মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অস্বীকার করলেও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ইন্টারসেপ্টর বা ক্ষেপণাস্ত্র বিধ্বংসী অস্ত্রের মজুত কমে আসতে পারে। একই সঙ্গে, সংঘাত এড়াতে কূটনৈতিক সমাধানের জন্য দুই পক্ষের ওপরই চাপ বাড়ছে।
হামলা স্থগিত হলেও এই সংঘাতের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হরমুজ প্রণালি এখনো বন্ধ রয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবি জানিয়েছে, সোমবার ভোরে ছয়টি জাহাজ নেভিগেশন সিস্টেম বন্ধ করে প্রণালির ‘অবৈধ ও অনিরাপদ’ পথে যাওয়ার চেষ্টা করে। এর মধ্যে একটি জাহাজ দুর্ঘটনায় পড়ে এবং বাকিগুলোকে ‘কঠোর ব্যবস্থাপনার’ মাধ্যমে উপসাগরে ফেরত পাঠায় ইরান। এক ইরানি কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, মার্কিন সামরিক বাহিনী জাহাজগুলোকে অননুমোদিত পথে যেতে উসকানি দিচ্ছে।
এদিকে, বাহরাইন, কুয়েত এবং জর্ডানে মার্কিন সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে পাল্টা হামলা বন্ধ করেছে ইরান। ইরানি সেনাবাহিনীর মুখপাত্র মোহাম্মদ আকরামিনিয়া বলেন, ‘আমাদের কৌশল মূলত প্রতিশোধমূলক। আমরা আমাদের পাল্টা অভিযান স্থগিত করেছি।’
উভয় পক্ষের হামলা বন্ধের পর বিশ্ববাজারে তেলের দাম প্রায় ৪ শতাংশ কমেছে, যা কূটনৈতিক সমাধানের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে মার্কিন সামরিক বাহিনী শনিবার জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিসহ ইরানি বন্দরগুলোতে তাদের নৌ অবরোধ ‘পুরোপুরি কার্যকর’ রয়েছে।
উত্তেজনার আরেকটি বড় কারণ হলো হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের নিয়ন্ত্রণ। ইরান ও ওমান প্রণালিটি পুনরায় খোলার জন্য যৌথ ব্যবস্থাপনার বিষয়ে আলোচনা করছে। কিন্তু ট্রাম্প বা উপসাগরীয় সহযোগিতা সংস্থার (জিসিসি) দেশগুলো এতে সম্মত হবে কি না, তা স্পষ্ট নয়। ১৭ জুন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সই হওয়া সমঝোতা স্মারক (MoU) অনুযায়ী, শান্তি আলোচনা চলাকালীন অন্তত ৬০ দিন প্রণালিটি খোলা থাকার কথা ছিল। কিন্তু নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মতবিরোধের জেরে ইরান ‘ভুল’ পথে আসা জাহাজে হামলা চালায় এবং ট্রাম্প পুনরায় হামলা শুরু করেন।
এরই মধ্যে ক্যাস্পিয়ান সাগরে ইরানি জাহাজে ইউক্রেনের হামলায় অন্তত এক নাবিকের মৃত্যু উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি অভিযোগ করেন, রাশিয়াকে সহায়তা করছে ইরান, তাই সামরিক কার্গো বহনকারী জাহাজে এই হামলা চালানো হয়েছে। এছাড়া লেবাননে ইসরাইলের দখলদারিত্ব নিয়েও উত্তেজনা বিরাজ করছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মুজতবা খামেনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, ইসরাইল লেবাননে হামলা বন্ধ করলেই কেবল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তি সম্ভব।
যুক্তরাষ্ট্র কেন হামলা বন্ধ করেছে, সে বিষয়ে জাতিসংঘে মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ জানান, এই বিরতি দুই দেশের মধ্যে আলোচনা এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে। ইরানি-আমেরিকান অর্থনীতিবিদ নাদের হাবিবি আল জাজিরাকে বলেন, দুই সপ্তাহ আগে সংঘাত শুরু হলে বিশ্ব অর্থনীতিতে তীব্র চাপ পড়ে এবং তেলের দাম ২০ শতাংশ বেড়ে যায়। এটি হামলা স্থগিত করার অন্যতম বড় কারণ। তিনি আরও বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের হামলা ইরানের নীতি পরিবর্তনে যথেষ্ট চাপ তৈরি করতে পারেনি। উল্টো উপসাগরীয় দেশগুলোতে ইরানের হামলার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল।’ অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধের কারণে ইরানের অর্থনীতিও বিপর্যস্ত।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান প্রকল্প পরিচালক আলী ভায়েজ বলেন, ‘দুই সপ্তাহের লড়াই প্রমাণ করেছে যে সংঘাত বাড়ালে শুধু খরচই বাড়ে, সমস্যার সমাধান হয় না।’ কাতার, মিসর ও পাকিস্তান ১০ দিনের যুদ্ধবিরতির জন্য একটি নতুন প্রস্তাব দিয়েছে।
এদিকে, মার্কিন গণমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে পেট্রিয়ট অ্যান্টিমিসাইল ইন্টারসেপ্টরের মজুত কমে যাওয়ায় মার্কিন বাহিনী ও মিত্রদের নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। ট্রাম্প অবশ্য এই দাবি উড়িয়ে দিয়ে বলেছেন, তাদের কাছে প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি অস্ত্র রয়েছে। শুক্রবার হামলা স্থগিত করার পর ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা চাইলে আরও জোরালো হামলা চালাতে পারতাম। তবে আরও একটি বুদ্ধিমান কৌশল হলো চুক্তি করা। আর তারাও চুক্তি করতে চায়।’ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, অস্ত্রের মজুত কমে আসা হামলা স্থগিত করার অন্যতম প্রধান কারণ হতে পারে।





