আরও পড়ুন:
ম্যানুয়েল নরিয়েগা (পানামা, ১৯৮৯): মাদক সম্রাট ও সিআইএ-র লড়াই
মাদুরোকে আটকের ঘটনার সাথে পানামার ম্যানুয়েল নরিয়েগার ঘটনার হুবহু মিল পাওয়া যায়। নরিয়েগা এক সময় সিআইএ-র হয়ে কাজ করতেন, কিন্তু পরে তিনি মাদক পাচারের (Drug trafficking) সাথে জড়িয়ে পড়েন এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধাচরণ শুরু করেন।
অপারেশন জাস্ট কজ (Operation Just Cause): ১৯৮৯ সালের ২০ ডিসেম্বর তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ পানামায় সামরিক হামলা চালায়। নরিয়েগা পালিয়ে ভ্যাটিকান দূতাবাসে আশ্রয় নেন।
সাউন্ড থেরাপি ও আটক: মার্কিন সেনারা ভ্যাটিকান দূতাবাসের সামনে ১০ দিন ধরে উচ্চস্বরে রক মিউজিক বাজিয়ে তাকে অতিষ্ঠ করে তোলে। অবশেষে ৩ জানুয়ারি, ১৯৯০ সালে তিনি আত্মসমর্পণ করেন।
পরিণতি: তাকে যুক্তরাষ্ট্রে উড়িয়ে নেওয়া হয় এবং মাদক পাচার ও মুদ্রা পাচারের দায়ে ৪০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
আরও পড়ুন:
সাদ্দাম হোসেন (ইরাক, ২০০৩): মাটির গর্ত থেকে ফাঁসির মঞ্চ
ইরাকের এক সময়ের প্রতাপশালী শাসক সাদ্দাম হোসেনকে আটক করা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত সামরিক অপারেশন। ২০০৩ সালের এপ্রিলে বাগদাদ পতনের পর সাদ্দাম পালিয়ে যান।
অপারেশন রেড ডন (Operation Red Dawn): দীর্ঘ ৯ মাস গোয়েন্দা নজরদারির পর ১৩ ডিসেম্বর, ২০০৩ সালে সাদ্দামের জন্মশহর তিকরিতের একটি গোপন সুড়ঙ্গ বা 'স্পাইডার হোল' থেকে তাকে আটক করা হয়।
বন্দিত্ব ও বিচার: মার্কিন ডেল্টা ফোর্স ও স্পেশাল ফোর্সের সদস্যরা তাকে অত্যন্ত অপমানজনক অবস্থায় উদ্ধার করে। পরবর্তীতে তাকে ইরাকি ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে বিচার করে ২০০৬ সালে ফাঁসি দেওয়া হয়।
হিদেকি তোজো (জাপান, ১৯৪৫): যুদ্ধাপরাধের দায়ে আটক
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অক্ষশক্তির অন্যতম প্রধান নেতা এবং জাপানের প্রধানমন্ত্রী হিদেকি তোজোকে যুদ্ধের শেষ দিকে মার্কিন সামরিক পুলিশ আটক করে।
আত্মহত্যার চেষ্টা: জেনারেল ডগলাস ম্যাকআর্থার যখন তোজোর বাড়িতে সেনা পাঠান, তখন তিনি নিজেকে গুলি করে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন। তবে মার্কিন চিকিৎসকরা তাকে বাঁচিয়ে তোলেন।
পরিণতি: তোজোকে যুদ্ধাপরাধের (War crimes) অভিযোগে টোকিও ট্রাইব্যুনালে বিচারের মুখোমুখি করা হয় এবং ১৯৪৮ সালে তার ফাঁসি কার্যকর করা হয়।
আরও পড়ুন:
হুয়ান অরল্যান্ডো হার্নান্দেজ (হন্ডুরাস, ২০২২): মাদুরোর পূর্বসূরি
মাদুরোর মতোই নারকো-টেররিজমের অভিযোগে হন্ডুরাসের সাবেক প্রেসিডেন্ট হার্নান্দেজকে আটক করা হয়। প্রেসিডেন্ট পদ ছাড়ার মাত্র কয়ে সপ্তাহের মধ্যে মার্কিন ডিরেক্টরেট অব ইন্টেলিজেন্সের সহযোগিতায় তাকে শিকলবদ্ধ অবস্থায় আটক করা হয়।
এক্সট্রাডিশন: ২০২২ সালের এপ্রিলে তাকে হন্ডুরাস থেকে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যর্পণ করা হয়। বর্তমানে তিনি নিউ ইয়র্কের কারাগারে বন্দী।
মুয়াম্মার গাদ্দাফি ও সাদ্দামের ছায়া (লিবিয়া, ২০১১)
লিবিয়ার দীর্ঘকালীন শাসক মুয়াম্মার গাদ্দাফিকে ক্ষমতাচ্যুত করার পেছনে প্রধান চালিকাশক্তি ছিল ওবামা প্রশাসনের প্রত্যক্ষ মদদে পরিচালিত ন্যাটো অভিযান (NATO intervention)। যদিও বিদ্রোহীরা তাকে হত্যা করেছিল, তবে লিবিয়ার আকাশে মার্কিন ড্রোন ও ফ্রেঞ্চ যুদ্ধবিমান গাদ্দাফির কনভয়ে হামলা চালিয়ে তাকে অবরুদ্ধ করে ফেলেছিল।
আরও পড়ুন:
কেন যুক্তরাষ্ট্র বিদেশি নেতাদের বন্দি করে? (Why does the US arrest foreign leaders)
মার্কিন পররাষ্ট্র নীতি বিশ্লেষকদের মতে, যখনই কোনো দেশের নেতা মার্কিন স্বার্থের পরিপন্থী কাজ করেন কিংবা মাদক পাচার (Drug trafficking) এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের (Human rights violations) দায়ে অভিযুক্ত হন, তখনই যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি হস্তক্ষেপের পথে হাঁটে। মাদুরোর ক্ষেত্রেও ‘নারকো-টেররিজম’ অভিযোগটিকে বড় হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে ট্রাম্প প্রশাসন।
ভবিষ্যৎ কী? (What lies ahead)
ইতিহাস বলছে, একবার যখন কোনো রাষ্ট্রপ্রধানকে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি ‘মাদক সম্রাট’ বা ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে চিহ্নিত করে আটক করে, তখন তাদের মুক্তি পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। বর্তমানে নিউ ইয়র্কের ফেডারেল কারাগারে বন্দি নিকোলাস মাদুরোকেও হয়তো ম্যানুয়েল নরিয়েগার মতো দীর্ঘ কারাদণ্ডের দিকেই এগোতে হবে।
কেন যুক্তরাষ্ট্র বারবার এমন করে? (Why does the US keep doing this)
বিশ্লেষকদের মতে, আমেরিকা তাদের ‘মনরো ডকট্রিন’ (Monroe Doctrine) এবং ‘ন্যাশনাল সিকিউরিটি’র দোহাই দিয়ে লাতিন আমেরিকাকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন রাখতে চায়। যখনই কোনো দেশের শাসক মার্কিন ডলারের আধিপত্য বা তেলের বাণিজ্যে আঘাত হানে, তখনই ওয়াশিংটন তাদের ‘মাদক পাচারকারী’ বা ‘স্বৈরশাসক’ তকমা দিয়ে সামরিক অভিযানের পথে হাঁটে।





