এলন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জরিপে দেখা গেছে, উত্তরদাতাদের ৬৯ শতাংশ মনে করেন, ‘ মার্কিন স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষরকারীরা যদি আজকের মার্কিন গণতন্ত্র দেখতেন, তবে গর্বের চেয়ে বেশি হতাশ হতেন।’ সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনগণের আস্থা ঐতিহাসিকভাবে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। সাম্প্রতিক হার্ভার্ড ইয়ুথ পোল বলছে, ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণদের মাত্র এক-চতুর্থাংশ ‘আমেরিকার ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী’।
চ্যাপম্যান বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সার্ভে অব আমেরিকান ফিয়ারস’ অনুযায়ী, টানা ১০ বছর ধরে মার্কিন নাগরিকদের সবচেয়ে বড় আতঙ্কের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারি কর্মকর্তা’। অর্থনৈতিক ধস কিংবা প্রিয়জনের মারাত্মক অসুস্থতার চেয়েও এই ভয় এখন প্রবল।
জরিপ বিশেষজ্ঞ ক্রিস্টেন সোলটিস অ্যান্ডারসন দ্য নিউইয়র্ক টাইমসে লিখেছেন, ‘আমেরিকানরা এখন হুমকিকে শুধু বিদেশি প্রতিপক্ষের হামলার আশঙ্কা হিসেবে দেখছে না। অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সহিংসতার সম্ভাবনা, মেরুকরণ, দুর্নীতি ও সাংস্কৃতিক বিশৃঙ্খলা এর অংশ হয়ে উঠেছে। মার্কিন নাগরিকরা ক্রমেই মনে করছেন, দেশের অস্তিত্বই ঝুঁকির মুখে।’
এই প্রবণতা বুঝতে হলে ফিরে যেতে হবে ফরাসি দার্শনিক মন্তেস্কুর কাছে, যিনি মার্কিন সংবিধান রচয়িতাদের ওপর গভীর প্রভাব রেখেছিলেন—কিন্তু আজ অনেকটাই বিস্মৃত। অষ্টাদশ শতকের এই দার্শনিক ও অভিজাত ব্যক্তিত্বের ১৭৪৮ সালে প্রকাশিত ‘দ্য স্পিরিট অব দ্য লজ’ বইটি আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। সাংবিধানিক সম্মেলনে বাইবেলের পরে সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃতি ব্যবহৃত হয়েছিল তার লেখা থেকেই।
ক্ষমতা পৃথকীকরণের প্রশ্নে জেমস ম্যাডিসনের ভাষায় মন্তেস্কু ছিলেন ‘সেই ঐশী বাণী, যাকে সব সময় স্মরণ করা হয়’। ঐতিহাসিক ফরেস্ট ম্যাকডোনাল্ডের মতে, ‘আমেরিকান প্রজাতন্ত্রী মতাদর্শীরা মন্তেস্কুর মূল বক্তব্য এমনভাবে আওড়াতে পারতেন, যেন তা কোনো ধর্মীয় সবক।’
‘দ্য স্পিরিট অব দ্য লজ’-এ মন্তেস্কু রাজনৈতিক স্বাধীনতাকে বর্ণনা করেছেন ‘নিজের নিরাপত্তা সম্পর্কে প্রতিটি মানুষের মনে জন্ম নেয়া প্রশান্তি’ হিসেবে। স্বাধীন হওয়ার অর্থ হলো, নিজেকে নিরাপদ মনে করা। কিন্তু এই বিশ্বাস তৈরির জন্য সরকারকে এমনভাবে গঠন করতে হবে, যাতে ‘এক মানুষ অন্য মানুষকে ভয় না পায়’।
মন্তেস্কু সতর্ক করে বলেছেন, স্বাধীনতা মানে ‘যা খুশি তা করা’ নয়। কারণ, একজনের ইচ্ছা যদি অন্যের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়, তবে তার স্বাধীনতা অন্য সবার স্বাধীনতাকে সীমিত করে দেয়। মন্তেস্কু বলেছেন, অন্য নাগরিকদের—বিশেষ করে ম্যাজিস্ট্রেট বা শাসকের মতো সরকারি দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের—ভয় থেকে মুক্তির কথা তিনি জোর দিয়ে বলেছেন। সরকারি কর্মকর্তারা যদি আইনি সীমা অগ্রাহ্য করে যাকে-তাকে গ্রেপ্তার, সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত বা যথাযথ প্রক্রিয়া ছাড়াই নাগরিকত্ব বাতিল করে বহিষ্কার করতে পারেন, তাহলে নিরাপত্তার অনুভূতি অসম্ভব হয়ে পড়ে।
মন্তেস্কু দেখিয়েছেন, একটি দেশের মৌলিক আইন স্বাধীন জীবনযাপনের সুযোগ দিলেও সাংস্কৃতিক নিয়মকানুন সেই স্বাধীনতাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আজ কেউ কেউ মনে করতে পারেন, বর্ণবৈষম্য দূর করা বা ইভানজেলিক্যাল খ্রিস্টধর্মের দাবিগুলো এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, নির্বাহী ক্ষমতা আইনসভা বা বিচার বিভাগকে উপেক্ষা করে সেগুলো বাস্তবায়ন করতে পারে।
মন্তেস্কু বলেছেন, ‘এসব ক্ষেত্রে সংবিধান আইনগতভাবে স্বাধীন থাকে, বাস্তবে থাকে না।’ এই পরিস্থিতিতেই তৈরি হয় যাকে তিনি ‘মতের স্বৈরাচার’ বলে অভিহিত করেছেন। এতে সাংবিধানিক আইন ও সাংস্কৃতিক নিয়মের মধ্যে যে বৈষম্য তৈরি হয়, তা মানুষকে অনিরাপদ করে তোলে এবং কোনো নেতার ‘স্বাধীনতার নামে আইনকে উপেক্ষা করার’ প্রতিশ্রুতি আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় রাজনীতির উভয় প্রান্ত থেকেই সাংবিধানিক আমূল পরিবর্তন কিংবা সংবিধানকে সরাসরি উপেক্ষা করার আহ্বান শোনা যাচ্ছে। সুপ্রিম কোর্টে বিচারপতির সংখ্যা বাড়ানো, তাদের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করা, এমনকি সিনেট ও ইলেক্টোরাল কলেজ বিলোপের দাবিও উঠছে।
মন্তেস্কুর দৃষ্টিতে, মেরুকরণ এই প্রবণতাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। প্রতিটি রাজনৈতিক দল এমন সাংস্কৃতিক এজেন্ডা সামনে আনছে, যা প্রতিপক্ষ দলের সমর্থকদের কাছে অসহনীয়। ফলে যে দলই ক্ষমতায় থাকুক, তার শাসন প্রতিপক্ষের কাছে সেই ‘মতের স্বৈরাচার’ হিসেবেই ধরা দিচ্ছে—যা মন্তেস্কু বহু আগেই ব্যাখ্যা করে গেছেন।
মন্তেস্কুর মতে, স্বাধীনতা নির্ভর করে সেই ধরনের নাগরিক সংস্কৃতির ওপর, যা যুক্তরাষ্ট্র হারাতে বসেছে। নাগরিকরা যদি বিশ্বাস করেন যে, তাদের পছন্দের সাংস্কৃতিক নিয়ম বাস্তবায়নে রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রয়োগ করতেই হবে—তখন যতই সুচিন্তিত প্রতিষ্ঠান থাকুক না কেন, স্বাধীনতা রক্ষা করা সম্ভব নয়। নৈতিক মতপার্থক্যের প্রতি সহনশীল একটি সংস্কৃতিই কেবল সরকার ও নাগরিকদের মধ্যে অনাস্থার দূরত্ব কমাতে পারে। তা না হলে যে স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তা থেকে আরও দূরে সরে যাবেন আমেরিকানরা।
—দ্য কনভারসেশন ডটকমের প্রতিবেদনে অবলম্বনে





