বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর প্রশাসনে রদবদলের ধারাবাহিকতায় গত ২৪ ফেব্রুয়ারি তাকে পুলিশের মহাপরিদর্শক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। সংবাদ সম্মেলনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, অপরাধ দমন এবং পুলিশের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেন তিনি। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নেরও উত্তর দেন।
আরও পড়ুন:
‘রাতারাতি বিচার সম্ভব নয়’
আইজিপি বলেন, ‘কোনো অপরাধ ঘটলেই তাৎক্ষণিক ফলাফল চাওয়ার প্রবণতা এখন অনেক বেড়ে গেছে। অনেক সময় সংবাদমাধ্যম এমনভাবে প্রশ্ন তোলে, যেন সঙ্গে সঙ্গেই ঘটনার বিচার শেষ করে ফেলতে হবে। কিন্তু বাস্তবে অনেক হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে ২০ থেকে ২৫ বছর পর্যন্ত সময়ও লেগে যায়।’
তার ভাষ্য, ‘অতিরিক্ত চাপের কারণে অনেক সময় তদন্তকারীরা তড়িঘড়ি করে স্বীকারোক্তি আদায়ের দিকে ঝুঁকে পড়ে। আপনারা এমনভাবে চাপ দেবেন না যাতে পুলিশের ওপর মানসিক চাপ তৈরি হয় এবং তাড়াহুড়া করে যাকে পাওয়া যায়, তাকেই স্বীকারোক্তি দিতে বাধ্য করা হয়। এর উদাহরণ আমরা জজ মিয়া নাটকে দেখেছি।’
২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ঢাকায় তৎকালীন বিরোধী নেত্রী শেখ হাসিনার সমাবেশে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার ঘটনায় পুলিশ জজ মিয়া নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছিল। তাকে ১৭ দিন রিমান্ডে রেখে ভয়ভীতি ও প্রলোভন দেখিয়ে সাজানো স্বীকারোক্তি আদায়ের অভিযোগ ওঠে। পরে তদন্তে দেখা যায়, তিনি মূল ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। তখন অভিযোগ ওঠে, প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করতেই ‘জজ মিয়া নাটক’ সাজানো হয়েছিল।
ভারত থেকে আসামি ফেরানোর চেষ্টা
সংবাদ সম্মেলনের শুরুতেই ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ওসমান হাদি হত্যার প্রধান আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ ও সহযোগী আলমগীর হোসেনকে ভারত থেকে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে জানতে চান সাংবাদিকরা। শনিবার রাতে পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগণা জেলার বনগাঁ এলাকা থেকে তাদের গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে সেখানকার পুলিশ।
এ বিষয়ে আইজিপি বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ চলছে। মিনিস্ট্রি থেকে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে। তারা এ বিষয়ে কার্যক্রম গ্রহণ করছে। আশা করছি খুব শিগগিরই আমরা তাদের বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হবো।’
আরও পড়ুন:
চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ঘোষিত চাঁদাবাজ ও চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযানের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে আইজিপি বলেন, ‘বিভিন্ন সংস্থা থেকে পাওয়া তালিকা যাচাই করে দ্রুত অভিযান শুরু করা হবে।’
তার ভাষ্য, ‘আমরা বিভিন্ন সংস্থা থেকে তালিকা পেয়েছি। সেগুলো মিলিয়ে যেসব নাম একাধিক তালিকায় রয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে অচিরেই অভিযান চালানো হবে।’
‘অতি উৎসাহী ভূমিকা নেবে না পুলিশ’
সম্প্রতি ৭ মার্চের ভাষণ বাজানোর ঘটনায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে তিনজনকে গ্রেপ্তারের প্রসঙ্গও ওঠে সংবাদ সম্মেলনে। এ বিষয়ে আইজিপি বলেন, ‘পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো অতি উৎসাহী ভূমিকা নেয়া হবে না।’
তিনি বলেন, ‘একটা বিষয় আশ্বস্ত করতে চাই, পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো অতি উৎসাহী ভূমিকা পালন করা হবে না। তবে নাগরিকদের আইন মানতে হবে, আইন নিজের হাতে তুলে নেয়া যাবে না। তা না হলে দেশ অকার্যকর হয়ে পড়বে।’
একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘নিষিদ্ধ কোনো সংগঠনের সদস্যরা যদি বিভিন্ন অজুহাতে রাস্তায় নেমে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটায় বা সন্ত্রাস উসকে দেয়, তা কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না।’
মব সন্ত্রাস ও কিশোর গ্যাং নিয়ে উদ্বেগ
দেশে মব সন্ত্রাস নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আইজিপি বলেন, ‘বেকারত্বের কারণে অনেক সময় যে কোনো কর্মসূচিতে সহজেই লোক জড়ো হয়ে যায়। কিশোর গ্যাং এবং মাদক সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাই এসব ঘটনার সঙ্গে বেশি জড়িত থাকে।’
তিনি বলেন, ‘অনেকে ফায়দা লোটার জন্য মব তৈরি করে লুটপাট বা অপকর্ম করে। আমরা যারা মূল মব তৈরিকারী, তাদের তালিকা তৈরি করছি। তারা যত ক্ষমতাবানই হোক, আইনের আওতায় আনা হবে।’
থানায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দেয়ার প্রস্তাব
দেশে আইন মানা নাগরিকের সংখ্যা কমে যাওয়াকেই বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন আইজিপি। তিনি বলেন, ‘যেকোনো ঘটনা ঘটলেই মানুষ রাতারাতি বিচার চায়, যা সব ক্ষেত্রে সম্ভব নয়।’
স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত সমস্যা সমাধানের জন্য থানায় একজন করে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দেয়ার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। এতে জমি ও অর্থ সংক্রান্ত বিরোধসহ বিভিন্ন ছোটখাটো সমস্যার দ্রুত সমাধান সম্ভব হবে বলে মনে করেন পুলিশপ্রধান।
আরও পড়ুন:
‘সৎ কর্মকর্তারাই মূল্যায়িত হবেন’
পুলিশের বদলি ও পদায়নের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে আইজিপি বলেন, ‘সৎ, দক্ষ ও যোগ্য কর্মকর্তারা অবশ্যই মূল্যায়িত হবেন।’
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ পুলিশের প্রায় দুই লাখ ১৫ হাজার সদস্য একটি পরিবারের মতো। যদি কেউ অসৎ হয়, সে বিদায় নেবে। আর যারা সৎ, দক্ষ ও যোগ্য, তারাই পুলিশের জন্য কাজ করবে।’
‘জুলাই বিপ্লব কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়’
সংবাদ সম্মেলনের শেষ দিকে জুলাই আন্দোলন নিয়ে ফায়দা লোটার চেষ্টার বিষয়েও কথা বলেন আইজিপি। তিনি দাবি করেন, আন্দোলনের সময় তিনিও রাস্তায় ছিলেন।
তার ভাষ্য, ‘জুলাই বিপ্লব কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। অনেকেই আছে, যারা তখন আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত ছিল না, কিন্তু এখন বড় বিপ্লবী হয়ে গেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিভিন্ন দাবি-দাওয়ার আড়ালে জুলাই আন্দোলনকে খাটো বা নষ্ট করার চেষ্টা করা হচ্ছে।’ এসব বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান পুলিশের এ শীর্ষ কর্মকর্তা।





