ইরানের ওপর থেকে ৪ দশকের মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার; পথ কতটা কঠিন?

তেহরানে খামেনির ছবিসংবলিত বিলবোর্ডের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন পথচারীরা
তেহরানে খামেনির ছবিসংবলিত বিলবোর্ডের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন পথচারীরা | ছবি: রয়টার্স
0

গতকাল (সোমবার, ২২ জুন) ঘোষিত ৬০ দিনের মার্কিন ছাড়ের ফলে তেহরান কয়েক বিলিয়ন ডলারের সুবিধা পেতে যাচ্ছে। তবে চার দশকেরও বেশি সময় ধরে থাকা এসব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা আইনি, রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক দিক থেকে এক বড় চ্যালেঞ্জ, যার সমাধানে কয়েক বছর পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের অন্তর্বর্তী চুক্তিটি দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্বস্তি বয়ে আনবে কি না, তা নিয়ে এখন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। কারণ, মার্কিন আইন, আন্তর্জাতিক বিধিনিষেধ এবং বেসরকারি খাতের ঝুঁকির শঙ্কা মিলিয়ে এই নিষেধাজ্ঞার ব্যবস্থাটি অত্যন্ত জটিল। ইরানের পরমাণু কর্মসূচি, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সমর্থনের অভিযোগে ১৯৭০-এর দশকের শেষভাগ থেকে জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন দেশটির ওপর এসব নিষেধাজ্ঞা, বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা ও সম্পদ জব্দের পদক্ষেপ নিয়েছিল।

গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সই হওয়া ১৪ দফার একটি সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, ওয়াশিংটন সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়ার প্রক্রিয়া শুরু করবে। ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে এর রূপরেখা বা সময়সূচি নির্ধারণ করা হবে, তবে এই সময়সীমা বাড়ানো যেতে পারে। এরই অংশ হিসেবে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ সোমবার একটি অস্থায়ী সাধারণ লাইসেন্স বা ছাড়পত্র ইস্যু করেছে। এর মাধ্যমে আগামী ২১ আগস্ট পর্যন্ত ইরানি অপরিশোধিত তেল এবং পেট্রোকেমিক্যাল ও পেট্রোলিয়াম পণ্য উৎপাদন, সরবরাহ ও বিক্রির অনুমতি দেয়া হয়েছে।

অবশিষ্ট নিষেধাজ্ঞাগুলো যদি শেষ পর্যন্ত তুলে নেয়া হয়, তবে তা মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নীতির এক আমূল পরিবর্তন হিসেবে বিবেচিত হবে। দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি ছিল ইরানের প্রভাব খর্ব করা এবং অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে তাদের সরকারকে দুর্বল করা। তবে এই প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত কঠিন হবে। এর জন্য কিছু ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টের নির্বাহী আদেশ, কিছু ক্ষেত্রে কংগ্রেসের অনুমোদন এবং জাতিসংঘসহ নিষেধাজ্ঞা আরোপকারী অন্যান্য দেশের সঙ্গে নিবিড় সমন্বয় প্রয়োজন। চার দশকের নিষেধাজ্ঞার কারণে কোম্পানিগুলোও অত্যন্ত সতর্ক অবস্থায় রয়েছে, যা চুক্তির ইতিবাচক প্রভাবকে ম্লান করে দিতে পারে।

সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের সন্ত্রাস দমনবিষয়ক উপ-জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হুয়ান জারাতে বলেন, ‘এখানে নিষেধাজ্ঞার একটি জটিল জাল রয়েছে, এবং এটি কেবল নির্বাহী আদেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর সঙ্গে কংগ্রেসের নিষেধাজ্ঞাও যুক্ত।’ ১৯৭৯ সালে তেহরানে মার্কিন দূতাবাস দখল করে কূটনীতিকদের জিম্মি করার পর ওয়াশিংটন প্রথমবারের মতো ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। এরপর থেকে কংগ্রেস অন্তত আধা ডজন নিষেধাজ্ঞা আইন পাস করেছে। এছাড়া হামাস, হিজবুল্লাহ এবং ইয়েমেনের হুথিদের মতো যুক্তরাষ্ট্রের চোখে ‘সন্ত্রাসী’ সংগঠনগুলোকে সমর্থন দেয়ার জেরে বিভিন্ন সময় মার্কিন প্রেসিডেন্টরা নির্বাহী আদেশ জারি করেছেন।

ট্রেজারি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত ট্রেজারির অফিস অব ফরেন অ্যাসেটস কন্ট্রোল (ওএফএসি) এক হাজারের বেশি ব্যক্তি, নৌযান ও উড়োজাহাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। আইন সংস্থা হিউজ হাবার্ড অ্যান্ড রিড-এর অংশীদার এবং সাবেক মার্কিন নিষেধাজ্ঞা কর্মকর্তা জেরেমি প্যানার বলেন, হাজার হাজার ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নাম নিষেধাজ্ঞার তালিকা থেকে বাদ দিতে ওএফএসি-র অন্তত এক বছর সময় লাগবে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চাইলে নির্বাহী আদেশগুলো বাতিল করতে পারেন। তবে হামাস ও হিজবুল্লাহর ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞার মতো কিছু পদক্ষেপ আইনে পরিণত হয়েছে, যা বাতিল বা সংশোধন করতে কংগ্রেসের অনুমোদন লাগবে। আর কংগ্রেসের রিপাবলিকান আইনপ্রণেতারা এরই মধ্যে অন্তর্বর্তী চুক্তির তীব্র সমালোচনা করেছেন।

ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিস-এর লবিং শাখা এফডিডি অ্যাকশন-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং হাউজ ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমিটির সাবেক সহযোগী ম্যাট জুইগ বলেন, ‘স্তরে স্তরে থাকা এই নিষেধাজ্ঞাগুলো পুরোপুরি তুলে নেয়ার যেকোনো চেষ্টা অনেকটা পেঁয়াজের খোসা ছাড়ানোর মতো হবে। এটি প্রশাসনকে শুধু আইনি জটিলতায় ফেলবে না, বরং রাজনৈতিক ঝুঁকির মুখেও ফেলবে।’

বিশ্লেষকদের ধারণা, সোমবার ইস্যু করা লাইসেন্সটির ফলে আগামী দুই মাসে ইরান অন্তত ৩০০ কোটি (৩ বিলিয়ন) ডলারের সুবিধা পেতে পারে। কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস-এর জ্যেষ্ঠ ফেলো এডওয়ার্ড ফিশম্যান বলেন, এটি যদি স্থায়ী হয়, তবে অর্থের পরিমাণ ‘অন্তত কয়েক হাজার কোটি ডলারে’ গিয়ে দাঁড়াতে পারে। তখন ইরান চীনের পাশাপাশি অন্যান্য ক্রেতার কাছেও তেল বিক্রি করতে পারবে। বর্তমানে নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও চীনের কাছে প্রায় ৯০ শতাংশ তেল বিক্রি করে ইরান।

মার্চ মাসে দেয়া ছাড়পত্রের চেয়ে নতুন লাইসেন্সটির আওতা আরও ব্যাপক। এতে কেবল তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্যই নয়, বরং তেল বাণিজ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত ব্যাংকিং, বিমা ও পরিবহন খাতকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ওএফএসি-র সাবেক কর্মকর্তা এবং বর্তমানে আইন সংস্থা হল্যান্ড অ্যান্ড নাইটের অংশীদার স্টেফানি কনর বলেন, এর সঙ্গে বেশ কয়েকটি ‘কঠিন বিষয়’ জড়িত। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘আমরা কি সত্যিই ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের হাতে অর্থ যেতে দেব?’ যুক্তরাষ্ট্র এই শক্তিশালী আধা-সামরিক বাহিনীকে বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে।

নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পরও ব্যাংক, তেল কোম্পানি এবং বিমা প্রতিষ্ঠানগুলোকে নতুন নীতিমালার মুখোমুখি হতে হবে। এছাড়া চীন, উত্তর কোরিয়া এবং রাশিয়ার মতো দেশগুলোর সঙ্গে ইরানের সম্পর্কের কারণে নিষেধাজ্ঞা ফাঁকি দেয়ার ঝুঁকিও রয়েছে। হুয়ান জারাতে বলেন, ‘আমরা বাজারের মনে এমন ভয় ঢুকিয়ে দিয়েছি যে চাইলেই হঠাৎ করে বলা যায় না, এখন থেকে ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করা নিরাপদ।’ ২০১৬ সালের ‘জাস্টিস অ্যাগেইনস্ট স্পন্সরস অব টেররিজম অ্যাক্ট’-এর অধীনে হামলার শিকার ব্যক্তিরা বিনিয়োগকারী ও কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে মামলা করতে পারেন। অবসিডিয়ান রিস্ক অ্যাডভাইজরস-এর প্রধান ব্রেট এরিকসন মনে করেন, এসব কারণে পরিস্থিতি পুরোপুরি রাজনৈতিকভাবে স্থিতিশীল না হওয়া পর্যন্ত বড় বড় কোম্পানিগুলো ইরানের সঙ্গে কাজ করা থেকে দূরেই থাকবে।

এএম