চীন-রাশিয়ার সম্পর্ক: কোন সুতোয় বাঁধা বেইজিং ও মস্কো?

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও  চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং | ছবি: এআই জেনারেটেড
0

গত সেপ্টেম্বরে বেইজিংয়ের তিয়ানআনমেন স্কয়ারে হাঁটার সময় চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে অঙ্গ প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে মানুষের আয়ু নাটকীয়ভাবে বাড়ানোর সম্ভাবনা নিয়ে আলাপ করতে দেখা যায়। পুতিনের দোভাষীকে বলতে শোনা যায়, ‘অঙ্গ প্রতিনিয়ত প্রতিস্থাপন করা যেতে পারে। আপনি যত বেশি দিন বাঁচবেন, তত তরুণ হবেন এবং এমনকি অমরত্বও লাভ করতে পারেন।’ জবাবে শির দোভাষীকে বলতে শোনা যায়, ‘অনেকের ধারণা, চলতি শতকে মানুষ হয়তো ১৫০ বছর পর্যন্ত বাঁচতে পারবে।’

দুই পরাক্রমশালী নেতার জন্য এটি বেশ মানানসই একটি কথোপকথন। তারা একে অপরকে সেরা বন্ধু হিসেবে অভিহিত করেছেন এবং যৌথভাবে ৩৯ বছর ক্ষমতায় থাকার পরও তাদের সরে দাঁড়ানোর কোনো লক্ষণ নেই। এই দুই দেশের সম্পর্ক নিয়ে অনেক ভুল-বোঝাবুঝি রয়েছে। তবে এই ধরনের অপরিকল্পিত কথোপকথন তাদের অত্যন্ত গোপন সম্পর্কের একটি বিরল ঝলক সামনে আনে। বিবিসির প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

রাশিয়া ও চীনের মধ্যকার ‘গুড-নেইবারলিনেস অ্যান্ড ফ্রেন্ডলি কো-অপারেশন’ চুক্তির ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে চলতি সপ্তাহেই আবারও বেইজিং সফরে যাচ্ছেন পুতিন।

গত সপ্তাহে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন শি জিনপিংয়ের সঙ্গে দেখা করতে যান, তখন তাকে রাজকীয় ভোজ ও প্রাচীন মন্দিরে ঘুরিয়ে দেখানোর জমকালো আয়োজন করা হয়েছিল। সে তুলনায় পুতিনের এই সফর বেশ সাদামাটা। আগে থেকে এ বিষয়ে খুব একটা তথ্যও প্রকাশ করা হয়নি। ক্রেমলিনের মুখপাত্র জানিয়েছেন, ট্রাম্প-শি বৈঠকের বিষয়ে সরাসরি তথ্য পাওয়ার আশায় আছেন তারা।

গত সপ্তাহে বিদেশি দর্শনার্থীদের জন্য নিষিদ্ধ জংনানহাই এলাকায় হাঁটার সময় ট্রাম্পের কাছে বন্ধু পুতিনের প্রসঙ্গ টেনে শি জিনপিং রসিকতা করে বলেছিলেন যে, পুতিনও এর আগে বেইজিংয়ের এই রাজনৈতিক অভয়ারণ্যে এসেছিলেন। ওয়াশিংটনের অনেকে হয়তো আশা করছেন, ট্রাম্প বেইজিংকে মস্কো থেকে দূরে সরিয়ে আনতে পারবেন। তবে এমন আশা মূলত অলীক কল্পনাই বলা চলে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন ও রাশিয়া নিজেদের সম্পর্ককে ‘সীমাহীন বন্ধুত্ব’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।

কার্নেগি রাশিয়া ইউরেশিয়া সেন্টারের পরিচালক আলেকজান্ডার গাবুয়েভ বলেন, ‘এই সম্পর্ক অত্যন্ত অসম। দুই দেশের মধ্যে যে কোনো চুক্তি মূলত চীনের শর্তেই হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।’ তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘রাশিয়া পুরোপুরি চীনের পকেটে এবং চীনই শর্ত ঠিক করে দেয়।’ অর্থনীতিসহ বিভিন্ন খাতে এই গতিশীলতা স্পষ্ট।

চীন রাশিয়ার সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার হলেও চীনের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মাত্র ৪ শতাংশ যায় রাশিয়ায়। কয়েক বছরের পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে মস্কো বাণিজ্যিকভাবে বেইজিংয়ের ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। 

বিশেষ করে ২০২২ সালে ইউক্রেনে পুরোদমে সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে মস্কো তাদের যুদ্ধাস্ত্রের জন্য চীনা সরঞ্জামের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। সম্প্রতি ব্লুমবার্গের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশিয়ার আমদানিকৃত নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত প্রযুক্তির ৯০ শতাংশেরও বেশি আসছে চীন থেকে। রাশিয়া এই অসমতার ঝুঁকি সম্পর্কে বেশ সচেতন।

রাশিয়ান ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি ত্রেনিন সম্প্রতি এক নিবন্ধে স্পষ্ট করেছেন যে, রাশিয়া কারও আজ্ঞাবহ রাষ্ট্র হতে চায় না। অন্যদিকে, গ্লাসগো ইউনিভার্সিটির শিক্ষক মার্সিন কাচমারস্কির মতে, চীন এই অসমতার বিষয়টি জানে এবং তারা এমন কিছু করতে চায় না যাতে রাশিয়ার ভেতরে কোনো ক্ষোভ তৈরি হয়। তার মতে, রাশিয়ার প্রতি চীনের নীতি হলো ‘আত্মসংযম’। চীন রাশিয়াকে দিয়ে জোর করে কিছু করায় না।

