পশ্চিমবঙ্গের শাসন বিজেপির হাতে, বাংলাদেশের ভাগ্যে কী?

ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) সমর্থকরা
ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) সমর্থকরা | ছবি: আল জাজিরা
1

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে ১৫ বছরের তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি) শাসনের অবসান ঘটিয়ে বিশাল জয় পেয়েছে বিজেপি। রাজ্যে ও কেন্দ্রে বিজেপির ‘ডাবল ইঞ্জিন’ সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির পাশাপাশি ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কেও এর বড় প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। ভারতীয় জি নিউজের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

বাংলাদেশের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের প্রায় ২ হাজার ২১৭ কিলোমিটার সীমান্ত এবং নিবিড় আর্থসামাজিক সম্পর্কের কারণে এই রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঢাকার জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ফলাফলের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সামনে যেমন তিস্তার জট খোলার নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, তেমনি সীমান্ত ও নাগরিকত্ব ইস্যুতে গভীর উদ্বেগও দেখা দিয়েছে।

কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক সব সময়ই নয়াদিল্লির সঙ্গে, কলকাতার সঙ্গে নয়। তবে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি বরাবরই দুই দেশের সম্পর্কে প্রভাব ফেলেছে। এখন কেন্দ্রে ও রাজ্যে একই দল ক্ষমতায় থাকায় তিস্তা চুক্তির মতো পুরোনো জট খোলার পথ পরিষ্কার হলো।

দীর্ঘকাল ধরে নয়াদিল্লির দাবি ছিল, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরোধিতার কারণেই তিস্তা পানিবণ্টন চুক্তি আটকে আছে। এখন সেই বড় রাজনৈতিক বাধাটি আর নেই। ফলে তিস্তা চুক্তি এবার আলোর মুখ দেখবে কি না, তা ঢাকার কাছে ভারতের নতুন প্রশাসনের সদিচ্ছার এক বড় ‘অগ্নিপরীক্ষা’। তিস্তার জট খুললে গঙ্গা চুক্তি নবায়নসহ অন্যান্য বিষয়েও দুই দেশের মধ্যে আস্থা বাড়বে। এছাড়া রাজ্য পর্যায়ের বাধা দূর হওয়ায় সীমান্ত বাণিজ্য, শুল্কায়ন ও ট্রানজিট সুবিধা আরও স্বাভাবিক হওয়ার সুযোগ রয়েছে, যা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক।

তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি ঢাকার জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে সীমান্ত নিরাপত্তা ও ‘পুশ ইন’ আতঙ্ক। নির্বাচনি প্রচারণায় অবৈধ অনুপ্রবেশ রোধ, কঠোর সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের বিষয়ে কড়া বার্তা দিয়েছিল বিজেপি। এখন আসামের পর পশ্চিমবঙ্গও বিজেপির নিয়ন্ত্রণে যাওয়ায় বাংলাদেশ কার্যত দুটি বড় বিজেপি-শাসিত রাজ্যের সীমান্ত-বেষ্টনীতে মধ্যে পড়লো।

বিশ্লেষকেরা আশঙ্কা করছেন, এনআরসি বা সিএএ-র মতো বিষয়গুলো সামনে এনে সীমান্ত দিয়ে কথিত অবৈধ অভিবাসী বিতাড়ন বা ‘পুশ ইন’ করার চেষ্টা হতে পারে। সেই সঙ্গে সাধারণ মানুষের যাতায়াত, ভিসা প্রক্রিয়া ও সীমান্তে নজরদারিতে আরও কড়াকড়ি আসার শঙ্কা রয়েছে।

উল্লেখ্য, এনআরসি হলো প্রকৃত ভারতীয় নাগরিকদের তালিকা তৈরি করে ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ শনাক্ত করার প্রক্রিয়া; আর সিএএ হলো ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে আসা অমুসলিমদের নাগরিকত্ব দেয়ার বিশেষ আইন।

বিশেষজ্ঞরা আরও সতর্ক করে বলেছেন, বাংলাদেশ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ। পশ্চিমবঙ্গে কোনো ধরনের সাম্প্রদায়িক বা বাংলাদেশবিরোধী উসকানিমূলক ন্যারাটিভ তৈরি হলে এ দেশের মানুষের অনুভূতিতে তার বিরূপ প্রভাব পড়বে। ভারত সরকারের উচিত অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেয়া এবং বাংলাদেশের জনগণের মতামতকে সম্মান জানানো। উসকানিমূলক যেকোনো বক্তব্য দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে পারে।

ঢাকার আনুষ্ঠানিক অবস্থান হলো, ভারতের রাজ্য পর্যায়ের নির্বাচন দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে সরাসরি প্রভাব ফেলে না। বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বের অধীনে ঢাকা যখন দিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছে, তখন বাস্তবসম্মত সহযোগিতার নানা সুযোগ রয়েছে।

তবে কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের সতর্কবার্তা দিচ্ছে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, কঠোর সীমান্ত নীতি বা কোনো সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার জেরে পরিস্থিতি ঘোলাটে হলে, বাংলাদেশ কৌশলগত কারণে চীনের দিকে আরও বেশি ঝুঁকে পড়তে পারে। আঞ্চলিক রাজনীতির এই স্পর্শকাতর সমীকরণের বিষয়টি নয়াদিল্লিকে অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে।

এএম