আরও পড়ুন:
জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির (National Moon Sighting Committee) সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, গত ২০ জানুয়ারি রজব মাসের ৩০ দিন পূর্ণ হয়েছে। এর আগে বায়তুল মোকাররমে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের (Islamic Foundation) সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত সভায় শাবান মাসের চাঁদ দেখা ও শবেবরাতের তারিখ চূড়ান্ত করা হয়। ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. কামাল উদ্দিনের সভাপতিত্বে এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
শবেবরাতের গুরুত্ব ও আমল
শাবান মাসের ১৫তম রাতে (১৪ শাবান দিবাগত রাত) পবিত্র শবেবরাত বা মহিমান্বিত রজনী পালিত হয়। ইসলাম ধর্মে গুরুত্বপূর্ণ চারটি রাতের মধ্যে এটি অন্যতম, যেখানে মহান আল্লাহ বান্দার জন্য রহমত ও দয়ার ভাণ্ডার খুলে দেন। হাদিস শরীফের মাধ্যমে এ রাতে নফল ইবাদত (Nafil Ibadat) করার বিষয়টি নির্ভরযোগ্যভাবে প্রমাণিত। বাংলাদেশে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা নফল নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত ও জিকিরের মাধ্যমে এই রাতটি অতিবাহিত করেন।
শবেবরাতে সরকারি ছুটি ও অর্থ
শবেবরাতের পরের দিন বাংলাদেশে নির্বাহী আদেশে সরকারি ছুটি (Public Holiday) থাকে। সে হিসেবে আগামী ৪ ফেব্রুয়ারি (বুধবার) সারাদেশে সরকারি ছুটি থাকবে। শবেবরাত শব্দের প্রথম অংশ ফারসি 'শব' (Shab), যার অর্থ রাত এবং দ্বিতীয় অংশ 'বরাত' (Barat), যার অর্থ মুক্তি বা নাজাত পাওয়া। অর্থাৎ এটি হলো গুনাহ থেকে মুক্তি পাওয়ার রাত।
আরও পড়ুন:
যেভাবে এলো পবিত্র শবে বরাত: মহিমান্বিত এই রজনীর ইতিহাস ও তাৎপর্য
ইসলাম ধর্মে চারটি গুরুত্বপূর্ণ ও বরকতময় রাতের মধ্যে অন্যতম হলো পবিত্র শবে বরাত (Shab-e-Barat)। ফারসি শব্দ ‘শব’ (Shab) মানে রাত এবং ‘বরাত’ (Barat) মানে মুক্তি। অর্থাৎ শবে বরাত মানে হলো মুক্তির রাত। আরবিতে একে বলা হয় ‘লাইলাতুল বরাত’ (Lailatul Barat) বা ভাগ্য রজনী। প্রতি বছর শাবান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাতে বিশ্বের কোটি কোটি মুসলিম অত্যন্ত ভাবগাম্ভীর্যের সাথে এই রাতটি পালন করেন।
শবে বরাতের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
পবিত্র শবে বরাতের চর্চা নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর যুগ থেকেই শুরু হয়েছিল। বিভিন্ন সহিহ হাদিসের (Sahih Hadith) বর্ণনা অনুযায়ী, প্রিয় নবী (সা.) শাবান মাসে সবচেয়ে বেশি নফল রোজা রাখতেন। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত এক হাদিসে পাওয়া যায়, এক রাতে তিনি নবীজিকে (সা.) বিছানায় না পেয়ে খুঁজতে বের হন এবং দেখেন তিনি জান্নাতুল বাকিতে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছেন। নবীজি (সা.) বলেন, "এই রাতে মহান আল্লাহ দুনিয়ার আকাশে নেমে আসেন এবং কালব গোত্রের ভেড়ার পশমের চেয়েও বেশি সংখ্যক মানুষকে ক্ষমা করে দেন।"
যেভাবে ধারাবাহিকতা তৈরি হলো
সাহাবায়ে কেরাম (Sahaba) ও তাবেঈনদের যুগ থেকে শুরু করে অদ্যাবধি এই রাতে বিশেষ নফল ইবাদতের (Nafil Ibadat) আমল চলে আসছে। বড় বড় ইসলামী পন্ডিত ও ইমামগণ এই রাতটিকে গুনাহ মাফের রজনী হিসেবে অভিহিত করেছেন। বিশেষ করে এশিয়াসহ ভারতীয় উপমহাদেশে শবে বরাত পালনের এক দীর্ঘ সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, যেখানে মানুষ রাতের বেলা মসজিদে বা ঘরে ইবাদত-বন্দেগির পাশাপাশি পরদিন নফল রোজা রাখেন।
ভাগ্য রজনী ও রহমত
ইসলামিক ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এই রাতে আগামী এক বছরের মানুষের রিজিক (Rizq), হায়াত ও মউত নির্ধারণ করা হয়। আল্লাহ তাআলা এই রাতে রহমতের দরজা খুলে দিয়ে বান্দাদের ক্ষমা প্রার্থনা করার আহ্বান জানান। এ কারণেই একে মুক্তির রাত (Night of Salvation) হিসেবে অভিহিত করা হয়।
আরও পড়ুন:
শবে বরাতের ইতিহাস: মহিমান্বিত রজনীতে কী করবেন আর কী বর্জন করবেন?
