দেশে এখন

স্বপ্নের দেশ ছেড়ে বাংলাদেশে যে বিজ্ঞানী

অনেকেরই স্বপ্ন থাকে ইউরোপ কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত দেশে বসবাস করার। কিন্তু এমনও কিছু মানুষ আছেন যারা যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চাভিলাষী জীবন ছেড়ে নাড়ীর টানে বাংলাদেশে ফিরে এসেছেন। তাদের মধ্যে তেমনই একজন বিজ্ঞানী ড. মোবারক আহমদ খান। গবেষণা নিয়েই যার দিনযাপন।

ছোটবেলা থেকেই বিজ্ঞানের খুঁটিনাটি বিষয়ে জানার আগ্রহ থাকে। পড়তে শেখার পর তা আরও বাড়ে। পাঠ্যবইয়ের বিজ্ঞান বিষয়ের প্রতি যেন আলাদা টান তৈরি হয়। এভাবেই বিজ্ঞান, গবেষণা এবং তার প্রয়োগে হাতেখড়ি হয় বিজ্ঞানী মোবারক আহমদ খানের।

১৯৫৮ সালের ৩১ জানুয়ারি জন্ম নেন মানিকগঞ্জের ডাউলি গ্রামে। গ্রাজুয়েশন শেষ করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগ থেকে।

তিনি বলেন, 'নবম শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার সময়ে বিজ্ঞান নিয়ে নেই। তখন এসএসসি, এইচএসসি বিজ্ঞানের চর্চায় দেই। পরে জাহাঙ্গীরনগরে রসায়নে ভর্তি হই। পড়ালেখা শেষ করে দেখলাম পরমাণু শক্তি কমিশন বিজ্ঞান গবেষণার সবচেয়ে বড় জায়গা। সে হিসেবে আমি সেখানে যোগ দেই।'

১৯৮৪ সালে তিনি যোগ দেন পরমাণু শক্তি কমিশনে। এরপর প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে কাঠ ও পাটের মিশেলে নতুন কম্পোজিট তৈরি করলেন, যা গুণে ও মানে অনেক উন্নত। যদিও সবারই প্রশ্ন থাকে, পরমাণু কমিশনে পাটের গবেষণা কেন?

মোবারক আহমদ খান বলেন, 'অনেকেরই এ প্রশ্ন ছিল। কিন্তু ভেতরের কাহিনী ছিল আমি অ্যাটমিক শক্তি ব্যবহার করেই পাটকে ব্যবহার করছি।'

উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের বিমানের ভেতরকার দেয়ালের উপাদান তৈরিতে কাজ করতে গিয়ে একদিন তার মনে হয়, আমি এখানে কী করছি! আমেরিকার মতো দেশের সর্বোচ্চ সুযোগ-সুবিধা ছেড়ে মাত্র ১১ দিনের সিদ্ধান্তে দেশে ফেরেন।

তিনি জানালেন, এর আগে কাজ করেছেন মার্সিডিজ, ভলভোর মতো বিখ্যাত গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানে। বানিয়েছেন গাড়ি, বড় বড় পরীক্ষা-নিরীক্ষায়ও কাজ করেছেন। এসব গবেষণার কাজে তার মূল অনুষঙ্গ ছিল পাট। যদিও ইউরোপে তার সেসময়কার গবেষণার ফল আলোর মুখ দেখেনি। তবে তার স্বপ্ন শেষ হয়নি, দেশে ফিরে পাটের গাড়ি তৈরির স্বপ্ন দেখেন।

মোবারক আহমদ বলেন, 'প্লেনের ভেতরের যে ফেন্সিং থাকে, সেটা গ্লাস ফাইবারের তৈরি থাকে। আমার মোটিভ ছিল সেটার পরিবর্তে পাট ব্যবহার করা। সে হিসেবে আমি কাজ শুরু করি, এবং একসময় সফল হই। কিন্তু তখন আমার মনে হলো যে পাট আমার দেশের জিনিস, আমি বাংলাদেশের, এখানে আমার ব্রেন বিক্রি করা ঠিক হবে না।'

তিনি বলেন, 'ভলভো, মার্সিডিসের সাথে অনেকদিন কাজ করেছি। সেখানে একটার পর একটা পরীক্ষা দেই। গন্ধমুক্ত করা, আগুন লাগলে পুরে যাওয়ার চ্যালেঞ্জ থাকে। কিন্তু আমার তো বাংলাদেশে একটা স্থায়ী ঠিকানা আছে। চাকরির সুবাদে দেশে ফেরত আসতে হয়, কাজটা চালিয়ে যেতে পারিনি।'

