তার লক্ষ্য চ্যাটজিপিটি, ক্লড ও জেমিনির মতো বর্তমান এআই সিস্টেমের গণ্ডি পেরিয়ে যাওয়া। লেকুন বলেন, এসব সিস্টেমের নিজস্ব ইউজ কেস থাকলেও এগুলো কখনোই বাস্তব দুনিয়ার জটিল পরিস্থিতি সামলাতে পারবে না, যেমন গৃহস্থালির কাজ করতে কোনো রোবটকে শেখানো। সম্প্রতি বিবিসির সঙ্গে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন।
ফ্রান্সের শীর্ষ প্রযুক্তি সম্মেলন ‘ভিভাটেক’-এর ফাঁকে বিবিসিকে তিনি বলেন, ‘এগুলো মানুষের বুদ্ধিমত্তা তো দূরের কথা, প্রাণীর বুদ্ধিমত্তার পথেও যেতে পারবে না। কারণ, এগুলো বাস্তব জগতের তথ্য সামলাতে পারে না, এভাবে তৈরিও করা হয়নি।’
প্যারিসভিত্তিক এএমআই ল্যাবস চ্যাটজিপিটির প্রযুক্তির বাইরে গিয়ে নতুন ধরনের এআই তৈরিতে ব্যস্ত। বিনিয়োগকারীরাও এতে সম্ভাবনা দেখছেন। চলতি বছরের শুরুতে প্রতিষ্ঠানটি জানায়, তারা ১০০ কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগ সংগ্রহ করেছে। বিনিয়োগকারীদের মধ্যে রয়েছে মার্কিন চিপ নির্মাতা এনভিডিয়া এবং অ্যামাজনের প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোসের ব্যক্তিগত সম্পদ পরিচালনাকারী তহবিল। এই সিড ফান্ডিং রাউন্ড ইউরোপের ইতিহাসে অন্যতম বৃহত্তম।
লেকুনের মতে, চ্যাটজিপিটির মতো লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (এলএলএম) কোডিং, গাণিতিক সমস্যা ও লেখা তৈরিতে অত্যন্ত দক্ষ। তবে এগুলো সুনির্দিষ্ট ও পূর্বানুমেয় সমস্যা। তিনি বলেন, ‘এলএলএম মূলত জ্ঞান সঞ্চয় করে। তারা এমন কিছু আওড়াতে পারে, যা তাদের শেখানো হয়েছে। কিন্তু তারা বিশেষভাবে বুদ্ধিমান নয়। তাদের কোনো অন্তর্নিহিত উপলব্ধি নেই।’
উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, একটি কলম যদি ডগার ওপর দাঁড় করিয়ে রাখা হয় এবং পরে ছেড়ে দেয়া হয়, তবে যেকোনো শিশু জানে যে এটি পড়ে যাবে। কিন্তু কোন দিকে পড়বে, তা কেউ অনুমান করবে না। তবে এলএলএম তার প্রশিক্ষণের তথ্যের ভিত্তিতে একটি নির্দিষ্ট দিকের অনুমান করবে, যা প্রায় নিশ্চিতভাবেই ভুল হবে।
লেকুন জানান, তার প্রতিষ্ঠানের তৈরি ‘জয়েন্ট এমবেডিং প্রেডিক্টিভ আর্কিটেকচার’ (জেপা) নামের সিস্টেম এই ধরনের সমস্যা সামলাতে সক্ষম। এটি বাস্তব দুনিয়ার বিমূর্ত রূপ তৈরি করে, যার মাধ্যমে যেকোনো কাজের ফলাফল যাচাই করা সম্ভব।
রোবটিকস শিল্পের জন্য আরও নমনীয় এআই তৈরি এখন অগ্রাধিকার হয়ে উঠেছে। মানবাকৃতির রোবট তৈরিতে শত শত কোটি ডলার বিনিয়োগ হচ্ছে এবং প্রতি বছরই তাদের কৃতিত্ব চোখে পড়ার মতো। কিন্তু ইস্ত্রি করা বা ডিশওয়াশারে থালা সাজানোর মতো ঘরোয়া কাজ নিরাপদে করার প্রশিক্ষণ দেয়া কঠিন ও ব্যয়বহুল হয়ে দাঁড়িয়েছে। লেকুন বলেন, ‘রোবটিকসের ক্ষেত্রে এলএলএম অনেকটাই অকার্যকর। শুধু এলএলএমকে বড় করে অতিমানবীয় বুদ্ধিমত্তায় পৌঁছানো যাবে—এই দাবি বাস্তবায়িত হবে না।’
