প্রযুক্তিতে আধিপত্য হারানোর ভয় ওয়াশিংটনের; এআইয়ের গতি না কমানোর পক্ষে বেইজিং

চীনের অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার উৎসাহিত করা হচ্ছে
চীনের অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার উৎসাহিত করা হচ্ছে | ছবি: সংগৃহীত
0

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির লাগামহীন বিকাশ এবং এর সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সিলিকন ভ্যালি থেকে যখন সতর্কবার্তা আসছে, তখন উল্টো পথে হাঁটছে চীন। ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে বিশ্বজুড়ে এআই প্রযুক্তির উন্নয়নের গতি কমানোর যে আহ্বান জানানো হচ্ছে, বেইজিং সেটিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিগত আধিপত্য স্থায়ী করার কৌশল হিসেবে দেখছে।

সম্প্রতি এআই গবেষণা প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রোপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদেই বিশ্বব্যাপী এআই প্রযুক্তির বিকাশ নিয়ন্ত্রণের প্রস্তাব দেন। তিনি স্পষ্ট করেন, এ গতি নিয়ন্ত্রণের মূল উদ্দেশ্য হলো কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থার চেয়ে গণতান্ত্রিক দেশগুলোর এআই প্রযুক্তিকে এগিয়ে রাখা। এর অংশ হিসেবে চীনের ওপর উন্নত চিপ ও সরঞ্জাম রপ্তানিতে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখারও সমর্থন জানান তিনি।

ওয়াশিংটনের কৌশল নিয়ে বেইজিংয়ের সংশয়

প্রযুক্তি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ওমডিয়ার বিশ্লেষক লিয়ান জিয়ে সু জানান, যুক্তরাষ্ট্রের নির্ধারিত শর্তে এআইয়ের গতি কমাতে চীন মোটেও রাজি নয়। বেইজিং এআই প্রযুক্তিকে দেশের মূল ‘সারভৌম সক্ষমতা’ হিসেবে গণ্য করে। যুক্তরাষ্ট্র যে ব্যবধান কমানোর মুখে পড়েছে, তা আটকে রাখতেই এ মন্থরতার কথা বলা হচ্ছে বলে মনে করে চীন।

আমোদেইয়ের বক্তব্যের জবাবে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও বৈরী প্রতিযোগিতা আন্তর্জাতিক এআই সুশাসন ব্যবস্থাকে ব্যাহত করবে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, বেইজিং কেবল মার্কিন প্রস্তাবকে প্রত্যাখ্যান করছে, ঝুঁকিগুলোকে নয়।

ধীরগতি নয়, রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে জোর

যুক্তরাষ্ট্র এআইয়ের সার্বিক গতি কমানোর কথা বললেও চীন হাঁটছে ভিন্ন পথে। বেইজিং এআইয়ের গতি না কমিয়ে বরং তার ব্যবহার সরকারের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাইছে। সম্প্রতি দেশটি এআই নিরাপত্তা কাঠামোর তৃতীয় সংস্করণ প্রকাশ করেছে। এতে এআই এজেন্টের ঝুঁকি, সাইবার নিরাপত্তা এবং এআইয়ের স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিজের দক্ষতা বৃদ্ধির মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

কনকর্ডিয়া এআই-এর গবেষক গ্যাব্রিয়েল ওয়াগনার বলেন, এআই নিরাপত্তার ঝুঁকির বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের শঙ্কা এবং চীন সরকারের ভাবনার মধ্যে অনেক মিল রয়েছে। তবে চীনের কমিউনিস্ট পার্টি প্রযুক্তির মূল নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রেখে একে এগিয়ে নিতে চায়। ২০২২ সাল থেকে চীনে অ্যালগরিদম নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু রয়েছে। চলতি বছর থেকে প্রযুক্তি কীভাবে কাজ করছে, তার ওপর রাষ্ট্রীয় তদারকি জোরদার করা হয়েছে।

শিল্প ও অর্থনীতিতে এআইয়ের জোয়ার

ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা থাকলেও চীনের অর্থনীতি ও দৈনন্দিন জীবনে এআইয়ের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। দেশের সাম্প্রতিক পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাতেও এআই প্রযুক্তিকে প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। স্থানীয় সরকারগুলো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে অনুদান ও কম ভাড়ায় কার্যালয় দিচ্ছে।

কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস-এর গবেষক লেয়া ওয়াং জানান, চীনে প্রযুক্তি বাস্তবায়নের গতি বেশ দ্রুত। গ্লোবাল ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের কারখানাগুলোতে এআই এজেন্টের ব্যবহার বাড়ানো হচ্ছে। শিল্প প্ল্যাটফর্ম ব্ল্যাক লেক টেকনোলজিসের প্রতিনিধিরা জানান, কারখানায় এআই কতটা নির্ভরযোগ্য সেটিই তাদের কাছে মুখ্য বিষয়। এছাড়া চীনে ‘আ-ফু’ নামের একটি এআই চিকিৎসাসেবা ইতোমধ্যে ১৫ কোটি মানুষ ব্যবহার করছে।

ট্রাম্প-শি বৈঠক ও আগামীর পথ

এআই নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থান অবশ্য কিছুটা ভিন্ন। তিনি এআইয়ের মাধ্যমে মানবজাতি ধ্বংসের আশঙ্কাকে ‘প্রতারণা’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। আগামী সপ্তাহে ওয়াশিংটনে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে ট্রাম্পের বৈঠকে এআই প্রযুক্তি আলোচনার এজেন্ডায় থাকতে পারে, যদিও এতে বড় কোনো সমঝোতার সম্ভাবনা কম।

প্রযুক্তিবিষয়ক ওয়েবসাইট ইয়াংজিআর ডটকমের সম্পাদক নি তাও বলেন, সাধারণ চীনা নাগরিকেরা এআইকে একটি দরকারি দৈনন্দিন প্রযুক্তি হিসেবে দেখছেন। কর্মসংস্থান নিয়ে কিছুটা উদ্বেগ থাকলেও চীনে সর্বসম্মত ধারণা তৈরি হয়েছে যে, থমকে না দাঁড়িয়ে এআই প্রযুক্তিতে নিজেদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাই এখন প্রধান লক্ষ্য।

দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে অবলম্বনে

এএম