শাবান মাসের ১৫তম রাতে (১৪ শাবান দিবাগত রাত) পালিত হয় পবিত্র শবে বরাত (Shab-e-Barat)। এটি যেমন ইবাদত ও ক্ষমা প্রার্থনার রাত, তেমনি এই রাতকে কেন্দ্র করে সমাজে প্রচলিত রয়েছে অনেক ভুল প্রথা। শুদ্ধভাবে এই রাতটি পালনের লক্ষ্যে এর করণীয় ও বর্জনীয় বিষয়গুলো জেনে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
শবে বরাতের ঐতিহাসিক গুরুত্ব: হাদিস শরিফের বর্ণনা অনুযায়ী, নবীজি (সা.) এই রাতে মদিনার জান্নাতুল বাকি গোরস্তানে গিয়ে মৃতদের জন্য দোয়া করতেন। তিনি বলেছেন, এই রাতে মহান আল্লাহ দুনিয়ার আকাশে নেমে আসেন এবং কালব গোত্রের ভেড়ার পশমের চেয়েও বেশি মানুষকে ক্ষমা করে দেন। সাহাবা ও তাবেঈনদের যুগ থেকে এই রাতে ব্যক্তিগতভাবে নফল ইবাদত (Nafil Ibadat) করার প্রচলন রয়েছে।
আরও পড়ুন:
শবে বরাত: নির্ভরযোগ্য সহীহ, যয়ীফ ও জাল হাদীস নিয়ে বিশেষ বিশ্লেষণ
ইসলাম ধর্মে ইবাদতের ক্ষেত্রে সহীহ হাদীসের (Sahih Hadith) গুরুত্ব অপরিসীম। পবিত্র শবে বরাত বা ১৫ই শাবানের রাত নিয়ে বিভিন্ন কিতাবে অসংখ্য বর্ণনা পাওয়া যায়। তবে আধুনিক মুহাদ্দিসগণ এর মধ্য থেকে সহীহ, যয়ীফ (Weak) এবং জাল (Fabricated) বর্ণনাগুলোকে চিহ্নিত করেছেন, যা প্রত্যেক মুমিনের জানা প্রয়োজন।
১. সহীহ ও হাসান হাদীস (Sahih & Hasan Hadith): শবে বরাতের সাধারণ ফজিলত সম্পর্কে একটি হাদীসকে অনেক মুহাদ্দিস 'হাসান' বা নির্ভরযোগ্য বলেছেন। নবীজি (সা.) বলেছেন: "আল্লাহ তাআলা মধ্য-শাবানের রাতে তার সৃষ্টির প্রতি দৃষ্টিপাত করেন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারী ছাড়া সবাইকে ক্ষমা করে দেন।" (সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস নং ৫৬৬৫)। এই বর্ণনাটি এই রাতের সাধারণ ইবাদত ও ক্ষমা প্রার্থনার একটি শক্তিশালী ভিত্তি।
২. যয়ীফ বা দুর্বল হাদীস (Weak Hadith): কিছু হাদীস রয়েছে যেগুলোর বর্ণনাকারী সূত্রে দুর্বলতা রয়েছে। যেমন— আয়েশা (রা.)-এর জান্নাতুল বাকিতে নবীজিকে (সা.) পাওয়ার হাদীসটি (তিরমিজি)। এর মূল বক্তব্য সঠিক হলেও সনদ বা বর্ণনাকারী সূত্রে দুর্বলতা রয়েছে বলে ইমাম তিরমিজি নিজেই উল্লেখ করেছেন। তবে ফাজায়েলে আমলের (Virtues of Deeds) ক্ষেত্রে অনেক আলেম এসব হাদীসকে গ্রহণযোগ্য মনে করেন।
৩. জাল বা ভিত্তিহীন হাদীস (Fabricated/Maudu Hadith): সমাজে প্রচলিত অনেক জনপ্রিয় আমল আসলে জাল হাদীসের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। যেমন—
নির্দিষ্ট রাকাতের নামাজ:
"এই রাতে ১০০ রাকাত নামাজ পড়তে হবে এবং প্রতি রাকাতে নির্দিষ্ট সূরা পড়তে হবে"—এ সংক্রান্ত সব বর্ণনা বানোয়াট ও জাল।
হালুয়া-রুটির বাধ্যবাধকতা:
শবে বরাতে হালুয়া-রুটি বা বিশেষ খাবার না খেলে সওয়াব হবে না—এমন ধারণা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।
ভাগ্য পরিবর্তন:
"এই রাতে ভাগ্য বদলানো হয়"—এ সংক্রান্ত কিছু বর্ণনা থাকলেও অনেক বড় আলেম একে সূরা কদরের (লাইলাতুল কদর) সাথে সম্পর্কিত বলেছেন।
আরও পড়ুন:





