৩১ বছরে হস্তান্তর হয়েছে ২১ হাজার প্লট নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে মাত্র তিন শতাধিক প্লটের। রাজধানীর ওপর জনসংখ্যার বাড়তি চাপ কমাতে এবং একটি আধুনিক, পরিকল্পিত নগরীর লক্ষ্যে ৬ হাজার ১৫০ একর জমির উপর ১৯৯৫ সালে কাজ শুরু হয় পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের। প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্প শেষ হওয়ার কথা ছিলো ২০১৩ সালে। কিন্তু এখনো এই প্রকল্পের কাজ করতে পারেনি রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)।
এক প্লট মালিক জহিরুল ইসলাম জানান, ২০০৯ সালে পূর্বাচলে প্লট বরাদ্দ পেলেও কাজ শুরু করেন ২০২৫ সালে। নাগরিক সুবিধা না থাকায় আগ্রহ পাননি বাড়ি নির্মাণের। তার কাছে প্রশ্ন ছিলো— এখন কি তবে নাগরিক সুবিধা মিলেছে?
এই প্লট মালিক বলেন, ‘নাগরিক যে সুবিধাগুলো থাকার কথা ছিলো, রাজউক যেগুলোর কথা বলেছিলো, যেমন- শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সড়ক বাতি, নিরাপত্তা—এগুলোর অভাবে আমি শুরু করতে পারিনি। আমাদের প্ল্যান পাশ করানোর সময় মেয়াদ দেয়া ছিলো ৩ বছর। তো আমি এখন বাধ্য হয়েই এসব সুবিধা ছাড়া শুরু করে দিয়েছি।’
আরেকজন প্লট মালিক শাহজাহান মিয়াও জানালেন তার কথা। ২০১৪ সালে প্লট বরাদ্দ পেয়েও এখনো পড়ে আছে তার জায়গা। স্কুল, কলেজ আর বসবাসের জন্য প্রয়োজনীয় সুবিধা না থাকায় বাড়ি নির্মাণ করছেন না তিনি।
তিনি বলেন, ‘রাজউকের জটিলতার কারণে প্রক্রিয়া দীর্ঘ হচ্ছে। নাগরিক সুবিধা আমরা পাচ্ছি না, যেমন- পানি, বিদ্যুৎ আছে কিন্তু সড়ক বাতি নেই, নিরাপত্তা নেই।’
আরও পড়ুন:
পরিকল্পনা অনুযায়ী পূর্বাচলের ৩০টি সেক্টরের আবাসিক প্লটের বেশির ভাগেরই নেই সীমানা প্রাচীর। অব্যবহৃত জায়গাগুলো কাজে লাগিয়ে অনেক মালিক বা স্থানীয় কৃষকদের দেখা যায় চাষাবাদ আর গরু ছাগল লালন-পালন করতে। এছাড়া সড়কবাতি না থাকা, বহিরাগতদের অবাধ চলাচল, তিন জেলার সীমানা বিরোধ এবং রাজউকের অভ্যন্তরীণ আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় মালিকরা প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
মালিকরা জানান, এখানে গ্যাস, বাজার, যানবাহনের সমস্যা আছে। নেই কোনো স্কুল-কলেজ, তবে কর্তৃপক্ষের এ নিয়ে কোনো খোঁজ নেই বলে অভিযোগ তাদের। পূর্বাচলে এসে নতুন পরিবেশের বদলে গ্রাম্য পরিবেশে থাকার মতো অবস্থা তৈরি হয়েছে বলেও দাবি করেন তারা।
তবে সম্প্রতি নিকারের বৈঠকে পূর্বাচলকে নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর জেলার আওতা থেকে ঢাকা উত্তর সিটির আওতাভুক্ত করা হয়েছে। এতে পড়ে থাকা খালি প্লটে বাড়ি নির্মাণে অচলাবস্থা কেটে যাবার পথ কি তৈরি হলো?