ইউক্রেনের দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ রাশিয়াকে অনেক দিক থেকেই চাপে ফেললেও, তাইওয়ানে সম্ভাব্য অভিযানের কথা মাথায় রাখলে বেইজিংয়ের কাছে মস্কো একটি বড় সম্পদ। গাবুয়েভ মনে করেন, রাশিয়া এমন কিছু সামরিক প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম সরবরাহ করতে পারে যা চীনের জন্য সহায়ক। এছাড়া রাশিয়ার বিশাল জ্বালানি সম্পদ চীনের জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

মে মাসে এক সংবাদ সম্মেলনে পুতিন জানিয়েছিলেন, তেল ও গ্যাস সহযোগিতার ক্ষেত্রে দুই দেশ একটি ‘অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ’ নেয়ার কাছাকাছি পৌঁছেছে। তিনি সম্ভবত ‘পাওয়ার অব সাইবেরিয়া ২’ পাইপলাইনের কথা বোঝাচ্ছিলেন। এটি নির্মিত হলে মঙ্গোলিয়ার মধ্য দিয়ে চীনে বছরে বিপুল পরিমাণ রুশ গ্যাস পৌঁছানো সম্ভব হবে। হরমুজ প্রণালিতে চলমান সংকটের কারণে ক্রমবর্ধমান অস্থিতিশীল বিশ্বে নিজেদের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাশিয়ার ওপর চীনের এই নির্ভরতা বেশ কাজে দিচ্ছে।

যখনই চীন ও রাশিয়ার মধ্যে কোনো মতপার্থক্য দেখা যায়, তখন তাদের সম্পর্কের একটি সহজ সত্য সামনে আসে—তারা কোনো আনুষ্ঠানিক মিত্র নয়, তাই কাউকে একে অপরের নির্দেশ মানতে হয় না। মস্কোয় নিযুক্ত অস্ট্রেলিয়ার দূতাবাসের সাবেক উপপ্রধান বোবো লো বলেন, এটি কোনো সামরিক জোট নয়, বরং একটি নমনীয় কৌশলগত অংশীদারত্ব।

পশ্চিমা বিশ্লেষকেরা অনেক সময় এই সম্পর্ককে ‘স্বৈরতন্ত্রের অক্ষ’ বা ভেঙে পড়ার দ্বারপ্রান্তে থাকা ভঙ্গুর বন্ধুত্ব হিসেবে তুলে ধরেন। তবে বোবো লো মনে করেন, পশ্চিমাদের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো হলেও এই দুই দেশের একসঙ্গে চলার অনেক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে প্রধান কারণ হলো তাদের ৪ হাজার ৩০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত এবং একে অপরের পরিপূরক অর্থনীতি। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থার প্রতি তাদের অভিন্ন বিরোধিতাও এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। পশ্চিমা দেশগুলোর মতো তারা মানবাধিকারের মতো ইস্যুতে একে অপরের সমালোচনা করে না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক চীনা বিশ্লেষক স্বীকার করেছেন, প্রকাশ্যে চীন-রাশিয়া নিজেদের অবিচ্ছেদ্য হিসেবে তুলে ধরলেও এর কিছুটা লোকদেখানো। স্বার্থের সংঘাত এড়াতে এটি একটি কার্যকর রাজনৈতিক হাতিয়ার। দুই দেশই পশ্চিমা আধিপত্যের বিরোধী হলেও তাদের পদ্ধতি ভিন্ন। রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রকে পুরোপুরি এড়িয়ে নতুন বিশ্বব্যবস্থা গড়তে চায়, কিন্তু চীন অনেক বেশি সতর্ক ও বাস্তববাদী। উদাহরণস্বরূপ, ইরানে মার্কিন পদক্ষেপের প্রতিক্রিয়ায় বেইজিং বেশ পরিমিত আচরণ করেছে এবং ট্রাম্পের সফরের প্রস্তুতি বাতিল করেনি। এটি প্রমাণ করে যে বেইজিং অযথাই ওয়াশিংটনকে উসকে দিতে চায় না। ভূরাজনীতির বাইরে দুই দেশের মানুষের মধ্যেও সম্পর্ক গভীর হচ্ছে।

যদিও সাবেক ব্রিটিশ কূটনীতিক চার্লস পার্টন মনে করেন, সাধারণ রুশ ও চীনাদের মধ্যে সাংস্কৃতিক নৈকট্য খুব একটা নেই। তবে গাবুয়েভ এই মতের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন। তার মতে, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ও ইউরোপের কঠোর ভিসা নীতির কারণে রুশরা এখন চীনের দিকে ঝুঁকছেন। দীর্ঘমেয়াদে মস্কো ও বেইজিংয়ের এই সম্পর্কে যতই অসমতা থাকুক না কেন, স্বল্পমেয়াদে তা ভেঙে পড়ার কোনো আশঙ্কা নেই। বোবো লোর মতে, চীন-রুশ অংশীদারত্ব টিকে থাকার মতোই মজবুত। দুই পক্ষই বোঝে যে এই সম্পর্ক ব্যর্থ হতে দেয়া যাবে না, কারণ বিকল্প কোনো পথ তাদের সামনে খোলা নেই।

এএম