এআই শিল্পের অনেকেই লেকুনের সঙ্গে একমত। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অধ্যাপক এবং অ্যামাজন স্কলার ইংমার পসনার তাদের একজন। তিনি বলেন, ‘আমার মতে, আগামী দশকটি হবে ব্যাখ্যা করতে পারা সিস্টেমের। এমন মডেল দরকার, যা উত্তর দিতে পারবে—কী গুরুত্বপূর্ণ, কী কারণে কী হয়, ভিন্ন কিছু করলে কী ঘটত।’
পসনার ও তার প্রায় ১০ জন গবেষকের দল চার বছর ধরে ‘ওয়ার্ল্ড মডেলস’ নামে পরিচিত বিকল্প এআই নিয়ে কাজ করছেন। ২০১৮ সালে ডেভিড হা এবং জার্গেন স্কমিদহুবারের প্রকাশিত একটি প্রভাবশালী গবেষণাপত্র এই কাজের অনুপ্রেরণা। তাদের পর্যবেক্ষণ ছিল, মেশিন লার্নিং ও কম্পিউটিং শক্তির অগ্রগতির ফলে এআই বিশ্ব সম্পর্কে শেখা ‘মানসিক’ অনুকরণ থেকেই কোনো কাজ করা শিখতে পারে।
২০১৮ সালের পর থেকে এই ধারণা ওয়ার্ল্ড মডেলস নিয়ে ব্যাপক গবেষণা উসকে দিয়েছে। গুগলের ‘ড্রিমার ওয়ার্ল্ড মডেল’ও এর মধ্যে রয়েছে। গত বছর ড্রিমারের একটি সংস্করণ ভিডিও গেম মাইনক্রাফটে হীরা সংগ্রহের পদ্ধতি বের করেছিল। পসনার তার দলের তৈরি সিস্টেমকে বলছেন ‘মেকানিস্টিক ওয়ার্ল্ড মডেল’, যা এআইয়ের কার্যকর ব্যবহারের জন্য জ্ঞানকে বিন্যস্ত করবে।
গুগলের মালিকানাধীন ডিপমাইন্ড তাদের ‘জেনি’ মডেল এবং লন্ডনভিত্তিক ওয়েভ ‘গায়া’ নামের সিস্টেম নিয়ে কাজ করছে। এআই অগ্রদূত ফেই-ফেই লি ২০২৩ সালে সানফ্রান্সিসকোতে ‘ওয়ার্ল্ড ল্যাবস’ প্রতিষ্ঠা করেছেন নতুন এআই মডেল তৈরিতে।
লেকুন জানান, এএমআই ল্যাবস চলতি বছরের বাকি সময় তাদের মডেল পরিমার্জন করবে এবং আগামী বছর তা শিল্প খাতে প্রথম ব্যবহারের আশা করছে। এটি সফল হলে বড় পরিসরে ভাবনার সময় আসবে। তিনি বলেন, ‘একসময় আমরা এমন সাধারণ বুদ্ধিমত্তার সিস্টেম পাব, যা সামান্য প্রশিক্ষণে বিশ্বের প্রায় সব কাজে ব্যবহার করা যাবে।’
রোবট স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারলে মানুষের কী হবে—এমন প্রশ্নের জবাবে লেকুন বলেন, ‘কী প্রশ্ন করতে হবে, কী তৈরি করতে হবে, কী সৃষ্টি করতে হবে—এসব বোঝার জন্য মানুষ প্রয়োজন হবেই। এটাই মানুষের প্রকৃত দিক।’ ভবিষ্যতে এআই সিস্টেম মানুষের চেয়ে বুদ্ধিমান হলেও তা মানুষেরই অধীনে কাজ করবে বলে তিনি মনে করেন। তার ভাষায়, ‘ভবিষ্যতের এআইয়ের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক হবে শিল্পের কোনো প্রধান বা রাজনৈতিক নেতার তার সহকারীদের সঙ্গে সম্পর্কের মতো—যাদের অনেকেই তার চেয়ে বেশি বুদ্ধিমান।’





