স্থানীয় কিছু বাসিন্দা এই ‘স্বর্ণের আগ্রাসন’ থেকে সাময়িক লাভের মুখ দেখলেও পরে গভীর অনুশোচনায় ভুগেছেন। এমন একজন কৃষক ৭৪ বছর বয়সী মুহাম্মদ আমিন। পুল-এ-জিরি বান উপত্যকার এই বাসিন্দা এএফপিকে বলেন, ‘আগে নদী ছিল গভীর, পানি ছিল স্বচ্ছ।’ কিন্তু খনির কাজ শুরুর পর থেকে ‘নদীর পানি এখন পান করা যায় না, এমনকি গোসলও করা যায় না।’
চোখে জল নিয়ে আমিন জানান, নদীর ধারের ঘাস ‘সব হারিয়ে গেছে’ এবং ‘ধুলা ও বাতাসের কারণে’ চাষাবাদ এখন অসম্ভব হয়ে পড়েছে। আগে যেখানে তিনি ৪০টি ছাগল পুষতেন, এখন কোনোমতে সর্বোচ্চ ১৫টি ছাগলের ভরণপোষণ করতে পারেন। একটি খনি কোম্পানির কাছে ২০ হাজার ডলারে জমি ইজারা দেয়ার চুক্তি করলেও তিনি অর্ধেক টাকা পেয়েছেন। কাজ শেষে জমি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দেয়ার প্রতিশ্রুতিও রাখেনি কোম্পানিটি।
পাঁচ বছর আগে ক্ষমতায় ফেরার পর থেকে দেশটির বিপুল ভূগর্ভস্থ সম্পদ কাজে লাগিয়ে রাষ্ট্রীয় কোষাগার সমৃদ্ধ করতে খনি খাতকে বিস্তৃত করছে তালেবান কর্তৃপক্ষ। বদাখশান খনি বিভাগের প্রধান আবদুল মতিন রাহিমজাই জানান, তারা প্রায় ৬৫০ থেকে ৭০০টি কোম্পানি নিবন্ধন করেছেন এবং সেখানে হাজার হাজার শ্রমিক ম্যানুয়ালি কাজ করছেন। বিশ্বব্যাংকের মে মাসের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২১ সাল থেকে শত শত খনি চুক্তি সই হয়েছে এবং বার্ষিক গড়ে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ প্রকৃত প্রবৃদ্ধি হচ্ছে।
সেরা বিকল্প
আমিনের গ্রামে খনির কাজ সাময়িকভাবে বন্ধ থাকলেও কাছেই গুলাক-দারা উপত্যকায় ডজন খানেক এক্সকাভেটর পাহাড়ের গা কেটে চলেছে। আফগানিস্তানে কাজের অভাব থাকায় দেশজুড়ে শ্রমিকরা এখানে ভিড় করছেন। কাবুল থেকে আসা মোহাম্মদ আঘা খাজা খেইল পাঁচ বছর ধরে খনিতে কাজ করছেন। ট্রাকে মালামাল তোলার কাজ করে মাসে তিনি ১০ হাজার আফগানি (প্রায় ১৫০ ডলার) আয় করেন। ২১ বছর বয়সী এই তরুণ এক্সকাভেটরের বিকট শব্দের মধ্যেই বললেন, ‘এটাই সব চেয়ে ভালো। কাবুলে তেমন কাজ নেই।’
পাঁচ সন্তানের বাবা শফিউল্লাহ এহসাস (৩২) প্রায় তিন মাস আগে জালালাবাদ থেকে শত শত কিলোমিটার দূরে নিজের এক্সকাভেটর নিয়ে এসেছেন। তার ভাষায়, ‘জালালাবাদে স্বর্ণের কাজ এখনো শুরু হয়নি; বদাখশানে হচ্ছে। তাই আমাদের সরঞ্জাম নিয়ে এখানে আসা ছাড়া উপায় ছিল না।’ তিনি মাসে ২৫ হাজার আফগানি আয় করেন।
আফগানিস্তানের খনি ও পেট্রোলিয়াম মন্ত্রণালয় এই খাতকে নিয়মের আওতায় আনার চেষ্টা করছে। মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হুমায়ুন আফগান বলেন, আগের সরকারের আমলে ‘সম্পদগুলো অনিয়মিতভাবে উত্তোলিত হতো; কোনো তদারকি ছিল না।’ প্রতিবেশী তাখার প্রদেশেও চীনা অংশীদারদের সঙ্গে মিলে একটি আফগান কোম্পানি স্বর্ণ উত্তোলন করছে বলে জানান তিনি।
