কাজের প্রতিশ্রুতি, গন্তব্য যুদ্ধক্ষেত্র—প্রতারণার শিকার ৩০ বাংলাদেশি

রাশিয়ায় নিখোঁজ বাংলাদেশিরা
রাশিয়ায় নিখোঁজ বাংলাদেশিরা | ছবি: এখন টিভি
0

শ্রমিক ভিসায় নিয়ে ঠেলে দেয়া হয়েছে যুদ্ধের ময়দানে। সম্প্রতি রাশিয়ায় যাওয়া ৩০ কর্মীর কেউ মারা গেছেন যুদ্ধে, কেউবা নিখোঁজ। পরিবারের দাবি, এ কর্মীদের ভিসা ইস্যুর আগেই নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ঘুরে দেখে ভিসার সত্যায়ন দিয়েছিল রাশিয়ার বাংলাদেশ দূতাবাস। পরে বিএমইটির প্রশিক্ষণ নিয়ে বৈধভাবে কর্মীরা দেশটিতে গিয়েছেন। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুঁশিয়ারি দিলেন, প্রতারক রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার। জানালেন, চলছে কূটনৈতিক আলোচনা।

রাশিয়ায় যুদ্ধে ছেলে মারা গেছে- এমন গুঞ্জনে চাঁদপুর থেকে ঢাকায় এসে ঠাঁই নিয়েছেন স্বপন পাটোয়ারী। মাত্র একমাস আগেই ছেলে আরিফ পাটোয়ারীকে ধারদেনা করে পাঠিয়েছিলেন দেশটিতে। নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠান সাধারণ শ্রমিকের কাজ দেয়ার কথা বললেও তাকে পাঠানো হয় যুদ্ধে। এখন জীবিত কিংবা মৃত ছেলেকে দেশে ফেরাতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরছেন এ হতভাগা পিতা।

স্বপন পাটোয়ারী বলেন, ‘ছেলে কিছুদিন আগে রাশিয়া গিয়েছে কাজের জন্য। এরপর সেখান থেকে সেনাবাহিনী ফোন দিয়ে বলেছে আরিফ হোসেন নামে একজন মারা গিয়েছে। আসলে আমরা এখনও জানি না সে মারা গিয়েছে কিনা।’

নারায়ণগঞ্জে ভাড়া বাসায় থাকতেন রবিন মিয়া ও রেজাউল করিম। তারাও শ্রমিক ভিসা নিয়ে রাশিয়ায় গেছেন। এক মাস না পেরুতেই পরিবার জানতে পারে তাদেরও জোরপূর্বক যুদ্ধে পাঠানো হচ্ছে। এরপর গত একমাস আর পরিবারের সঙ্গে তাদের কোনো যোগাযোগ নেই।

পরিবারের একজন বলেন, ‘একমাস আগে তাদের সঙ্গে কথা হয়েছিল। তখন তারা জানান তাদেরকে জোর করে যুদ্ধে পাঠানো হচ্ছে। আর এ ও বলেন যদি বেচে থাকে তাহলে তাদের সঙ্গে দেখা হবে। এখন জানি না তারা জীবিত আছে কিনা।’

গত মে মাসে আরিফ, রবিন, রেজাউলের মতো ৩০ জন যুবককে একই ফ্লাইটে সাধারণ শ্রমিকের কাজের ভিসায় রাশিয়া পাঠায় ঢাকার তিনটি রিক্রুটিং এজেন্সি। বিনিময়ে নেয়া হয় ৭ থেকে ৮ লাখ টাকা। দেশটিতে পৌঁছানোর পর তাদের মোবাইল ও পাসপোর্ট কেড়ে নিয়ে দেয়া হয় যুদ্ধের প্রশিক্ষণ। সম্মুখ যুদ্ধে পাঠানোর পর থেকে এদের অধিকাংশই নিখোঁজ রয়েছেন। চোখের সামনে অনিশ্চিত গন্তব্য দেখে কেউ কেউ পরিবারের কাছে দেশে ফিরিয়ে আনার আকুতি জানিয়েছেন। যুদ্ধাহতরা জানাচ্ছেন সহযাত্রীর মৃত্যুর সংবাদ। কেউবা পাঠাচ্ছেন ভিডিও বার্তা।

রাশিয়ার যুদ্ধে যাওয়া আরমান আলী বলেন, ‘আমাদেরকে বাঙ্কারের মধ্যে বন্দি করে রাখা হয়েছে। যুদ্ধে না যাওয়ার কারণে আমাদেরকে খাবার দেয়নি তারা।’

স্বজনদের দাবি, ভিসা ইস্যুর আগেই নিয়োগদাতা ওই প্রতিষ্ঠান ঘুরে দেখেছে রাশিয়ায় থাকা বাংলাদেশ দূতাবাস। দূতাবাসের সত্যায়ন অনুযায়ী জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো এক মাসের প্রশিক্ষণসহ দিয়েছে বিএমইটি কার্ড। দেশে প্রশিক্ষণ চলাকালে ওই প্রতিষ্ঠানের একজন প্রতিনিধিও ঢাকায় ছিলেন। এতসব যাচাইবাছাইয়ের পরও কেন ত্রিশজন কর্মীকে মরণ ফাঁদে ঠেলে দেয়া হলো- এ প্রশ্নই স্বজনদের। স্বজনরা জানান, এখানে সবাই প্রাতারণার শিখার হয়েছে।

কর্মীদের সঙ্গে এ প্রতারণা দুঃখজনক উল্লেখ করে এসব চক্রকে রোধ করার হুঁশিয়ারি দেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। জানান, যারা মারা গেছে তাদের ফিরিয়ে আনা কঠিন। তবে সংশ্লিষ্ট দেশের সঙ্গে এ বিষয়ে কূটনৈতিক আলোচনা চলমান রয়েছে।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেন, রাজনৈতিক আলোচনা চলমান রয়েছে। আমরা যারা ওখানে মৃত্যুবরণ করেছে তাদের তাদের ডেড বডি ফেরত আনার জন্য চেষ্টা করছি। কিন্তু সেটা হয়তো অনেক কঠিন হবে। যারা আসতে চাচ্ছেন তাদের রাশিয়ান সরকারের সঙ্গে আমরা কথা বলছি। আমাদের ওখানে মিশন কথা বলছে। আমরা চেষ্টা করছি, কিন্তু এটা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার।

ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় তিনটি রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল করলেও রাশিয়ায় কর্মী পাঠানো থেমে নেই। পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছর দেশটিতে পাঠানো হয়েছে ২ হাজারের বেশি কর্মী। কিন্তু এ ৩০ কর্মীর সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনায় বাকিদের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন নতুন করে যেতে আগ্রহীরাও।

জেআর