এআই দিয়ে বানানো নিম্নমানের ভিডিওর বিরুদ্ধে কড়া অবস্থানে ইউটিউব

প্রিমিয়াম লাইট সাবস্ক্রিপশনের নতুন ভার্সন আনবে ইউটিউব
প্রিমিয়াম লাইট সাবস্ক্রিপশনের নতুন ভার্সন আনবে ইউটিউব |
0

ভবিষ্যতে কনটেন্ট নির্মাতাদের জন্য একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে ইউটিউব। বার্তায় জানানো হয়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি নিম্নমানের বা দর্শকদের বিরক্তিকর মনে হওয়া ভিডিও দিয়ে আর উপার্জন করা যাবে না। পাশপাশি প্ল্যাটফর্মটি ‘অকৃত্রিম কনটেন্ট’ (ইনঅথেনটিক কনটেন্ট) সংক্রান্ত তাদের নীতিমালা আরও স্পষ্ট করেছে। এর মাধ্যমে কম পরিশ্রমে তৈরি করা এআই ‘স্লপ’ বা আবর্জনার মতো কনটেন্টের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে প্ল্যাটফর্মটি।

ইউটিউবের কনটেন্ট নির্মাতাদের জন্য পরিচালিত অফিশিয়াল চ্যানেল ‘ক্রিয়েটর ইনসাইডার’-এ প্রকাশিত এক ভিডিওতে এসব তথ্য জানিয়েছেন প্ল্যাটফর্মটির ট্রাস্ট অ্যান্ড সেফটি বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট ম্যাট হালপ্রিন। এআই-নির্মিত কনটেন্টের বিষয়টি তারা কীভাবে সামলাচ্ছেন, সে সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা দেন তিনি।

তবে ইউটিউব এআই কনটেন্টের বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান নিতে চাইছে না। বরং, তারা এসব কনটেন্টকে তিনটি ভাগে ভাগ করেছে—প্রথমত, সাধারণ ও পুনরাবৃত্তিমূলক কনটেন্ট; দ্বিতীয়ত ‘বিরক্তিকর’ ও আবেগে সুড়সুড়ি দেয়া কনটেন্ট এবং সবশেষ এআই ব্যক্তিত্ব বা ‘এআই পার্সোনা’। ইউটিউবের পার্টনার পলিসির আওতায় বর্তমানে এই তিন ধরনের কনটেন্ট থেকে কোনো আয় করা যাবে না।

মূলত এ ধরনের কনটেন্টের ক্ষেত্রে গত বছর থেকেই কড়াকড়ি শুরু করেছিল ইউটিউব। তবে এত দিন নীতিমালা তেমন স্পষ্ট ছিল না। সে সময় প্ল্যাটফর্মটি ‘অকৃত্রিম কনটেন্ট’ শনাক্ত করার একটি কাঠামো তৈরি করে। বিশেষত, ‘পাইকারি হারে তৈরি ও একঘেয়ে ভিডিও’ বানানো অ্যাকাউন্টগুলোই ছিল লক্ষ্যবস্তু। এখন সেই বিধিনিষেধগুলোতেই আরও সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা যোগ করা হয়েছে। তবে ইউটিউব কনটেন্ট নির্মাতাদের হাত থেকে এআই ব্যবহারের সুযোগ পুরোপুরি কেড়ে নিতে চায় না।

হালপ্রিন বলেন, ‘এআই মানুষকে অনেক ভিডিও বানাতে সাহায্য করতে পারে। এসব ভিডিওর কিছু কিছু সত্যিই দুর্দান্ত হয় এবং সৃজনশীলতাকে আরও এগিয়ে নেয়। বেশি সংখ্যায় ভালো মানের কনটেন্ট তৈরি হোক, এটাই আমরা চাই।’

তিনি আরও বলেন, ‘কিন্তু ঠিক একই প্রযুক্তি দিয়ে অনেক ভিডিও দ্রুত বানানো যায়, যেগুলো একে অপরের প্রায় প্রতিরূপ। এসব ভিডিও একঘেয়ে হয়, এর কোনো গল্পের বাঁধুনি থাকে না; নির্মাতার সৃজনশীলতাও দেখা যায় না। ফলে এই প্রযুক্তি যেমন দুর্দান্ত কিছু তৈরি করতে পারে, তেমনি এক ধরনের ‘কনটেন্ট চাষবাসের’ ক্ষেত্রও তৈরি করছে। এই ‘কনটেন্ট চাষবাস’ই আমরা বন্ধ করতে চাই।’