বিজ্ঞানী মোবারক আহমদ খান। ছবি: সংগ্রহীত

পরবর্তীতে ২০০২ সালে সরকার পলিথিনের ব্যাগ নিষিদ্ধ করে। সে সময় তিনি বলেছিলেন, বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়া এই প্রয়াস সফল হবে না।

মোবারক আহমদ বলেন, 'দিকনির্দেশনা কিছু না থাকা স্বত্বেও এটা বন্ধ করে দেয়। সেখানে আমি বলেছিলাম এটা না করা ভালো, কারণ আমাদের কোনো ভালো অলটারনেটিভ নেই। পরে আমি ভাবলাম এটার নতুন কিছু করা যায় কি না। পরে পাট থেকে পলিথিনের মতো দেখতে একটা ব্যাগ আবিষ্কার করি ২০১৬ সালের মাঝামাঝিতে।'

২০০৮ সালে মোবারক আহমদ খান আবিষ্কার করেন পাট থেকে ঢেউটিন। নাম দেন জুটিন। তার এই প্রযুক্তি এখন অ্যাপ্লাইড বায়োপ্লাস্টিক নামে রোহিঙ্গাদের বাড়ি বানানোর কাজে ব্যবহার হচ্ছে।

২০১৬ সালে এই বিজ্ঞানী প্রথমে পাট থেকে ব্যাগ তৈরি করলেন। পানিতে যার কোনো ক্ষতিকর উপাদান নেই, সহজেই মেশে মাটিতে। এমনকি খেয়েও ফেলা যাবে এটি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই পণ্যটি পছন্দ করেন, নাম দেন 'সোনালি ব্যাগ'

বিজ্ঞানী বলেন, 'সোনালি ব্যাগটি যখন সুন্দর করে বানিয়ে ব্যাগ আকারে রূপ দিতে পারলাম, তখন প্রধানমন্ত্রী এটার নামকরণ করেন। এর ভেতর কোনো প্লাস্টিক নেই। এটা থেকে কোনো ক্ষতি হবে না। মাটিতে গেলে সার হয়, পানিতে গেলে মাছের খাবার হয়।'

এই প্রযুক্তি দিয়েই এখন ডেমরার লতিফ বাওয়ানী জুট মিলে পাট থেকে প্লাস্টিক ব্যাগের উৎপাদন হয়। এমনকি ব্যবহারবিধি ও দেশভেদে আলাদাভাবেই তৈরি করা হচ্ছে বলেই জানালেন তিনি। যদিও দাম একটু বেশি, তবে পলিথিন বর্জ্য অপসারণের খরচের তুলনায় কম।

মোবারক আহমদ বলেন, '৮ ঘণ্টা পর্যন্ত পানিতে কিছ হবে না। শপিংয়ের জন্য এই ব্যাগ ধরে রাখি ৮ ঘণ্টা। শুকনা জিনিস থেকে তো পানি লাগার কিছু নেই। এটা যেহেতু কাস্টমাইজ প্রোডাক্ট, সেহেতু যে যেভাবে চাবে সেভাবে বানিয়ে দেয়া যাবে। সব দেশের পরিবেশ জলবায়ু তো এক না। যুক্তরাষ্ট্রের আবহাওয়া ভিন্ন হওয়ায় তার জন্য আলাদা করে বানাতে হয়।'

পাটের পলিথিন প্রকল্পে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ছবি: সংগ্রহীত

সম্প্রতি পাটের পলিথিন প্রকল্পে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ পেয়েছেন এই বিজ্ঞানী। ২ থেকে ৩ বছরের মধ্যে সোনালি ব্যাগের ভবিষ্যতও জুটিনের মতো হবে বলে আশঙ্কা তার। পৃষ্ঠপোষকতা পেলে প্রযুক্তি নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেন বলে জানান তিনি।

পাট নিয়ে এই বিজ্ঞানীর স্বপ্ন আকাশচুম্বী। মাত্র ২০০ টাকার পাট থেকে লক্ষাধিক টাকা আয় করা সম্ভব, কীভাবে সম্ভব সে গল্পও বললেন।

বিজ্ঞানী মোবারক আহমদ বলেন, 'পাটে সেলুলোজ নামে ক্রিস্টাল আছে, ৩ কেজি পাট থেকে এক কেজি ন্যানো ক্রিস্টাল তৈরি করা যায়। যার দাম বাজারমূল্য ১ লাখ টাকা।'

তিনি বলেন, 'আমার একটা স্লোগান আছে; প্লাস্টিক পলিউশন, সোনালি ব্যাগ ইজ সলিউশন।'

আবারও ফিরিয়ে আনতে চান সোনালি আঁশ পাটের হারানো অতীত। আর সেজন্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় পাট ও পাটের গুরুত্ব তুলে ধরার আহ্বান জানান মোবারক আহমদ খান।

এমএসআরএস

এই সম্পর্কিত অন্যান্য খবর