বিমান বদল কাণ্ডে ট্রাম্পকে নিয়ে ইরানি সংবাদমাধ্যমের বিদ্রুপ

আঙ্কারা বিমানবন্দরে ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’-এর পাশে ক্যাটারিং ট্রাক
আঙ্কারা বিমানবন্দরে ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’-এর পাশে ক্যাটারিং ট্রাক | ছবি: রয়টার্স
0

তুরস্ক সফরের সময় গোপনে বিমান বদলের নতুন তথ্য সামনে আসার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিয়ে বিদ্রুপ শুরু করেছে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম। তেহরানের ভাষ্য অনুযায়ী, এই ঘটনায় স্পষ্ট হয়ে গেছে যে ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের সামরিক শক্তিকে ট্রাম্প কতটা ভয় পাচ্ছেন। রয়টার্সের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের একজন উপস্থাপক বলেন, ‘নতুন এক কেলেঙ্কারির কারণে ট্রাম্প এই মুহূর্তে আবারও মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রধান আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়েছেন। এই কেলেঙ্কারির উৎস ইরানের সামরিক শক্তির প্রতি তার ভয়; যে ভয়ের কারণে গত মাসে তুরস্ক থেকে ফেরার পথে তাকে গোপনে বিমান বদলাতে হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, পুরো ঘটনাটি ট্রাম্পের জন্য ‘অপমানজনক’ হয়ে উঠেছে।

বিমান বদলের নেপথ্য কাহিনি
এই বিষয়ে অবগত একটি সূত্র জানিয়েছে, ‘এয়ার ফোর্স ওয়ানকে’ কাঁধে বহনযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে বলে হুমকি পাওয়ার পরপরই সিক্রেট সার্ভিস তড়িঘড়ি করে ট্রাম্পকে ছোট আকারের একটি সরকারি বিমানে সরিয়ে নেয়। সূত্রটি বলছে, ইরানের সঙ্গে চলমান যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের কারণে উত্তেজনা তুঙ্গে থাকার প্রেক্ষাপটে আঙ্কারায় ন্যাটো সম্মেলনে ট্রাম্পের সফরের শেষ দিন এই হুমকি সামনে আসে। সিক্রেট সার্ভিস হুমকিকে বিশ্বাসযোগ্য ও তাৎক্ষণিক বলে বিবেচনা করে। এর জেরেই মার্কিন প্রেসিডেন্টের যাতায়াত আড়াল করতে অসাধারণ এক অভিযান চালানো হয়।

‘দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প আঙ্কারায় কোথায় অবস্থান করছেন, এমনকি হোটেলের কত তলায় ছিলেন—সেই বিষয়েও ইরানিরা জানত বলে জেনে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা হতভম্ব হয়ে পড়েন। তেহরান অবশ্য এই অভিযোগ কিংবা বিমান বদলের বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি। কর্মঘণ্টার বাইরে হোয়াইট হাউসের সঙ্গেও তাৎক্ষণিক যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

তেহরানের বিভিন্ন এলাকায় ট্রাম্প ও ইসরাইলকে লক্ষ্য করে বিলবোর্ড ও ম্যুরাল টাঙানো হয়েছে, যেখানে কফিনে শায়িত ট্রাম্প থেকে শুরু করে সমুদ্রে ডুবে যাওয়ার ছবি পর্যন্ত দেখানো হয়েছে। যুদ্ধের প্রথম দিন নিহত হওয়া সাবেক সর্বোচ্চ নেতার হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ নেয়ার অঙ্গীকার গত মাসে করেছেন নতুন সর্বোচ্চ নেতা মুজতবা খামেনি।

খাবারের ট্রাকে লুকানো ট্রাম্প
প্রথম সূত্রটি জানিয়েছে, গত ৮ জুলাই তুরস্ক থেকে ফেরার সময় ট্রাম্প ও তার অল্প কয়েকজন সহযোগী বিশাল নীল-সাদা প্রেসিডেন্সিয়াল বিমান থেকে খাবার সরবরাহকারী একটি ট্রাকে করে ছোট আকারের ‘সি-৩২এ’ জেটে সরে যান। এরপর জ্যেষ্ঠ প্রশাসনিক কর্মকর্তা, হোয়াইট হাউস কর্মী ও সাংবাদিকদের নিয়ে ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’ পৃথকভাবে যাত্রা করে।

দক্ষিণ আফ্রিকায় অবস্থিত ইরানের দূতাবাস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেয়া এক পোস্টে বলেছে, ‘শিগগিরই ট্রাম্পকে ময়লার ভাগাড়ে লুকাতে হবে।’ এই পোস্টের সঙ্গে খাবারভর্তি একটি ক্যাটারিং বাক্সের ভেতর ট্রাম্পের একটি বিদ্রুপাত্মক মিম ছবিও প্রকাশ করা হয়েছে। এই এক্স অ্যাকাউন্টটি প্রায়ই তাদের শেয়ার করা মিমের জন্য ভাইরাল হয়। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমগুলো এই ধরনের মিমের খবর নিয়মিত প্রকাশ করে থাকে। অ্যাকাউন্টটি দূতাবাসের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটেও তালিকাভুক্ত। ‘দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট’ প্রথম বিমান বদলের অভিযানের বিস্তারিত প্রকাশ করে।

অতীতেও অভিযোগ অস্বীকার তেহরানের
২০২৪ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট-নির্বাচিত ট্রাম্পকে হত্যার ষড়যন্ত্রের অভিযোগে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডসের নির্দেশে কাজ করার অভিযোগে এক ইরানি নাগরিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেছিল মার্কিন বিচার বিভাগ। তবে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে তেহরান এই অভিযোগ অস্বীকার করেছিল।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা বিভাগের উপ-কর্মসূচি পরিচালক আলী ভায়েজ বলেন, ‘২৮ ফেব্রুয়ারিতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতাসহ অন্য কয়েকজন জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক ও সামরিক কর্মকর্তার হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ নেয়ার কথা যেসব ইরানি কট্টরপন্থি বলছিলেন, তারা এখন এই ঘটনায় উল্লসিত। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নিরাপত্তা নিয়ে এতটাই ভীত ও উদ্বিগ্ন ছিল।’

উপসাগরে চলমান যুদ্ধের স্থায়ী অবসানের বিষয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র এখনো মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে বলে জানিয়েছেন ইরানের এক জ্যেষ্ঠ সূত্র। তার ভাষ্য অনুযায়ী, অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি পুনরুজ্জীবিত করার আলোচনায় কোনো অগ্রগতি হয়নি।

ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা ‘তাসনিমের’ এক পডকাস্টে ভাষ্যকার আলিরেজা মাজিদি ২০১৮ সালে ইরাকের আইন আল-আসাদ ঘাঁটিতে ট্রাম্পের একটি সফরের কথা স্মরণ করেন। ইরাকে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে ইরানের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। ওই সফরে যে অসাধারণ নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছিল, তা ট্রাম্প নিজেই বর্ণনা করেছিলেন। সিএনএনের বরাতে ইরাকের ঘাঁটিতে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘বিমানের ভেতর অন্ধকার, সব জানালা বন্ধ, কোথাও কোনো আলো নেই—এমন পরিস্থিতিতে আমাদের কীভাবে যেতে হয়েছিল তা যদি আপনারা দেখতেন। ঘুটঘুটে অন্ধকার। আমি জীবনে এমন কিছু দেখিনি।’

এএম