আজ (বুধবার, ২২ জুলাই) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, ‘এখন থেকে ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান হরমুজ প্রণালিতে কোনো জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র, রকেট, ড্রোন বা অন্য কোনো অস্ত্র দিয়ে হামলা চালালেই যুক্তরাষ্ট্র একটি করে সেতু বা বিদ্যুৎকেন্দ্রে বোমা হামলা চালিয়ে ধ্বংস করবে।’
ট্রাম্পের এই হুমকি এমন সময় এলো, যখন যুদ্ধ ক্রমেই তীব্র হচ্ছে এবং তা থামানোর কোনো সুস্পষ্ট পথ দেখা যাচ্ছে না। সংঘাতের কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জ্বালানির দামও বেড়ে যাচ্ছে।
বিশ্বের জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের বিরোধ আরও গভীর হয়েছে। ইরানের হামলার কারণে প্রণালিটি কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।
বুধবার ভোরে ইরানে নতুন করে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। রাজধানী তেহরানের আকাশে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করা হয়। একই সময়ে ইরান জর্ডানের আকাবা শহরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। বাহরাইন ও সৌদি আরবেও সতর্কতা জারি করা হয়।
আলোচনা প্রায় স্থবির হয়ে পড়ায় উভয় পক্ষই বেসামরিক অবকাঠামোকে চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে ইরান উপসাগরীয় কয়েকটি দেশের জ্বালানি অবকাঠামো ও লবণাক্ত পানি বিশুদ্ধকরণ স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস মঙ্গলবার এসব হামলাকে ‘গ্রহণযোগ্য নয়’ বলে মন্তব্য করেন। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, সামরিক কাজে ব্যবহৃত না হলে বেসামরিক অবকাঠামোয় হামলা নিষিদ্ধ।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে শান্তিকালে বিশ্বের মোট বাণিজ্যিক তেল ও গ্যাসের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ পরিবাহিত হতো। প্রণালিটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। এর মধ্যে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথিরা লোহিত সাগরে সৌদি আরবের জাহাজ লক্ষ্য করার হুমকি দেয়ায় বৈশ্বিক বাণিজ্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথও ঝুঁকিতে পড়েছে।
বুধবার ডোভার বিমানঘাঁটিতে চার মার্কিন সেনার মরদেহ গ্রহণের কথা রয়েছে ট্রাম্পের। এর এক দিন আগে সিনেটে শুনানিতে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধমন্ত্রী পিট হেগসেথ জানান, এ পর্যন্ত যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় হয়েছে ৩৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। এদিকে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৯৪ ডলারে উঠেছে এবং পেট্রোলের দামও আবার বাড়তে শুরু করেছে।
জর্ডানের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, আকাবার আকাশে চারটি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করা হয়েছে। আরও দুটি জনবসতিহীন এলাকায় পড়ে। এছাড়া চারটি ড্রোনও ধ্বংস করা হয়েছে।
বাহরাইনেও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সতর্কতা জারি করা হয়। সৌদি আরবের দাম্মাম শহরের বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। পরে সৌদি কর্তৃপক্ষ জানায়, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, বুধবার ইরানে টানা একাদশ রাতের মতো হামলা চালানো হয়েছে। এতে বিমানঘাঁটির হ্যাঙ্গার ও ড্রোন সংরক্ষণাগারসহ বিভিন্ন স্থাপনা লক্ষ্যবস্তু ছিল।
ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনা জানিয়েছে, দেশটির কয়েকটি প্রদেশে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, গত ১১ দিনে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ৫৩ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ছয় নারী ও তিন শিশু রয়েছে। আহত হয়েছেন প্রায় ৬০০ জন। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জানিয়েছে, তাদের পাল্টা হামলা অব্যাহত থাকবে।
যুদ্ধবিরতি ফেরাতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টাও চলছে। সর্বশেষ হামলার আগে ইরানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসকান্দার মোমেনি মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তর সফর করেন। তবে যুদ্ধ বন্ধে নতুন কোনো সমঝোতা হবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। ইরানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আলি জেইনিভান্দ বলেছেন, ‘কূটনীতি বন্ধ হয়নি।’ তবে এ বিষয়ে তিনি আর বিস্তারিত কিছু জানাননি।
ফিলিপাইনে এক আঞ্চলিক সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, কোনো রাষ্ট্র যদি আন্তর্জাতিক জলপথ নিয়ন্ত্রণ করে টোল আদায় এবং অর্থ না দিলে জাহাজে হামলার নজির তৈরি করে, তাহলে তা অত্যন্ত বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়াবে।
ইরানের হামলার জবাবে যুক্তরাষ্ট্র দেশটির বন্দরগুলোর ওপর আবারও অবরোধ আরোপ করেছে। এদিকে ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, পাহাড়ের নিচে নির্মাণাধীন ইরানের পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন পারমাণবিক স্থাপনাতেও যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালাতে পারে।
নাতাঞ্জ পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রের দক্ষিণে অবস্থিত এই স্থাপনাটি ২০২৫ সালে ইরান-ইসরাইলের ১২ দিনের যুদ্ধের সময় হামলার বাইরে ছিল। সেখানে এখনো নির্মাণকাজ চলছে।
ইরান বরাবরই দাবি করে আসছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ। তবে ট্রাম্প প্রথম মেয়াদে ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করার পর দেশটি আবারও প্রায় অস্ত্র-মানের মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ শুরু করে। যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর ধারণা, ২০০৩ সাল পর্যন্ত ইরানের একটি পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি ছিল এবং ভবিষ্যতে তা পুনরায় চালু হতে পারে।





