স্বাধীনতার পর কোন সরকারপ্রধানের প্রথম বিদেশ সফর কোথায়?

স্বাধীনতার পর থেকে যারা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন
স্বাধীনতার পর থেকে যারা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন | ছবি: এখন টিভি
0

বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইটে মালয়েশিয়া ও চীন সফরের উদ্দেশে আজ (রোববার, ২১ জুন) ঢাকা ছেড়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের প্রথম এই বিদেশ সফরে সঙ্গী হয়েছেন ২৫ সদস্যের প্রতিনিধিদল।

একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির প্রথম এবং অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো সরকারপ্রধানদের প্রথম বিদেশ সফর। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটেছে, এসেছেন নতুন নতুন সরকারপ্রধান। রাজনৈতিক আদর্শ, ভূ-রাজনীতি এবং সমসাময়িক বাস্তবতার ওপর ভিত্তি করে একেক সরকারপ্রধান বেছে নিয়েছেন একেকটি দেশ। স্বাধীনতার পর থেকে অন্তর্বর্তী সরকার পর্যন্ত বাংলাদেশের কোন সরকারপ্রধান প্রথম কোথায় সফর করেছিলেন, তা নিয়ে একটি বিশেষ খতিয়ান নিচে তুলে ধরা হলো।

শেখ মুজিবুর রহমান (ভারত, ১৯৭২)

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি প্রথম আনুষ্ঠানিক বিদেশ সফরে ভারতে যান শেখ মুজিবুর রহমান। মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সহযোগিতা এবং তৎকালীন ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনা করলে এই সফরটি ছিল ‘অবধারিত’।

মূল অর্জন: সেই সফরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক বৈঠক হয়। বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১ মার্চ ভারত বাংলাদেশ থেকে সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয় এবং ১৫ মার্চের মধ্যে তা সম্পন্ন হয়।

উল্লেখ্য, ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হওয়ার পর ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের গতিপথ অনেকটাই বদলে যায়।

জিয়াউর রহমান (চীন, যুক্তরাজ্য ও মিয়ানমার)

জিয়াউর রহমান ১৯৭৬ সালের ২৯ নভেম্বর প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব নেয়ার পর ১৯৭৭ সালের ২ থেকে ৫ জানুয়ারি চীন সফর করেন। এটিই ছিল তার প্রথম পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রীয় সফর।

পরবর্তীতে জিয়াউর রহমান বিভিন্ন দায়িত্বে থেকে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ সফর করেন।

যুক্তরাজ্য (১৯৭৭): ২১ এপ্রিল রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেয়ার পর ওই বছরের ৮ থেকে ১৫ জুন কমনওয়েলথ সরকারপ্রধানদের সম্মেলনে যোগ দিতে তিনি যুক্তরাজ্য সফর করেন। বহুপক্ষীয় আন্তর্জাতিক ফোরামে রাষ্ট্রপতি হিসেবে এটিই ছিল তার প্রথম সফর।

মিয়ানমার (১৯৭৭): ১৯৭৭ সালের ২০ জুলাই তিনি মিয়ানমার যান। আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব নেয়ার পর এটিই ছিল তার প্রথম দ্বিপক্ষীয় রাষ্ট্রীয় সফর।

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ (সৌদি আরব ও মরক্কো)

সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা নেয়ার পর হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের প্রথম বিদেশ সফর ছিল সৌদি আরবে। ১৯৮২ সালের ২ মে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে তিনি এই সফর করেন। এর পরপরই ওই বছরের অক্টোবরে তিনি ভারত সফর করেছিলেন।

রাষ্ট্রপতি হিসেবে প্রথম সফর: ১৯৮৩ সালের ১১ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর এরশাদের প্রথম বিদেশ সফর ছিল মরক্কোতে। তিনি ১৯৮৪ সালের ১৬ জানুয়ারি কাসাব্লাঙ্কায় ওআইসির চতুর্থ শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দেন।

খালেদা জিয়া (ভারত ও সৌদি আরব)

নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে এরশাদ সরকারের পতনের পর ১৯৯১ সালের মার্চে ক্ষমতায় আসেন জিয়াউর রহমানের স্ত্রী খালেদা জিয়া।

