম শক্তির এক অনন্য নিদর্শন। ইসলামি শরিয়তে বজ্রপাতের গর্জন ও আলোর ঝলকানিকে আল্লাহর পক্ষ থেকে সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হয়। এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে আত্মরক্ষায় এবং বিপদ-আপদ থেকে নিরাপদ থাকতে প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) তার উম্মতদের বিশেষ কিছু দোয়া ও তাসবিহ শিক্ষা দিয়েছেন।

একনজরে বজ্রপাতের দোয়া ও আমল (Quick Guide to Duas)

পরিস্থিতি পাঠ্য বিষয়/দোয়া তথ্যসূত্র
বজ্রপাত থেকে সুরক্ষা আল্লাহুম্মা লা তাকতুলনা... তিরমিজি
বজ্রধ্বনি শুনলে সুবহানাল্লাজি ইয়ুসাব্বিহুর রাঅদু... হাদিস শরীফ
অতিবৃষ্টি থেকে সুরক্ষা আল্লাহুম্মা হাওয়ালাইনা ওয়ালা আলাইনা... বুখারি

আরও পড়ুন:

বজ্রপাত কেন হয়? (Why Lightning Happens?)

পবিত্র কোরআনে বজ্রপাতকে আল্লাহর মহিমা ঘোষণা ও মানুষের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সূরা রা’দ-এর ১৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ ইরশাদ করেন, "মেঘের গর্জন তার প্রশংসার সঙ্গে পবিত্রতা ঘোষণা করে।" হাদিস ও বিভিন্ন সূরা অনুযায়ী, পৃথিবীতে অন্যায়, জুলুম-অত্যাচার এবং পাপের কাজ বৃদ্ধি পেলে এমন প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রকোপ বাড়তে পারে। তাই আল্লাহতালার বিধান মেনে চলা এবং বেশি বেশি আল্লাহর জিকিরে মশগুল থাকাই মুমিনের কাজ।

বজ্রপাত থেকে বাঁচার দোয়া (Dua for Protection from Lightning)

বজ্রপাত ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে নিরাপদ থাকতে নবীজি (সা.) বেশ কয়েকটি দোয়া পাঠ করতেন। নিচে প্রধান দোয়াগুলো দেওয়া হলো:

১. বজ্রপাতের শব্দ শুনলে পাঠ করার দোয়া:

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন বজ্রের আওয়াজ শুনতেন, তখন তিনি পাঠ করতেন—

দোয়া: اللَّهُمَّ لاَ تَقْتُلْنَا بِغَضَبِكَ وَلاَ تُهْلِكْنَا بِعَذَابِكَ وَعَافِنَا قَبْلَ ذَلِكَ

উচ্চারণ: "আল্লাহুম্মা লা তাক্বতুলনা বিগাজাবিকা, ওয়া লা তুহলিকনা বিআজাবিকা, ওয়া আফিনা ক্বাবলা জালিকা।"

অর্থ: "হে আল্লাহ, আপনি আমাকে আপনার গজব দিয়ে হত্যা করবেন না এবং আপনার আজাব দিয়ে ধ্বংস করবেন না। এসবের আগেই আপনি আমাকে পরিত্রাণ দিন।" (সূত্র: তিরমিজি)

আরও পড়ুন:

২. বজ্রের আওয়াজ শুনে তসবিহ পাঠ:

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণিত হাদিসে আছে, নবীজি (সা.) বজ্রপাতের শব্দ শুনলেই পড়তেন—

তাসবিহ: سُبْحَانَ الَّذِيْ يُسَبِّحُ الرَّعْدُ بِحَمْدِهِ

উচ্চারণ: "সুবহানাল্লাজি ইয়ুসাব্বিহুর রাঅদু বিহামদিহি।"

অর্থ: "পবিত্র সত্তা, বজ্রও সন্ত্রস্ত হয়ে যার প্রশংসা করে।"

৩. অন্য হাদিসে বর্ণিত দোয়া:

হজরত ইবনে আবি জাকারিয়া (রা.) বলেন, যে ব্যক্তি বজ্রের আওয়াজ শুনে পড়বেন—

سبحان الله وبحمده :তাসবিহ

উচ্চারণ: "সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি।"

অর্থ: "আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা করছি এবং তার প্রশংসা করছি।"

আরও পড়ুন:

অতিবৃষ্টি থেকে বাঁচার দোয়া (Dua for Excessive Rain)

