শাড়ি বা লুঙ্গি দিয়ে কি যাকাত দেওয়া জায়েজ?

প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি | ছবি: সংগৃহীত
0

পবিত্র রমজান মাস (Ramadan) এলেই সামর্থ্যবান মুসলমানদের মধ্যে যাকাত আদায়ের সচেতনতা বাড়ে। যাকাত ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের একটি এবং এটি একটি ফরজ ইবাদত (Compulsory worship)। তবে আমাদের সমাজে যাকাত হিসেবে শাড়ি বা লুঙ্গি দেওয়ার একটি দীর্ঘদিনের প্রচলন রয়েছে। ইসলামি স্কলারদের মতে, যাকাত নগদ টাকা (Cash money) দিয়ে আদায় করা যেমন জায়েজ, তেমনি পণ্যের (যেমন: কাপড় বা খাদ্যদ্রব্য) মাধ্যমে আদায় করাও বৈধ।

একনজরে যাকাত প্রদানের গাইডলাইন

পদ্ধতি (Method) মন্তব্য (Remarks)
নগদ টাকা (Cash) সবচেয়ে উত্তম; গ্রহীতা তার প্রয়োজনমতো খরচ করতে পারে।
পোশাক (Clothes) জায়েজ; তবে বাজার মূল্য সঠিক হতে হবে এবং মান ভালো হওয়া জরুরি।
খাদ্যসামগ্রী (Food) জায়েজ; বিশেষ করে খাদ্য সংকটে থাকা মানুষদের জন্য উপযোগী।

আরও পড়ুন:

হযরত মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.) যখন ইয়ামেনে যাকাত আদায় করতে গিয়েছিলেন, তখন তিনি দানা-শস্যের পরিবর্তে কাপড় গ্রহণ করেছিলেন, কারণ সেটি মদিনার মুহাজিরদের জন্য বেশি উপকারী ছিল। তবে কাপড় বা পণ্যের মাধ্যমে যাকাত দিতে হলে ৩টি শর্ত অবশ্যই পালন করতে হবে।

শাড়ি বা লুঙ্গি দিয়ে যাকাত দেওয়ার ৩টি শর্ত (3 Conditions for Zakat by Clothes)

১. যথাযথ বাজার মূল্য (Proper market value): আপনি যে শাড়ি বা লুঙ্গি দিচ্ছেন, তার সঠিক বাজার মূল্য হিসাব করতে হবে। ধরুন আপনার ১০০০ টাকা যাকাত ফরজ হয়েছে; এখন আপনি যদি ২৫০ টাকা দামের ৪টি শাড়ি কিনে দেন, তবেই আপনার যাকাত আদায় হবে। কিন্তু পণ্যের দাম বেশি ধরে হিসাব করলে যাকাত আদায় হবে না।

২. মানসম্মত পণ্য (Quality of products): আমাদের দেশে 'যাকাতের কাপড়' (Zakat clothes) নামে খুব নিম্নমানের শাড়ি-লুঙ্গি দেওয়ার রেওয়াজ আছে, যা কয়েকবার ধোয়ার পরই ছিঁড়ে যায়। এটি অত্যন্ত অপছন্দনীয় কাজ। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন, "তোমরা ততক্ষণ পর্যন্ত পুণ্য লাভ করতে পারবে না, যতক্ষণ না তোমরা তোমাদের প্রিয় বস্তু থেকে ব্যয় করো" (সুরা আল-ইমরান: ৯২)। তাই এমন মানের কাপড় দেওয়া উচিত যা আপনি নিজেও পরতে পছন্দ করবেন।

৩. প্রয়োজনকে প্রাধান্য দেওয়া (Prioritizing the need): যাকাতের মূল উদ্দেশ্য হলো দরিদ্র ব্যক্তির অভাব দূর করা। যদি কোনো অভাবী ব্যক্তির কাপড়ের চেয়ে ওষুধ বা খাবারের বেশি প্রয়োজন থাকে, তবে তাকে কাপড় না দিয়ে নগদ টাকা দেওয়াটাই বেশি সওয়াবের কাজ (More rewarding)।

আরও পড়ুন:

নগদ টাকা নাকি কাপড়: কোনটি উত্তম? (Cash vs. Clothes: Which is better?)

বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে আলেমদের মতে, নগদ টাকা দিয়ে যাকাত দেওয়া বেশি উত্তম। কারণ: নগদ টাকা দিয়ে গরিব ব্যক্তি তার প্রয়োজনমতো ওষুধ কিনতে পারেন বা সন্তানের স্কুলের বেতন দিতে পারেন।

অনেক সময় একজন দরিদ্র মানুষ অনেকগুলো যাকাতের শাড়ি পান, যা তার কাজে লাগে না। ফলে তিনি বাধ্য হয়ে তা কম দামে বাজারে বিক্রি করে দেন, যা তার আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়।

যাকাত সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর (Zakat FAQs)

প্রশ্ন: শাড়ি বা লুঙ্গি দিয়ে যাকাত দিলে কি আদায় হবে?

উত্তর: হ্যাঁ, শাড়ি বা লুঙ্গি দিয়ে যাকাত দেওয়া জায়েজ (Permissible)। তবে শর্ত হলো কাপড়ের মান ভালো হতে হবে এবং এর সঠিক বাজার মূল্য (Market value) যাকাতের সমপরিমাণ হতে হবে।

প্রশ্ন: যাকাতের কাপড় (Zakat clothes) বলতে কি আলাদা কোনো নিম্নমানের কাপড় আছে?