ইউটিউব মূলত স্পষ্টত নিম্নমানের ভিডিওর বিরুদ্ধে দাগ টানছে। তবে এআই দিয়ে তৈরি মানসম্পন্ন কনটেন্টের জন্য দুয়ার খোলা রাখা হয়েছে। এ ছাড়া দর্শকদের ‘বিরক্তিকর’ মনে হওয়া কনটেন্টের বিরুদ্ধেও কঠোর হচ্ছে প্ল্যাটফর্মটি। যদিও এই সিদ্ধান্তে সংবাদভিত্তিক কনটেন্ট বানানো চ্যানেলগুলো ঝামেলায় পড়তে পারে। হালপ্রিন উদাহরণ হিসেবে জানান, উদ্ধার অভিযানের নামে বিপদগ্রস্ত পশুর ভিডিও যদি কোনো ভিডিওর মূল বিষয় হয়, তবে সেটি আর আয়ের যোগ্য বিবেচিত হবে না।

তবে ইউটিউবের সবচেয়ে বড় মাথাব্যথার নাম—এআই ‘স্লপ’। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, ইউটিউবের অ্যালগরিদম নতুন ব্যবহারকারীদের যেসব ভিডিও দেখাচ্ছে, তার প্রায় ২০ শতাংশই স্বল্প-পরিশ্রমে বানানো এআই কনটেন্ট। প্ল্যাটফর্মটির স্বল্পদৈর্ঘ্যের উল্লম্ব ভিডিও ফরম্যাট ‘শর্টস’-এ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ।

সেখানে প্রতি দুটি ভিডিওর একটিই এআই দিয়ে তৈরি। জানা গেছে, ইউটিউব এরই মধ্যে সবচেয়ে খারাপ ধরনের অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া শুরু করেছে। কিন্তু কাজটি অনেকটা ‘হোয়াক-এ-মোল’ খেলার মতো, যা ইউটিউবের নিজস্ব জেনারেটিভ এআই বিনিয়োগের কারণে আরও কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গত ১৬ জুলাই থেকে কার্যকর হওয়া এই নতুন নীতিমালা তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে। প্রথম ভাগে রয়েছে সাধারণ, পুনরাবৃত্তিমূলক বা টেমপ্লেটভিত্তিক কনটেন্ট। হালপ্রিন উল্লেখ করেন, এআই, সিজিআই বা টেমপ্লেট দিয়ে সহজেই বানানো যায় এমন কনটেন্ট, যেগুলোতে একঘেয়ে ভিডিওর ছড়াছড়ি, এই ভাগে পড়বে। এমনকি কোনো টিউটোরিয়াল ভিডিও যদি প্ল্যাটফর্মে থাকা অন্যান্য কনটেন্টের হুবহু নকল হয় এবং তাতে মৌলিকত্ব না থাকে, সেটিও এ নীতির আওতাভুক্ত হবে।

দ্বিতীয় ভাগে রয়েছে ‘বিরক্তিকর’ কনটেন্ট, যা মূলত ভিউ পাওয়ার আশায় দর্শকের আবেগে সুড়সুড়ি দেয়ার জন্য বানানো হয়। হালপ্রিন বলেন, ‘আমাদের দর্শকেরা আমাদের জানিয়েছেন, এসব কনটেন্ট তারা পছন্দ করেন না। তারা মনে করেন এটি বিরক্তিকর এবং এমন চ্যানেল বা প্ল্যাটফর্মে আবার ফিরতে চান না তারা।’ ভিডিও এআই দিয়ে তৈরি হোক বা না হোক, এই ধরনের চ্যানেলগুলোকে ইউটিউব পার্টনার প্রোগ্রাম (ওয়াইপিপি) থেকে বাদ দেয়া হবে।

তৃতীয় ভাগটি এআই ব্যক্তিত্ব বা এআই দিয়ে তৈরি বাস্তব মানুষের প্রতিরূপকে সরাসরি লক্ষ্য করছে। ইউটিউব চায় না যে এআই ব্যক্তিত্ব ব্যবহার করে অর্থ, আইন, স্বাস্থ্যসেবা বা চিকিৎসাসংক্রান্ত স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হোক। হালপ্রিন জানিয়েছেন, উপরের এই তিন ধরনের কনটেন্টের কোনোটিই বেশি পরিমাণে থাকা কোনো চ্যানেল আর আয়ের যোগ্য বিবেচিত হবে না।

এই সিদ্ধান্ত ইউটিউবের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, টিভি বিজ্ঞাপনের বাজার দখলে অন্যান্য স্ট্রিমিং সেবার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছে গুগলের এই ভিডিও প্ল্যাটফর্ম। বিজ্ঞাপন থেকে আয়ের হিসাবে ইউটিউব প্রতিদ্বন্দ্বী স্ট্রিমিং সেবাগুলোর চেয়ে এগিয়ে এবং বিশ্বজুড়ে দৈনিক গড় ভিউয়ের হিসাবে এটি নেটফ্লিক্সকেও ছাড়িয়ে গেছে। ফলে প্ল্যাটফর্মটিতে এআই আবর্জনার ছড়াছড়ি হলে সেটি প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

গিজমোডো ও টেক ক্রাঞ্চ অবলম্বনে...

এএম