ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ইরানের ‘ডিজিটাল যুদ্ধ’

বিমান বিধ্বস্তের পর আমেরিকান সৈন্যকে ইরানিয়ানদের ধাওয়া
বিমান বিধ্বস্তের পর আমেরিকান সৈন্যকে ইরানিয়ানদের ধাওয়া | ছবি: আল জাজিরা
0

চাঁদের আলোয় আলোকিত এক জনশূন্য প্রান্তরে ঘোড়ায় চড়ে এগিয়ে আসছেন এক আদিবাসী আমেরিকান সৈন্য। এরপরই দ্রুত দৃশ্যের পরিবর্তন ঘটিয়ে এমন সব মানুষের ছবি তুলে ধরা হয়, যারা দীর্ঘ দিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র বা মার্কিন সরকারের আগ্রাসী নীতির ভুক্তভোগী।

সম্প্রতি ‘এক্সপ্লোসিভ মিডিয়া’ নামে ইরানের একটি অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট গ্রুপ প্রকাশিত ‘লেগো’ ভিডিওতে এ দৃশ্য দেখা যায়। মাইক্রোব্লগিং প্লাটফর্ম এক্সে এ ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এ ভিডিও নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

ভিডিওর এ পর্যায়ে শিকলবন্দি কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকান থেকে শুরু করে ইরাকের ‘কুখ্যাত’ আবু গারিব কারাগারের নির্যাতিত বন্দিদের ছবিও তুলে ধরা হয়। এরপর দৃশ্য পরিবর্তিত হয়ে ইরানি সৈন্যদের দিকে চলে যায়। যারা ক্ষেপণাস্ত্রের গায়ে বড় বড় ব্যানার টাঙিয়ে দিচ্ছিল।

প্রথম ব্যানারে লেখা ছিল, ‘নিপীড়িত কৃষ্ণাঙ্গদের জন্য।’ এরপর ‘হিরোশিমা ও নাগাসাকির জনগণের জন্য’, ‘ইরান এয়ার ফ্লাইট ৬৫৫-এর ভুক্তভোগীদের স্মরণে’ লেখা ব্যানার দেখা যায়। এয়ার ফ্লাইটের ব্যানারটি মূলত ১৯৮৮ সালে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ধ্বংস হওয়া সেই যাত্রীবাহী বিমানের কথা তুলে ধরেছে যেখানে ২৯০ যাত্রী নিহত হয়েছিলেন।

এরপর আসে, ‘র‍্যাচেল কোরির সংগ্রামের স্মরণে’ লিখিত ব্যানার। ২০০৩ সালে গাজায় ইসরাইলি বুলডোজারের নিচে চাপা পড়ে নিহত হন র‍্যাচেল। আফগানিস্তান, ভিয়েতনাম ও ইরাকে মার্কিন যুদ্ধ ও নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের পাশাপাশি ‘এপস্টেইন আইল্যান্ডের শিশুদের’ স্মরণেও একই ধরনের বার্তা লেখা ক্ষেপণাস্ত্রগুলো আকাশে নিক্ষেপ করা হয়।

ভিডিওটির শেষে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনইয়ামিন নেতানিয়াহুর বিশাল মূর্তি ভেঙে চুরমার হয়ে যায় এবং সাদা বড় অক্ষরে ভেসে ওঠে একটি বার্তা: ‘ওয়ান ভেনজেন্স ফর অল’ (সবার জন্য এক প্রতিশোধ)।

গত ২৯ মার্চ ‘এক্সপ্লোসিভ মিডিয়া’ নামের একটি গ্রুপ এ ভিডিও প্রকাশ করে। ইরানের এ গ্রুপটিসহ আরও কয়েকটি দল বিশ্বজুড়ে শিশুদের জনপ্রিয় খেলনা ‘লেগো’ ব্লক ও চরিত্রগুলো ব্যবহার করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভাইরাল ট্রেন্ড তৈরি করেছে। এর মাধ্যমে তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিরুদ্ধে তেহরানের বার্তা বা অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করে তুলছে।

যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসন ও অভ্যন্তরীণ অপরাধের শিকার ব্যক্তিদের চিত্রিত করা এ ভিডিওটি ‘এক্স’ (সাবেক টুইটার)-এ দেড় লাখের বেশি বার দেখা হয়েছে। যদিও ইউটিউব থেকে সম্প্রতি ‘এক্সপ্লোসিভ মিডিয়া’র অ্যাকাউন্ট মুছে ফেলা হয়েছে। তবে তাতেও দমেনি এ গ্রুপ।

কাস্টম লিরিক্স ও র‍্যাপ মিউজিক ব্যবহার করে প্রায়ই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে উপহাস করছে ‘এক্সপ্লোসিভ মিডিয়া’। ট্রাম্পের নিজস্ব কথাগুলো ব্যবহার করেই তারা তাকে ভণ্ড এবং আমেরিকার চেয়ে ইসরাইলের স্বার্থ রক্ষায় বেশি তৎপর বলে অভিযুক্ত করছে।

‘এক্সপ্লোসিভ মিডিয়া’র একজন প্রতিনিধি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সহিংসতা ছড়ানোর অভিযোগে তাদের ইউটিউব চ্যানেল বন্ধ করা হয়েছে। অথচ তারা মনে করেন, লেগো-স্টাইলের অ্যানিমেশন মোটেও সহিংস নয়।

তিনি বলেন, ‘আমরা হতাশ, তবে অবাক হইনি। এটি নতুন চিত্র নয়। আমরা জানি পশ্চিমারা কীভাবে সত্যকে ঢেকে রাখতে চায় এবং তাদের বিরুদ্ধে কথা বলা কণ্ঠকে প্রতিরোধ করতে চায়।’

আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, এ ভিডিওগুলো শিয়া ইতিহাসের গভীর শোকগাথা থেকে শুরু করে আক্রমণাত্মক র‍্যাপ সংগীত পর্যন্ত বিভিন্ন ধারার। এক্সপ্লোসিভ মিডিয়ার মুখপাত্র জানান, অ্যানিমেশনে ব্যবহৃত সবুজ ও লাল রঙের বিশেষ অর্থ রয়েছে।

ইসলামের ঐতিহ্যে সবুজ রঙ নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র হোসাইন (রা.)-এর ন্যায়বিচারের লড়াইকে নির্দেশ করে, আর লাল রঙ নির্দেশ করে অত্যাচারীকে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরান জানে সামরিকভাবে তারা হয়তো খুব একটা সুবিধা করতে পারবে না, তাই ‘আখ্যান যুদ্ধ’ বা ‘ন্যারেটিভ ওয়ার’-এ জয়লাভই এখন তাদের মূল কৌশল।

নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটি ইন কাতারের অধ্যাপক মার্ক ওয়েন জোন্স বলেন, ‘আধুনিক যুগে এ ধরনের ট্রল-প্রোপাগান্ডা বা আক্রমণাত্মক বার্তা বেশ কার্যকর। তাদের ভিডিওগুলো অত্যন্ত সুচিন্তিত এবং বিস্তারিত, যেখানে একটি স্পষ্ট গল্পের ধারা রয়েছে। অন্যদিকে মার্কিন প্রোপাগান্ডা কেবল হলিউড স্টাইলের বিস্ফোরণ আর কাট-কপি-পেস্টের সমষ্টি।’

ইসলামাবাদভিত্তিক বিশ্লেষক ফাসি জাকারের মতে, এ ভিডিওগুলোর বুদ্ধিদীপ্ত দিক হলো—এগুলো যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, যেমন ‘এপস্টেইন ফাইলস’ বা ‘মাগা’ ট্রাম্প সমর্থকদের দুর্বলতাগুলোকে দারুণভাবে কাজে লাগাচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘এগুলো দেখতে মজার মনে হলেও, আসলে এগুলো অত্যন্ত স্মার্ট ও শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রচারণা।’

অন্যান্য ভিডিওতে ‘এপস্টিন শাসন’, ‘লুজার’ (পরাজিত)-এর মতো শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করা হয়েছে। সেখানে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সমর্থকদের মাথায় ‘মাগা’ (ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ আন্দোলন) লেখা লাল রঙের টুপি পরা অবস্থায় দেখানো হয়েছে।

ভিডিওগুলোতে ট্রাম্পের সেসব প্রতিশ্রুতির চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন কোনো যুদ্ধে না জড়ানো এবং সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের পাশে থাকার কথা বলেছিলেন।

এরপর খোদ প্রেসিডেন্টের নিজের কথা ব্যবহার করেই তার বিরুদ্ধে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভিযোগ তোলা হয়েছে এবং দেখানো হয়েছে, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে ইসরাইলের দাবিকেই বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।

গোষ্ঠীটির মুখপাত্র বলেন, ‘‘লুজার’’ আমাদের অন্যতম সেরা সৃষ্টি। ট্রাম্প প্রায়ই তার বিরোধীদের এ নামে ডাকেন। তাই আমরা বিষয়টিকে উল্টে দিয়েছি এবং দেখিয়েছি, শেষ পর্যন্ত তিনিই সবচেয়ে বড় লুজার।

লেবাননের জনগণের উদ্দেশ্যে আরও একটি ভিডিও তৈরি করা হয়েছে। যেখানে বলা হয়েছে, ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) তাদের ছেড়ে যাবে না। লেবাননে মাত্র ১০ মিনিটে ১০০টিরও বেশি বোমাবর্ষণের সেই ভয়াবহ হামলার পর ভিডিওটি প্রকাশ করা হয়।

এ ভিডিওগুলো তৈরির নেপথ্যে রয়েছে ১০ জনের একটি দল, যাদের সবার বয়স ১৯ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে। তাদের কাছে স্পষ্টভাবেই ইন্টারনেট ব্যবহারের অবাধ সুযোগ রয়েছে, যার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মালিকানাধীন সোশ্যাল মিডিয়া প্লাটফর্ম অন্তর্ভুক্ত। অথচ যুদ্ধের শুরু থেকেই সাধারণ ইরানিদের জন্য এ প্লাটফর্মগুলো বন্ধ রেখেছে সে দেশের সরকার।

আল জাজিরাকে দেয়া সাক্ষাৎকারে এক্সপ্লোসিভ মিডিয়ার মুখপাত্র স্বীকার করেন, ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমগুলো তাদের অন্যতম গ্রাহক। তবে তিনি দাবি করেন, তাদের গোষ্ঠীটি সম্পূর্ণ স্বাধীন।

ওই মুখপাত্র বলেন, ‘আমরা উচ্চমানের মিডিয়া কন্টেন্ট তৈরি করি। তাই বিভিন্ন স্থানীয় সংবাদমাধ্যম, যার মধ্যে কিছু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানও রয়েছে, প্রচারের জন্য মাঝে মাঝে আমাদের কাজ কিনে নেয়। এটাই স্বাভাবিক।’

‘আমরা আগে কন্টেন্ট তৈরি করি। যদি এর মান যথেষ্ট ভালো হয়, তাহলে সংবাদ সংস্থাগুলো তা আমাদের কাছ থেকে কিনে নেয়। এভাবে আমাদের স্বাধীনতা পুরোপুরি বজায় থাকে,’ যোগ করেন তিনি।

এএইচ