উত্তর: ইসলামে 'যাকাতের কাপড়' নামে নিম্নমানের কোনো কাপড়ের অস্তিত্ব নেই। বরং আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন নিজের প্রিয় বা মানসম্মত বস্তু থেকে যাকাত দিতে। নিম্নমানের পাতলা কাপড় দেওয়া অপছন্দনীয়।

প্রশ্ন: নগদ টাকা নাকি কাপড়—কোনটি দিয়ে যাকাত দেওয়া বেশি সওয়াব?

উত্তর: বর্তমান যুগে নগদ টাকা (Cash money) দিয়ে যাকাত দেওয়া বেশি উত্তম। কারণ এতে অভাবী ব্যক্তি তার প্রয়োজনমতো ওষুধ, খাবার বা ঋণ পরিশোধ করতে পারেন।

প্রশ্ন: যাকাত কার ওপর ফরজ হয় (Who must pay Zakat)?

উত্তর: কোনো মুসলিমের কাছে যদি ঋণ বাদ দিয়ে সাড়ে সাত তোলা সোনা বা সাড়ে ৫২ তোলা রুপা অথবা এর সমমূল্যের নগদ টাকা/ব্যবসায়িক পণ্য এক বছর জমা থাকে, তবে তার ওপর যাকাত ফরজ।

আরও পড়ুন:

প্রশ্ন: যাকাত ক্যালকুলেটর (Zakat calculator) ব্যবহারের নিয়ম কী?

উত্তর: আপনার মোট সঞ্চয়, সোনা-রুপার মূল্য এবং ব্যবসায়িক পণ্যের মোট দাম যোগ করে তা থেকে ঋণের টাকা বিয়োগ করতে হবে। অবশিষ্ট টাকার ২.৫% (অর্থাৎ ১০০০ টাকায় ২৫ টাকা) যাকাত দিতে হবে।

প্রশ্ন: নিজের আপন ভাই বা বোনকে কি যাকাত দেওয়া যাবে?

উত্তর: হ্যাঁ, যদি ভাই বা বোন অভাবী (Nisab-eligible) হন, তবে তাদের যাকাত দেওয়া যাবে। এতে যাকাতের সওয়াব এবং আত্মীয়তার হক আদায়ের দ্বিগুণ সওয়াব পাওয়া যায়।

প্রশ্ন: মা-বাবা বা সন্তানদের কি যাকাত দেওয়া যায়?

উত্তর: না, নিজের মা-বাবা, দাদা-দাদি, নানা-নানি এবং নিজের ছেলে-মেয়ে বা নাতি-নাতনিকে যাকাত দেওয়া জায়েজ নেই। কারণ তাদের ভরণপোষণের দায়িত্ব আপনার নিজের।

প্রশ্ন: শাশুড়ি বা শ্বশুরকে কি যাকাত দেওয়া যাবে?

উত্তর: যদি শ্বশুর বা শাশুড়ি যাকাত নেওয়ার যোগ্য (দরিদ্র) হন, তবে তাদের যাকাত দেওয়া জায়েজ।

প্রশ্ন: যাকাত দেওয়ার সময় কি 'যাকাত' শব্দটি বলা জরুরি?

উত্তর: না, যাকাত দেওয়ার সময় এটি যে যাকাতের টাকা তা মুখে বলা জরুরি নয়। মনে মনে যাকাতের নিয়ত (Intention) থাকলেই আদায় হয়ে যাবে। একে 'উপহার' হিসেবেও দেওয়া যায়।

প্রশ্ন: ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির কি যাকাত দিতে হয়?

উত্তর: ঋণের টাকা বাদ দেওয়ার পর যদি আপনার কাছে নিসাব পরিমাণ সম্পদ (সাড়ে ৫২ তোলা রুপার মূল্য) থাকে, তবেই যাকাত দিতে হবে। ঋণ সম্পদের চেয়ে বেশি হলে যাকাত ফরজ নয়।

প্রশ্ন: দোকানের অবিক্রিত মাল বা স্টকের ওপর কি যাকাত আসবে?

উত্তর: হ্যাঁ, ব্যবসার উদ্দেশ্যে রাখা প্রতিটি পণ্যের বর্তমান বাজার মূল্যের (Current market price) ওপর যাকাত হিসাব করতে হবে।

প্রশ্ন: সোনা ব্যবহারের জন্য হলেও কি যাকাত দিতে হবে?

উত্তর: হ্যাঁ, গহনা ব্যবহারের হোক বা সঞ্চিত, যদি তা নিসাব পরিমাণ (সাড়ে সাত তোলা) হয়, তবে তার ওপর প্রতি বছর যাকাত দিতে হবে।

প্রশ্ন: যাকাতের টাকা দিয়ে কি মসজিদ বা মাদ্রাসা নির্মাণ করা যাবে?

উত্তর: যাকাতের টাকা সরাসরি কোনো মসজিদ নির্মাণ বা প্রতিষ্ঠানের সাধারণ কাজে ব্যয় করা যায় না। এটি ব্যক্তিকে (গরিব-মিসকিন) মালিক বানিয়ে দিতে হয়। তবে মাদ্রাসার গরিব ফান্ডে (লিল্লাহ বোর্ডিং) দেওয়া যাবে।

প্রশ্ন: যাকাত কি শুধু রমজান মাসেই দিতে হয় (Zakat in Ramadan)?

উত্তর: না, যাকাত বছরের যেকোনো সময় দেওয়া যায়। তবে রমজানে আমলের সওয়াব ৭০ গুণ বেশি হওয়ায় অধিকাংশ মানুষ এই মাসে যাকাত আদায় করেন।

প্রশ্ন: যাকাত না দিলে কী গুনাহ হয়?

উত্তর: যাকাত না দেওয়া কবিরা গুনাহ। পরকালে এর জন্য কঠিন শাস্তির কথা বলা হয়েছে। যাকাত না দিলে সম্পদ অপবিত্র হয়ে যায় এবং তাতে বরকত থাকে না।


এসআর