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক জানান, এরই মধ্যে নাগরিক সুবিধা নিশ্চিতে রাজউকের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রাথমিক রূপরেখা ও প্রস্তুতি শুরু করেছে তারা।
ডিএনসিসি প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান বলেন, ‘আমরা রাজউকসহ বসে একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে অপারেশনে চলে যাবো। সেখানে আমাদের প্রশাসনিক ভবন থাকবে, জোনাল অফিস থাকবে। যখন কাজগুলো শুরু হয়ে যাবে, তখন সেখানে প্লট মালিকরা যারা আছেন, তারা নিজ উদ্যোগেই দেখবেন সেখানে কাজ শুরু করে দেবেন। হয়তো তারা রাজউকের কাছে আবেদন করে একটা সময়সীমা নির্ধারণ করতে পারে।’
প্রশাসনিক জটিলতা দূর করতে এবং পূর্বাচল নতুন শহরকে বাসযোগ্য করতেই নতুন প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে বলে জানান রাজউকের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম। তবে কবে থেকে এই প্রকল্প শুরু হবে— সে প্রশ্ন এড়িয়ে গেলেও প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
আরও পড়ুন:
রাজউক চেয়ারম্যান বলেন, ‘এটাকে যাতে অতি দ্রুত বাসযোগ্য করা যায়, শুধু এটা নয়, আমরা আরও কিছু কাজ হাতে নিয়েছি, বিভিন্ন প্লট মালিক বা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আমরা মতবিনিময় করছি যে, তারা কেন যাচ্ছেন না। তারা যেটা চায় এবং তাদের ফাইলগুলো যাতে দ্রুত নিষ্পত্তি হয়, সেই ব্যাপারে সিরিয়াস ইন্সট্রাকশন দেয়া হয়েছে।’
তবে নগর পরিকল্পনাবিদরা মনে করেন, কাগজে-কলমে সীমানা বদল হলেও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতায় বিকেন্দ্রীকরণের মূল উদ্দেশ্যটি এখানে পুরোপুরি বিফল হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে।
নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘এটা সরকারের যে বিকেন্দ্রীকরণ ধারণা, আমরা সম্পূর্ণ তার বিপরীত পথে হাঁটছি। ঢাকা আরও বড় হচ্ছে, ঢাকার প্রভাব আরও বড় হবে, ঢাকামুখিতা আরও বাড়বে। এটাকে আলাদা সিটি করপোরেশন বা নারায়ণগঞ্জের সঙ্গেও যদি নেয়া হতো, তাহলে ঢাকামুখিতা কমে যেতো।’
সঠিক পরিকল্পনা, উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ এবং আইনের শাসন নিশ্চিত হলেই পূর্বাচল বাসযোগ্য নগর হিসেবে গড়ে উঠবে বলে মত তাদের।
নারায়ণগঞ্জ এবং গাজীপুরের প্রশাসনিক জটলা থেকে মুক্ত হয়ে পূর্বাচল এখন পুরোপুরি ঢাকার অংশ। যে পূর্বাচলকে ঘিরে নাগরিকরা একটি আধুনিক স্বপ্নের নগরি প্রত্যাশা করেছিলেন, তিন দশক ধরে তা আটকে ছিলো তিন জেলার প্রশাসনিক গোলকধাঁধায়। তবে ঢাকা সীমানার সাথে যুক্ত হয়ে সেই জটলা এখন কেটেছে। এখন মূল চ্যালেঞ্জ, রাজউকের কাগজে-কলমে মাস্টারপ্ল্যান ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মধ্যে নাগরিক সেবার সমন্বয় কতটা দ্রুত বাস্তবায়িত হয়। পানি, গ্যাস আর নিরাপত্তার মতো মৌলিক চাহিদাগুলো যদি আগামী দিনগুলোতে নিশ্চিত করা না যায়, তবে এই নতুন শহর পুরোটাই শুধু প্লটের এক মরুভূমি হয়েই থেকে যাবে না তো?





