ইরানের ৩ পাইলটকে ৬ মাস ধরে কাতার আটকে রেখেছে, অভিযোগ তেহরানের

ইরানের বিমানঘাঁটিতে যুদ্ধবিমান ও দুটি ড্রোন
ইরানের বিমানঘাঁটিতে যুদ্ধবিমান ও দুটি ড্রোন | ছবি: ডেইলি সাবাহ
0

ইরানের তিন সামরিক পাইলটকে প্রায় ছয় মাস ধরে যুদ্ধবন্দি হিসেবে আটকে রাখার অভিযোগ তুলে কাতারের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করেছে ইরান। এই বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে ইন্টারন্যাশনাল কমিটি অব দ্য রেড ক্রসকে (আইসিআরসি) অনুরোধ জানিয়েছে দেশটি। বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতের সময় গত মার্চে ঘটে যাওয়া আকাশপথের সংঘর্ষের জেরে সৃষ্ট নতুন এক বিরোধ এটি। ডেইলি সাবাহের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

নিখোঁজ কর্মীদের বিষয়ে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর জেনারেল স্টাফ কমিটির প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ বাঘেরজাদেহ ২০২৬ সালের ১৫ আগস্ট আইসিআরসির প্রেসিডেন্ট মির্জানা স্পলিয়ারিচ এগারের কাছে লেখা এক চিঠিতে এই দাবি করেন। ইরানি সংবাদমাধ্যম চিঠিটি প্রকাশ করেছে এবং কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও এটি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে।

কাতারে ইরানের যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার পর নিখোঁজ তিন পাইলট বেঁচে আছেন এবং তাদের কাতারি বাহিনী আটকে রেখেছে বলে ইরানি কর্তৃপক্ষের এটি প্রথম প্রকাশ্য নিশ্চিতকরণ।

মার্চ থেকে বন্দি তিন পাইলট
বাঘেরজাদেহর বিবরণ অনুযায়ী, গত ২ মার্চ ইরানি বিমানবাহিনীর দুটি এসইউ-২৪ ফাইটার-বোমারু বিমান কাতারে ‘শত্রুর সামরিক ঘাঁটির’ বিরুদ্ধে অভিযানে পাঠানো হয়েছিল। এই লক্ষ্যবস্তুটি ব্যাপকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান সামরিক ঘাঁটি আল উদেইদ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এই ঘাঁটিতে মার্কিন বাহিনী মোতায়েন রয়েছে এবং এটি ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ডের একটি প্রধান আঞ্চলিক কেন্দ্র।

ইরান দাবি করেছে, বিমানগুলো তাদের অভিযান শেষ করেছে। তবে ফেরার পথে সেগুলোকে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দিয়ে বাধা দেয়া হয় বা আঘাত করা হয়। ক্রুরা কাতারি ভূখণ্ডের ওপরে বা কাছাকাছি জায়গায় বিমান থেকে ঝাঁপ দিয়েছিলেন। চার ক্রু সদস্যের একজন মজিদ কাজেমি নিহত হন। পরে তার মরদেহ উদ্ধার এবং ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে শনাক্ত করে ইরানে ফিরিয়ে আনা হয়। জুলাইয়ের শেষে সামরিক মর্যাদায় শিরাজে তাকে দাফন করা হয়।

বাঘেরজাদেহ বেঁচে যাওয়া তিন পাইলটের পরিচয় প্রকাশ করেছেন—জাভাদ সালেহি, আবদোলমজিদ দাশতিয়ান এবং ওমরান বেহরাভেশিয়ান। তার দাবি, বিমান থেকে ঝাঁপ দেয়ার পর কাতারি বাহিনী এই তিনজনকে বন্দি করে। এরপর থেকে তারা তাদের হেফাজতে রয়েছেন। এর অর্থ হলো, তারা প্রায় ছয় মাস ধরে হেফাজতে রয়েছেন।

ইরানি কর্মকর্তারা আগে বলেছিলেন, পাইলটদের ভাগ্য এখনো অস্পষ্ট। আগস্টের শুরুতে সেনাবাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আকরামিনিয়া বলেন, তেহরান এখনো নিখোঁজ কর্মীদের সম্পর্কে তথ্য পেতে চেষ্টা করছে। কাতার এই বিষয়ে তাদের কাছে কোনো তথ্য নেই বলেই জানিয়েছে বলে ইঙ্গিত দেন তিনি। ইরানের এই সর্বশেষ চিঠি প্রকাশ্যে দেয়া তথ্যের ক্ষেত্রে একটি বড় ধরনের পরিবর্তন।

যুদ্ধবন্দিদের সুরক্ষা লঙ্ঘন
বাঘেরজাদেহ কাতারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক মানবিক আইন এবং জেনেভা কনভেনশনের অধীনে যুদ্ধবন্দিদের দেয়া সুরক্ষা লঙ্ঘনের অভিযোগ এনেছেন। ইরানি বিবরণ অনুযায়ী, বন্দিদশায় থাকা এই তিন পাইলটকে তাদের পরিবার, ইরানি কর্মকর্তা বা অন্য কোনো অনুমোদিত প্রতিনিধির সঙ্গে যোগাযোগ করতে দেয়া হয়নি।