প্রবল বৃষ্টিপাত বা অতিবৃষ্টি থেকে সুরক্ষার জন্য নবীজি (সা.) আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতেন। সহিহ বুখারিতে বর্ণিত হয়েছে, তিনি পড়তেন—

দোয়া: اللَّهُمَّ حَوَالَيْنَا وَلاَ عَلَيْنَا، اللَّهُمَّ عَلَى الآكَامِ وَالظِّرَابِ، وَبُطُونِ الْأَوْدِيَةِ، وَمَنَابِتِ الشَّجَرِ

উচ্চারণ: "আল্লাহুম্মা হাওয়ালাইনা ওয়ালা আলাইনা। আল্লাহুম্মা আলাল-আকামি ওয়াযযিরা-বি ওয়াবুতূনিল আওদিয়াতি, ওয়ামানা-বিতিশ শাজার।"

অর্থ: "হে আল্লাহ, আমাদের পার্শ্ববর্তী এলাকায় বর্ষণ করুন, আমাদের ওপর নয়। হে আল্লাহ, উঁচু ভূমিতে, পাহাড়ে, উপত্যকার কোলে ও বনাঞ্চলে বর্ষণ করুন।"

বজ্রপাত সংক্রান্ত ধর্মীয় তাৎপর্য ও সতর্কতা (Religious Significance)

ইসলামি বিধান অনুযায়ী, বজ্রপাত আল্লাহর গজবের একটি নিদর্শন হতে পারে যদি তা পাপাচার বা সীমালঙ্ঘনের ফল হয়। হাদিস শরীফে এসেছে, বান্দা যদি আল্লাহর বিধান যথাযথ পালন করত, তবে তারা বজ্রপাতের মতো ভীতিকর আওয়াজ শুনত না। তাই বজ্রপাত থেকে প্রকৃত সুরক্ষার জন্য সালাত আদায় এবং অধিক পরিমাণে ইস্তিগফার করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

আরও পড়ুন:

বজ্রপাত ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ সংক্রান্ত জরুরি প্রশ্নোত্তর (FAQ)

প্রশ্ন: বজ্রপাত থেকে বাঁচার সবচেয়ে শক্তিশালী দোয়া কোনটি? (Which is the most powerful dua for lightning?)

উত্তর: নবীজি (সা.) বজ্রধ্বনি শুনলে এই দোয়াটি পড়তেন: "আল্লাহুম্মা লা তাক্বতুলনা বিগাজাবিকা, ওয়া লা তুহলিকনা বিআজাবিকা, ওয়া আফিনা ক্বাবলা জালিকা।"

প্রশ্ন: বজ্রপাতের শব্দ শুনলে কোন তাসবিহ পড়তে হয়? (Which tasbih to read on hearing thunder?)

উত্তর: বজ্রপাতের শব্দ শুনলে মহানবী (সা.) পড়তেন: "সুবহানাল্লাজি ইয়ুসাব্বিহুর রাঅদু বিহামদিহি।" যার অর্থ—পবিত্র সেই সত্তা, বজ্রও যার প্রশংসা করে।

প্রশ্ন: কোরআন অনুযায়ী বজ্রপাত হওয়ার কারণ কী? (What is the cause of lightning according to Quran?)

উত্তর: কুরআনের সূরা রা’দ এবং সূরা নিসা অনুযায়ী, বজ্রপাত আল্লাহর শক্তির বহিঃপ্রকাশ এবং এটি মানুষের জন্য একটি বিশেষ সতর্কবাণী বা শাস্তির মাধ্যম হতে পারে।

প্রশ্ন: অতিবৃষ্টি ও বন্যা থেকে বাঁচতে নবীজি কোন দোয়া পড়তেন? (Dua of Prophet for heavy rain and flood?)

উত্তর: অতিবৃষ্টির সময় নবীজি (সা.) পড়তেন: "আল্লাহুম্মা হাওয়ালাইনা ওয়ালা আলাইনা।" অর্থাৎ, হে আল্লাহ আমাদের পার্শ্ববর্তী এলাকায় বর্ষণ করুন, আমাদের ওপর নয়।

প্রশ্ন: বজ্রপাত থেকে বাঁচতে কোন সূরা পড়া ভালো? (Which Surah is good for protection from lightning?)