প্রথম মেয়াদ (১৯৯১): ১৯৯১ সালের ২১ মে ভারতের তৎকালীন সাবেক প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী নিহত হলে তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় যোগ দিতে সংক্ষিপ্ত সফরে নয়াদিল্লি যান খালেদা জিয়া। সরকারপ্রধান হিসেবে এটিই ছিল তার প্রথম বিদেশ সফর। এর পরপরই, ২৫ মে আনুষ্ঠানিক ও পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রীয় সফরে তিনি সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে পৌঁছান এবং পরবর্তীতে কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাত যান। (এই সফরের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ২৯ এপ্রিলের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ের পর বিদেশি সাহায্য সংগ্রহ করা)।

দ্বিতীয় মেয়াদ (২০০১): ২০০১ সালের অক্টোবরে পুনরায় ক্ষমতায় ফেরার পর তার প্রথম বিদেশ সফর ছিল সৌদি আরবে। সেখানে ওমরাহ পালনের পাশাপাশি তৎকালীন সৌদি বাদশাহ ফাহাদ বিন আবদুল আজিজের সঙ্গে তিনি দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন।

শেখ হাসিনা (সৌদি আরব, চীন ও জাপান)

১৯৯৬ সালের জুনে প্রথমবার ক্ষমতায় আসেন শেখ মুজিবুর রহমানের মেয়ে শেখ হাসিনা। এরপর বিভিন্ন মেয়াদে তার প্রথম সফরগুলো ছিল নিম্নরূপ:

প্রথম মেয়াদ (১৯৯৬): ১৯৯৬ সালের জুলাই মাসে ওমরাহ করতে তিনি সৌদি আরবে যান। সরকারপ্রধান হিসেবে সেটিই ছিল তার প্রথম বিদেশ সফর। এরপর ১২ সেপ্টেম্বর প্রথম দ্বিপক্ষীয় রাষ্ট্রীয় সফরে তিনি চীনে যান এবং ডিসেম্বরে ভারত সফর করেন।

দ্বিতীয় মেয়াদ (২০০৯): ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে ক্ষমতায় ফেরার পর এপ্রিলে প্রথম বিদেশ সফরে তিনি সৌদি আরবে যান এবং ওমরাহ করার পাশাপাশি বাদশাহ আবদুল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।

তৃতীয় মেয়াদ (২০১৪): ২০১৪ সালে তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর ২৫-২৮ মে জাপান সফর করেন শেখ হাসিনা।

চতুর্থ মেয়াদ (২০১৯): ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে তার প্রথম সফর ছিল জার্মানি ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে।

পঞ্চম মেয়াদ (২০২৪): ২০২৪ সালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পঞ্চম মেয়াদেও শেখ হাসিনার প্রথম বিদেশ সফর ছিল জার্মানিতে।

ড. ফখরুদ্দীন আহমদ (যুক্তরাষ্ট্র, ২০০৭)

২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেনের পটপরিবর্তনের পর গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ফখরুদ্দীন আহমদ তার প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রকে বেছে নিয়েছিলেন।

২০০৭ সালের জানুয়ারি মাসে দায়িত্ব নেয়ার পর, ওই বছরের সেপ্টেম্বর মাসে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৬২তম অধিবেশনে যোগ দিতে তিনি নিউ ইয়র্ক সফরে যান এবং সাধারণ পরিষদে বাংলায় ভাষণ দেন।

ওই সফরকালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশসহ বিশ্বনেতাদের সঙ্গে তার দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হয়েছিল এবং পরবর্তীতে তিনি ওআইসি শীর্ষ সম্মেলনসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে যোগ দিতে সৌদি আরব ও কুয়েত সফর করেন।

মুহাম্মদ ইউনূস (যুক্তরাষ্ট্র, ২০২৪)

২০২৪ সালের আগস্টে তীব্র গণঅভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতন হলে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক তলানিতে পৌঁছায়। এরপর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস।

প্রথম সফর: দায়িত্ব নেয়ার পর ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের শেষে তিনি নিউ ইয়র্কে যান জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগ দিতে। প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে এটিই ছিল তার প্রথম সরকারি বিদেশ সফর।

পরবর্তী সফর: ক্ষমতায় থাকার দেড় বছরে তিনি অন্তত ১৪ বার বিদেশ সফরে যান। এর মধ্যে ২০২৫ সালের মার্চে তিনি চীন সফর করেন। তবে এই দীর্ঘ সময়ে প্রতিবেশী দেশ ভারতে তার আর যাওয়া হয়নি।

এনএইচ