আফগানিস্তান অ্যানালিস্টস নেটওয়ার্কের গবেষক ফ্যাব্রিজিও ফোশচিনি বলেন, দীর্ঘ যুদ্ধের সময় খনি খাত থেকে মূলত তালেবানসহ বিদ্রোহী গোষ্ঠী এবং দুর্নীতিবাজ সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে যুক্ত স্থানীয় ক্ষমতাবানরাই লাভবান হয়েছেন। বর্তমানে খনি কোম্পানিগুলোকে মুনাফা যাই হোক, প্রতি হেক্টরে মাসে ২০ গ্রাম স্বর্ণ বা তার সমমূল্যের অর্থ কর হিসেবে দিতে হচ্ছে।
ধ্বংসস্তূপে পরিণত এলাকা
প্রায় ১০০ শ্রমিক ও ২০টি এক্সকাভেটর নিয়ে চালু একটি খনি কোম্পানির ম্যানেজার মোহাম্মদউল্লাহ মুবারিজ জানান, তার দল এক সপ্তাহে ২০০ থেকে ৩০০ গ্রাম স্বর্ণ উত্তোলন করতে পারে। তবু এপ্রিলের পর থেকে চালুর খরচের কারণে কোম্পানিটি লোকসানে চলছে বলে দাবি তার। বদাখশান খনি বিভাগের প্রধান রাহিমজাই জানান, গত বছর সরকার এই প্রদেশ থেকে ১১২ কেজি স্বর্ণ সংগ্রহ করেছে। এএফপির সঙ্গে কথা বলা খনি শ্রমিকরা জানান, প্রতি গ্রাম স্বর্ণ তারা প্রায় ১১৮ ডলারে বিক্রি করেন। রাহিমজাই বলেন, ‘গত বছর বেশিরভাগ খনিই নিবন্ধিত ছিল না। তাদের কাছ থেকে ফি সংগ্রহের কোনো ব্যবস্থাও ছিল না।’
শিওয়া এলাকাসহ পরিবেশের ক্ষতি করা প্রায় ২২৫টি খনি বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। রাহিমজাই এএফপিকে বলেন, ‘সেখানে একটি সেতু, দোকানপাট ও একটি স্কুল ছিল। সবকিছুই বন্যার পানি, কাদা ও ধ্বংসাবশেষের নিচে চাপা পড়েছে। পুরো এলাকাটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।’ তিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া এবং বদাখশানের খনিজ সম্পদ ‘জনগণের কল্যাণে সঠিকভাবে ব্যবহারের’ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
প্রদেশটির কিছু অংশ এখনো অক্ষত রয়েছে। শিওয়া থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরের এলাকা এর মধ্যে একটি। রাখাল ফাজিল আশা করেন, খনি শ্রমিকরা এই অঞ্চল থেকে যেন দূরে থাকেন। নিরাপত্তার কারণে শুধু নিজের প্রথম নাম প্রকাশে সম্মত এই ব্যক্তি বলেন, ‘কারণ এটি মানুষের জন্য, বনভোজনের জন্য, গবাদিপশু চরানোর জন্য একটি জায়গা।’ ৪৫ বছর বয়সী এই ব্যক্তি শৈশব থেকেই প্রতি গ্রীষ্মে পাহাড়ে পশু চরাতে আসেন। তার ভাষায়, ‘এই স্বর্ণের শিল্প এখানকার স্থানীয় সম্প্রদায়ের কোনো উপকারে আসে না। এটি কেবল ক্ষমতাবানদের লাভবান করে।’




 party chief Jordan Bardella-320x167.webp)