উত্তর: নির্দিষ্ট কোনো সূরার কথা উল্লেখ না থাকলেও, বজ্রপাতের নামে পবিত্র কুরআনে 'সূরা রা’দ' নাজিল হয়েছে। এই সূরার তিলাওয়াত ও মর্ম উপলব্ধি করা জরুরি।

প্রশ্ন: ঘর থেকে বের হওয়ার সময় বজ্রপাত হলে কী পড়ব? (What to read if lightning occurs while leaving home?)

উত্তর: যেকোনো বিপদে বা ঘর থেকে বের হওয়ার সময় "বিসমিল্লাহি তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহ" পাঠ করা সুন্নত, যা সকল অনিষ্ট থেকে রক্ষা করে।

প্রশ্ন: বজ্রপাতের সময় কথা বলা কি জায়েজ? (Is it allowed to talk during lightning?)

উত্তর: হাদিস অনুযায়ী, হজরত আবদুল্লাহ ইবনে জুবাইর (রা.) যখন মেঘের গর্জন শুনতেন, তখন সব কথাবার্তা বন্ধ করে আল্লাহর তসবিহ পাঠ করতেন।

প্রশ্ন: সায়েন্টিফিক কারণে কি দোয়া কাজ করে? (Does dua work against scientific lightning?)

উত্তর: ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, প্রাকৃতিক প্রতিটি ঘটনা আল্লাহর হুকুমে ঘটে। দোয়া মানুষের মানসিক শক্তি বাড়ায় এবং আল্লাহর বিশেষ রহমতে বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।

প্রশ্ন: বজ্রপাতে মানুষের মৃত্যু কি আল্লাহর গজব? (Is death by lightning a punishment from Allah?)

উত্তর: মুমিনের জন্য যেকোনো দুর্ঘটনায় মৃত্যু 'শহীদি মর্যাদা' হতে পারে, তবে পাপাচার বাড়লে আল্লাহ সতর্কবাণী হিসেবেও দুর্যোগ পাঠান।

প্রশ্ন: আকাশের বিদ্যুৎ চমকালে কোন দোয়া পড়তে হয়? (Dua for seeing lightning flashes?)

উত্তর: বিদ্যুৎ চমকানো বা বজ্রধ্বনি শুনলে আল্লাহর পবিত্রতা বর্ণনা করে "সুবহানাল্লাহ" বা "আল্লাহু আকবার" পাঠ করা যায়।

প্রশ্ন: ঝড়ের সময় কোন দোয়া পড়তে হয়? (Dua during a storm?)

উত্তর: ঝড়ের সময় নবীজি (সা.) পড়তেন: "আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকা খাইরাহা ওয়া খাইরা মা ফিহা...।" অর্থাৎ, হে আল্লাহ আমি আপনার কাছে এই ঝড়ের কল্যাণ প্রার্থনা করছি।

প্রশ্ন: বজ্রপাত থেকে সুরক্ষায় নবীজির শেখানো আমল কয়টি? (How many amals did Prophet teach for lightning?)

উত্তর: মূলত ৩টি প্রধান আমল পাওয়া যায়: ১. নির্ধারিত দোয়া পড়া, ২. তসবিহ পাঠ করা এবং ৩. কথাবার্তা বন্ধ করে আল্লাহর দিকে মনোনিবেশ করা।

প্রশ্ন: বজ্রপাত নিয়ে কোরআনের ১৩ নম্বর সূরার নাম কী? (What is the name of the 13th Surah of Quran about lightning?)

উত্তর: পবিত্র কোরআনের ১৩ নম্বর সূরার নাম 'সূরা আর-রা’দ' (The Thunder)।

প্রশ্ন: গুনাগার মানুষের ওপর কি বজ্রপাত বেশি হয়? (Does lightning strike sinners more?)

উত্তর: পবিত্র কোরআনে (সূরা যারিয়াত: ৪৪) বলা হয়েছে, আল্লাহর বিধান অমান্য ও জুলুম বাড়লে বজ্রপাতের মতো আজাব আসতে পারে।

প্রশ্ন: বজ্রপাত থেকে বাঁচতে কোনো তসবিহ পড়লে আঘাতপ্রাপ্ত হবে না? (Which tasbih prevents being struck by lightning?)

উত্তর: বর্ণিত আছে, যে ব্যক্তি বজ্রের আওয়াজ শুনে "সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি" পড়বে, সে বজ্রপাতে আঘাতপ্রাপ্ত হবে না। (সূত্র: মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা)



এসআর