ইরানের দাবি, কাতার পাইলটদের তাদের অবস্থা সম্পর্কে স্বজনদের জানাতে দেয়নি এবং আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের অধীনে যেসব প্রবেশাধিকার প্রয়োজন তা প্রদান করতেও ব্যর্থ হয়েছে।

ইরানের সামরিক কর্মকর্তা আইসিআরসিকে জরুরি ভিত্তিতে পাইলটদের সঙ্গে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করার, তাদের স্বাস্থ্য ও বন্দিদশার অবস্থা মূল্যায়ন করার, ইরানি কর্তৃপক্ষের কাছে ফলাফল জানানোর এবং তাদের মুক্তির ব্যবস্থা করার আহ্বান জানিয়েছেন। এই আবেদনের ফলে বিরোধটি সরাসরি আইসিআরসির সামনে চলে এলো। যুদ্ধবন্দি ও সশস্ত্র সংঘাতে আক্রান্ত অন্য ব্যক্তিদের সুরক্ষা ও তাদের প্রতি আচরণ পর্যবেক্ষণে সংস্থাটি কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে।

কাতারের আকাশে সেই ঘটনা
মার্চের এই সংঘর্ষটি একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতের সময় ঘটে। এই সংঘাত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ইরানের বিরুদ্ধে হামলার মাধ্যমে শুরু হয়েছিল। এরপর উপসাগরীয় রাষ্ট্রসহ পুরো অঞ্চলজুড়ে বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে ইরান ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়।

সে সময় স্বতন্ত্র প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, কাতারে লক্ষ্যবস্তুর দিকে অগ্রসর হওয়ার সময় ইরানের দুটি ‘এসইউ-২৪’ যুদ্ধবিমান রাডার শনাক্তকরণ এড়াতে অত্যন্ত নিচু উচ্চতায় উড়েছিল। বিমানগুলোতে বোমা ও গাইডেড অস্ত্র ছিল বলে জানা যায়। কাতারি বাহিনী যখন এগুলোকে শনাক্ত করে, তখন সেগুলো লক্ষ্যবস্তু থেকে মাত্র কয়েক মিনিট দূরে ছিল বলে ধারণা করা হয়। কাতার জানিয়েছিল, তাদের বাহিনী রেডিওতে বিমানগুলোকে সতর্ক করেছিল, কিন্তু কোনো সাড়া পায়নি। এরপর সেগুলোকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে গুলি করা হয়।

কাতারের একটি ‘এফ-১৫কিউএ’ যুদ্ধবিমান ইরানি বিমানগুলোকে ভূপাতিত করে। এটি এই সংঘাতে কাতারের প্রথম আকাশপথের সংঘর্ষ হিসেবে বর্ণনা করা হয়। বিমানগুলো কাতারের আঞ্চলিক জলসীমায় বিধ্বস্ত হয়। এতে ক্রুদের সন্ধানে অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান শুরু হয়। তৎকালীন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইনসহ মার্কিন কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছিলেন যে কাতারি যুদ্ধবিমান ইরানি বোমারু বিমানগুলোকে ভূপাতিত করেছিল।

কাতার এখনো নীরব
তিন পাইলট কাতারের হেফাজতে রয়েছে বলে ইরানের অভিযোগের বিষয়ে কাতারি কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্টভাবে কোনো নিশ্চিতকরণ বা অস্বীকৃতি জানিয়ে তাৎক্ষণিক কোনো প্রকাশ্য প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। ইরানি কর্মকর্তারা আগে জানিয়েছিলেন, নিখোঁজ বৈমানিকদের সম্পর্কে কোনো তথ্য থাকার কথা কাতার অস্বীকার করেছে।

কাতারের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার অভাবে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর অমীমাংসিত রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে পাইলটদের বর্তমান অবস্থান, তাদের অবস্থা এবং তাদের যুদ্ধবন্দি হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়া বা সেভাবে আচরণ করা হয়েছে কি না।

নতুন এক চাপের বিন্দু
আইসিআরসির কাছে ইরানের এই আবেদন গত মার্চের ভূপাতিত হওয়ার পর থেকে কার্যত অমীমাংসিত থাকা একটি ঘটনাকে একটি নতুন আন্তর্জাতিক মাত্রা যুক্ত করেছে। তেহরানের কাছে এই বিষয়টি এখন আর কেবল নিখোঁজ সামরিক কর্মীর বিষয় নয়। তাদের চিঠি পাইলটদের বন্দিদশাকে আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের একটি বিষয় হিসেবে তুলে ধরেছে এবং তাদের কল্যাণ ও তাদের প্রতি আচরণ যাচাইয়ের জন্য বাইরের প্রবেশাধিকার দাবি করছে।

তবে এই দাবিগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি। কাতারের প্রতিক্রিয়া বা আইসিআরসির নিশ্চিতকরণের অপেক্ষায় পাইলটদের বর্তমান অবস্থা ও পরিস্থিতি অস্পষ্ট রয়ে গেছে।

এএম